• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 16 July, 2026

রথযাত্রা সাম্যবাদের প্রথম ব্লুপ্রিন্ট

মার্কসবাদী ভাবনাকে তিনি শেষমেশ সমর্থন করেননি, কিন্ত সেই সময়ের সাপেক্ষে যা গ্রহণযোগ্য তাতে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই তার পরের বছরই সৃষ্টি হল ‘রথের রশি’। হাজার বছর ধরে যে উৎসব সাম্যের পুজো করেছে তাকে আবার নতুন করে ভক্তিবোধে জাগালেন রবীন্দ্রনাথ।

রথযাত্রা সাম্যবাদের প্রথম ব্লুপ্রিন্ট

Photo: File Photo

এই জিলিপিটা বড্ড সোজা। কারণ এটা রথযাত্রার। এতে ঐতিহ্যের অহঙ্কার আছে। আছে এক-আকাশ সাম্য প্রীতি। কিন্ত তোমার আমার ভেদ যে নেই। জীবনচর্চা সমাজ-দর্শনের সাম্যবাদী মডেল রথযাত্রা বহন করে চলেছে সেই অনাদিকালের অজানা দিন থেকে। এই জিলিপিতে ভক্তি প্রেম আনন্দের নিরহঙ্কার বৈভব ভরা— তাই এ বড্ড সোজা। বর্ষার মেঘেও সাম্যবাদী দর্শনের রামধনু মেলে রথযাত্রা। যে পুণ্যতিথিতে সবাই রাজা । খেলনা, পুতুল, তালপাতার বাঁশি, রাজপথে সবাই মিলিত। রথযাত্রা যেন বিভেদহীন সমাজের রূপকার। তাকে আমরা ব্যবহারিক দিকে কতোটা প্রয়োগ করছি তা বিচার্য, কিন্তু এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই, এই পথটাই সমাজতাত্ত্বিক অর্থনৈতিক সাম্য, স্থিত ব্যবস্থার প্রাথমিক অভীপ্সা পোষণ করে। কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস যেভাবে বলদর্পিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে পূর্ণসত্য বিকশিত তত্ত্ব রোপণ করেছিলেন, তার হাজার বছর আগেই সেই সাম্যবাদী রূপের ব্লুপ্রিন্ট দিয়েছিল রথযাত্রা। যে উৎসবে দেবতাই স্বয়ং ভক্তের কাছে আসছেন। তিনি মন্দির গৃহ ছেড়ে পথে আসছেন। এই কি তবে প্রথম সমাজতান্ত্রিক মডেল? গণমানস গণমন কি তবে সত্যিই গণদেবতা! তাই কি দেবতাও রাজসিংহাসন ছেড়ে রাজপথে সবার সঙ্গে একত্রিত।

রথযাত্রায় জাতপাত-ধর্ম-ভাষা- সংস্কৃতি কিছুরই বেড়া নেই। দেবতা সবাইকে আলিঙ্গন করছেন রাজপথে এসে। এই উৎসবে যে কেউই ‘রাজা’— কারণ তিনি নন্দীঘোষ স্পর্শ করেছেন। বিত্তভিত্তিক শ্রেণি, বৃত্তিভিত্তিক শ্রেণি সবাই একসঙ্গে একযোগে মিলিত হল একই পথে। এই রথের রশিটাই মানুষকে পার্থিব চেতনা থেকে অপার্থিব সম্পদে উত্তরণের টান দেয়। যাদের ঘাড় ভাঙে, যাদের ঘাড়ে বিত্তের ভার, আর যে বিত্তভোগী, তারা দু’জনেই এক রথের রশিতে দুরন্ত পরিশ্রম করে। শ্রেষ্ঠত্ব যে আভিজাত্যে নেই, তাও এই রথযাত্রা শেখায়। সম্পদ ও শক্তিকেন্দ্রিক ভূত বিতাড়নের উৎসব রথযাত্রা। যেখানে ‘কিছু’ মানুষের রুচি মতো উৎসব পালিত হয় না। আর পাঁচটা উৎসবের মতো যেখানে সম্পদ ও ভোগের কর্তৃত্ব কিছু মানুষের হাতে আবদ্ধ থাকে না। শ্রীজগন্নাথ- দেবের বিগ্রহ ভক্তের টানে গর্ভগৃহের বাইরে আসে। মানুষের প্লাবন সব বেড়া ভেঙে অংশ নেয় কপিধ্বজের নিচে। নানান দেশে যখন নৈরাজ্যবাদ তৈরি করছে, তখনই মার্কসীয় চিন্তাধারার প্রলেতারিয়ান ডিক্টেটরশিপকেও পিছনে ফেলে প্রো-পিপল-এর শ্রেষ্ঠ নমুনা নিশ্চিত ভাবে রথযাত্রা। ফরাসী বিপ্লবের মন্ত্র যখন সিদ্ধ হয় না, মিশেল বাবুনির তত্ত্ব যেখানে স্তব্ধ হয়ে যায়; তখন এই রথযাত্রাই সারা বিশ্বকে ধর্মনিরপেক্ষভাবে একত্রিত হতে শেখাল।

রথযাত্রা আসলে ক্রপটকিনের ‘মেমোয়রস অব এ রেভোলিউলানিস্ট’-এর সেই ভাষাই হাজার বছর আগে বলেছিল— বিপ্লব তখনই সফল হবে যখন তাতে শ্রেণি অর্থনৈতিক বিশেষ অধিকার থাকবে না। শুনতে রথ উৎসব। কিন্ত নিবিড় নিরীক্ষণ করি, এও তো শ্রেণি অর্থনীতি ভাঙার উৎসব। যে উৎসবে কার কতো মূল্যবান বেশ বা কে কোন শৌখিন ছাতা, গাড়ি, প্রসাধনী- অলঙ্কারের বোঝা বইছে, তা অন্য উৎসবের মতো গুরুত্ব রাখে না। এ এমন এক উৎসব যেখানে আমরা তোমরা ওরা সবাই একসঙ্গে জিলিপি খাই। বাবুর মেয়ে আর ভৃত্যের ছেলে একই বেলুন খোঁজে। এই উৎসবে ধনী হাজার ধন দিয়েও বাড়তি বাবুয়ানি দেখাতে পারবে না। ‘লিটল ইজ বিউটিফুল’— এই তত্ত্বেই চলে রথ। অল্পে খুশি থাকার মন্ত্র পাঠ হয় এই উৎসবে। মার্কস তো কতো পরে ‘ডিক্টেটরশিপ অব দি প্রলিটারিয়েট’ থিওরি এনেছিলেন। তা সমর্থন করি বা না করি, তবে এটা তো মানতেই হবে— রথযাত্রা শুরুই হল এক প্রলিটারিয়েটের জন্য। লোক কথাতো তা-ই বলে।

স্বপ্নাদেশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সাগরে দারুব্রহ্ম পাওয়ার পর গুন্ডিচা মন্দিরে মহাবেদী তৈরি করে যজ্ঞ করেন। যজ্ঞ শেষে রাজা জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা মূর্তি তৈরিতে মেতে উঠলেও, ব্যর্থ হন। রাজা কারিগরকে মূর্তি গড়তে যখনই কাঠে কুঠার দিতে হুকুম দিচ্ছেন তখনই কাঠ ভেঙে যাচ্ছে। চূর্ণ বিচূর্ণ হচ্ছে। এও যেন এক প্রতীক। পুঁজি ও যন্ত্র একদিকে। শ্রম অন্যদিকে। তা যে সুস্থিত মূর্তি গড়তে পারে না। তার পরের উপকথা আমাদের জানা। বিশ্বকর্মা যখন অনন্ত মহারানা ছুতোরের ছদ্মবেশে একুশ দিনের নিভৃত কক্ষে বিশেষ শর্তে কাজ শুরু করলেন তখনই সুষ্ঠু মূর্তি গড়া শুরু হল। সেদিন এক ছুতোরের শর্ত রাজা মেনে নিলেন। তিনি বিশেষ নিরাপত্তা পেলেন। এ তো শ্রমের জয়। শ্রমিককেই রাজা বানান জগন্নাথদেব। প্রথম দুর্গা মূর্তিকে বানিয়েছেন, আমরা কি জানি? আরও কতো কালজয়ী শিল্প যেখানে কেবলমাত্রই রাজার নাম থাকে। জগন্নাথদেব, এমন এক মহাকর্ম-যজ্ঞের আহ্বান করলেন যেখানে কর্মীর নাম, কর্মীর শর্ত চূড়ান্ত। এ তো সাম্যবাদের চূড়ান্ত রূপ! একক আধিপত্যে পুঁজি যেন না থাকে— সেই বার্তাই দেয় জগন্নাথদেব, রথযাত্রা।

আরও একটা বিষয়, জগন্নাথ বিগ্রহ কেবলমাত্রই ভক্তির বিষয়। তাই তাকে নিয়ে কোনোদিন বিনিয়োগ এল না, থিম পুজো হল না। এ বিগ্রহে শিল্পী আর সাধনাটাই চূড়ান্ত সত্য। পুঁজির প্রতিযোগিতা অনেক উৎসবেই থাবা বসিয়েছে, কিন্ত রথের গতিকে আজও ছুঁতে পারল না। উন্মেষশীল গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক চেতনার এ এক বিমূর্ত প্রতীক। রথে যখন জগন্নাথদেব বৈমাত্রেয় ভাই বোনের সঙ্গে একরেখায় অবস্থান করে, তা পারিবারিক সহাবস্থান ও সদ্ভাবের প্রতীক। আত্মীয়তার বেলাভূমি তাই রথ। সমাজের বহুমাত্রিক দিক পর্যবেক্ষণ করেই বোধহয় রথ উৎসবের সূচনা। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র সর্বস্তরে স্বার্থ সংঘাত এবং বিভেদ ঘুচিয়ে এক যথাসম্ভব সাম্য প্রতিষ্ঠার বড়াই করে রথের চাকা। মাহেশ, বাওয়ালি, আন্দুলমৌড়ি, মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, দশঘরা থেকে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের ধামরাই, বেনিয়াজুড়ি, তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার হয়ে হবিগঞ্জ বা সিলেট যেখানেই যাই, রথ চাকার অভিমুখ এক। সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে চলে। ক্ষত্রিয় দাপটে, ব্রাহ্মণ্যবাদে যেন রথের দর্শন সংকীর্ণ না হয়। তাই তো কলকাতা জুড়ে যখন বাবু কালচার, ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন রথের রশি নাটক (১৯৩২)।

রবীন্দ্রনাথ আবার অনুভব করেন যদি মানবতার গান, মানবাধিকারের তান খুঁজতে হয় তবে একমাত্র ঠিকানা ভারতবর্ষ। আরও একবার তাই রথের রশি নাটকে সাম্যবাদী চেতনার অন্তঃপুরে গেলেন। নাটকে তাই শোষিত শ্রেণি বলে উঠল ‘তোমরা কেবলই করেছ ঋণ/ কিছুই করনি শোধ/ দেউলে করে দিয়েছো যুগের বৃত্ত/ তাই নড়ে না আজ আর রথ।’ রথের রশিতে আবার রবি ঠাকুরকে দেখাতে হল নারীরাই সক্রিয় হল। তারা গর্জে বলল, ‘আমরা না থাকলে পুরুষের পেট হত না এত মোটা।’ সারা ইউরোপে যখন নারীমুক্তির স্বাদ ছড়াচ্ছে, তখনও রবি ঠাকুরের চেতনায় রথটাই হয়ে উঠল নারী অধিকারেরও গণমাধ্যম। রথের রশিটাই মনে করায় ‘আজ শূদ্র পড়ে শাস্ত্র/ কাল লাঙ্গল ধরবে ব্রাহ্মণ।’

মানুষের অধিকার দীর্ঘদিন ক্ষমতার জোরে আটকানো যায় না। গণসমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই যে আসলে উৎসব- তা তো বারবার রথ দেখিয়েছে। আরও লক্ষ্য করার মতো, ১৯৩১-এ রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠি সম্পন্ন করলেন। মার্কসবাদী ভাবনাকে তিনি শেষমেশ সমর্থন করেননি, কিন্ত সেই সময়ের সাপেক্ষে যা গ্রহণযোগ্য তাতে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই তার পরের বছরই সৃষ্টি হল ‘রথের রশি’। হাজার বছর ধরে যে উৎসব সাম্যের পুজো করেছে তাকে আবার নতুন করে ভক্তিবোধে জাগালেন রবীন্দ্রনাথ। ভক্ত- ভগবানের মিলন, মুক্তির উৎসব তাই রথযাত্রা। মানবাধিকারের সাম্য যখনই টলমল হবে তখনই রথযাত্রা তার রশিতে টান দিতে বলবে। যে রশিতে শুধুমাত্র ভক্তি। যা সবাইকে এক রেখায় দাঁড় করায়। উঁচু-নীচুর বোঝাপড়া চেনে না রথযাত্রা।