• facebook
  • twitter
Sunday, 15 February, 2026

শান্তি এখনও অধরা

কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কেন্দ্রীয় শাসনের পর নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন মানে রাজ্যের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আংশিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

মণিপুরে নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে সাংবিধানিক স্বাভাবিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস আমাদের শেখায়, নির্বাচন কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক সংকটের অবসান ঘটায় না। বরং বহু সময়ে নির্বাচন কেবল প্রশাসনিক শূন্যতার অবসান ঘটায়, আর গভীরতর সামাজিক বিভাজন অমীমাংসিতই থেকে যায়। আজ মণিপুর সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

গত কয়েক মাসে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘাত রাজ্যকে কার্যত ভূগোলগত ও মানসিকভাবে বিভক্ত করেছে। হিংসা কেবল প্রাণহানি বা সম্পত্তি ধ্বংসের পরিসংখ্যান নয়; এটি সামাজিক চুক্তির ভাঙন। যখন নাগরিকরা নিজেদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের পরিবর্তে সম্প্রদায়ের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করতে শুরু করেন, তখন রাষ্ট্রের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই সংকট তাই আইন-শৃঙ্খলার সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সামনে প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো, রাষ্ট্রকে পুনরায় নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। মন্ত্রিসভায় জাতিগত ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা একটি প্রতীকী বার্তা দেয়– সরকার বিভাজনরেখা সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু প্রতীক যথেষ্ট নয়। যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পুলিশি পদক্ষেপ বা ত্রাণ-বণ্টনে পক্ষপাতের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তবে প্রতীক দ্রুত বিশ্বাসহীনতায় পরিণত হবে।

Advertisement

রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল হলো এই সত্য যে, মণিপুরের সংঘাত একক পরিচয়ভিত্তিক নয়। এটি ভূমি, প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক মর্যাদা, সুরক্ষা এবং ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যার সমষ্টি। ফলে কোনও এক সম্প্রদায়ের দাবিকে মেটাতে গিয়ে অন্যের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি জন্মালে সংঘাত নতুন রূপ নেবে। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বা পৃথক কাঠামোর দাবি তাৎক্ষণিক সমাধান বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

অতএব রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা হতে হবে ত্রিস্তরীয়। প্রথমত, নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে না আনলে কোনো সংলাপই বিশ্বাসযোগ্য হবে না। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া— হিংসাত্মক ঘটনাবলীর তদন্ত, দায় নির্ধারণ ও বিচার— স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে। বিচারহীনতা সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ। কেবল রাজনৈতিক দলগুলির বৈঠক নয়, বরং নাগরিক সমাজ, ছাত্র সংগঠন, মহিলাদের প্রতিনিধি ও প্রভাবশালী সামাজিক নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে এক প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রয়োজন।

এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কেন্দ্রীয় শাসনের পর নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন মানে রাজ্যের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের আংশিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু যদি নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রের প্রভাব অত্যধিক দৃশ্যমান হয়, তবে স্থানীয় নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাও সম্ভব নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা।

আরেকটি বাস্তবতা হলো— শান্তিকে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। রাস্তাঘাট খোলা, অফিস চালু, বা কারফিউ শিথিল হওয়া উন্নতির সূচক হতে পারে, কিন্তু এগুলো স্থায়ী সমাধানের মানদণ্ড নয়। শান্তি তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন নাগরিকরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা অনুভব করেন। আজ মণিপুরে সেই আস্থার ঘাটতিই সবচেয়ে বড় সংকট।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে তাই একটি সংকীর্ণ সময়সীমা। যদি সরকার উত্তেজনা ‘ম্যানেজ’ করায় সন্তুষ্ট থাকে, তবে পরিস্থিতি আবারও বিস্ফোরিত হতে পারে। কিন্তু যদি সরকার ক্ষমতাকে আস্থা পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে— নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছ নীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে— তবে সহাবস্থানের নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

মণিপুরের সমাজ বহু ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও দলগত সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন সেই গুণাবলীই রাজনীতির প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের চরিত্র পুনর্নির্ধারণের। নির্বাচন স্বাভাবিকতা ফিরিয়েছে, কিন্তু শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, নৈতিক নিরপেক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

নচেৎ রাজ্য এমন এক অবস্থায় আটকে থাকবে, যেখানে নির্বাচন হবে, সরকার বদলাবে, কিন্তু সামাজিক শান্তি অধরাই থেকে যাবে।

Advertisement