ভারতের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রধান দরজা আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার বাতিল হওয়া, যাতে প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী প্রভাবিত, আমাদের আবারও সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়– আমরা কি সত্যিই কোনও অগ্রগতি করেছি, নাকি কেবল ব্যর্থতার ধরন বদলেছে?
দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুনে, পরীক্ষার এক মাস পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে, কোনও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই বাস্তবতা সামনে আসে— বহু-রাজ্য জুড়ে সংগঠিত চক্র, তদন্তে সিবিআই-এর হস্তক্ষেপ, এবং পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংকট। সেই তুলনায় এ বছর প্রশ্নপত্র ফাঁস দ্রুত স্বীকার করা হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটিই নাকি উন্নতি। কিন্তু প্রশ্ন হল, ব্যর্থতার দ্রুত স্বীকারোক্তি কি সত্যিই সাফল্যের সূচক হতে পারে?
সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র কাঠামোগত দুর্বলতায়। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার ওপর দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রবেশিকা পরীক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল, যাতে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বছরের পর বছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি— প্রশ্নপত্র ফাঁস, জালিয়াতি, পরীক্ষাকেন্দ্র বণ্টনে অ্যালগরিদমিক ত্রুটি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা।
এই সমস্যাগুলি আর শিশুসুলভ ভুল বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি একই ব্যর্থতা দেখা যায়, তবে তা ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার লক্ষণ। পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণে এমন অদ্ভুত ত্রুটি ঘটেছে যে বহু পরীক্ষার্থীকে শত শত কিলোমিটার দূরে যেতে হয়েছে— অতিরিক্ত খরচ, মানসিক চাপ, এবং অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে। একদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের আতঙ্ক, অন্যদিকে পরীক্ষার দিন-তারিখ নিয়ে বারবার অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এক কঠিন বাধাদৌড়ে পরিণত হয়েছে।
এর প্রভাব কেবল পরীক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত এক দশকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য ভারতীয়দের ব্যয় বিপুল হারে বেড়েছে— প্রায় ৯৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৯ হাজার কোটির কাছাকাছি। অবশ্যই এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে— গ্লোবাল এক্সপোজার, উন্নত অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ— কিন্তু দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতাও একটি বড় ‘পুশ ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
তবে মনে রাখতে হবে, মাত্র ৩ শতাংশ ছাত্রছাত্রী বিদেশে পড়তে যেতে পারে। বাকি ৯৭ শতাংশের জন্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই একমাত্র ভরসা। এই বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ যদি প্রতি বছর এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভঙ্গ নয়— জাতীয় সম্পদের অপচয়ও বটে। গত দশ বছরে প্রায় ২০টির মতো বড় পরীক্ষা বাতিল, স্থগিত বা পুনরায় নেওয়া হয়েছে— কখনও কোভিড, কখনও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, কখনও দুর্নীতির কারণে। এর ফলে শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে, এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল এনটিএ-র মৌলিক কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন। কেবলমাত্র প্রযুক্তি বাড়ানো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামান্য সংস্কার দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিকেন্দ্রীকৃত মডেল, যেখানে দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন থাকবে এবং ত্রুটি হলে তার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও প্রশ্নপত্র সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি, পরীক্ষাকেন্দ্র বণ্টনের ক্ষেত্রে মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন— যাতে কোনও পরীক্ষার্থী অযৌক্তিক দূরত্বে যেতে বাধ্য না হয়। সবচেয়ে বড় কথা, পরীক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলা দরকার— তারা কেবল সংখ্যা নয়, প্রত্যেকেই একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ।
আজকের এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে তার প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এটি কেবল একটি পরীক্ষার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার প্রশ্ন। তাই সময় এসেছে অস্থায়ী সমাধানের বাইরে গিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই সংস্কারের পথে হাঁটার।
যদি তা না করা হয়, তবে প্রতি বছরই আমরা একই প্রশ্নের মুখোমুখি হব— পরীক্ষা বাতিল কি উন্নতি, নাকি আরও এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া?
Advertisement