• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 22 September, 2026

সৌদি আরবের তেল সংকট

তবে পরিস্থিতিকে অবধারিত বিপর্যয় হিসেবে দেখারও কারণ নেই। কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে, তেলের সরবরাহের বিকল্প পথ স্বাভাবিক হলে এবং সৌদি পাইপলাইন দ্রুত চালু হলে বাজারের উদ্বেগ কমতে পারে। ইতিমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনা এবং সৌদি তেল রপ্তানির আংশিক পুনরুদ্ধারের খবরে তেলের দাম কিছুটা নেমেছে।

সৌদি আরবের তেল সংকট

File Photo

তেলের বাজারে আবার অস্বস্তির কালো মেঘ। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু কয়েকটি দেশের রাজনৈতিক বা সামরিক সংকট হয়ে নেই, তার অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন ব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়া, ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতা এবং হরমুজ ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রেন্ট তেলের দাম ১০৫ থেকে ১০৮ ডলারের আশেপাশে উঠেছিল। যদিও ২১ সেপ্টেম্বর তা কিছুটা নেমে প্রায় ১০২ ডলারে এসেছে, তবু বাজারের অনিশ্চয়তা কাটেনি।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগরের দিকে তেল পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সম্প্রতি ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, সাম্প্রতিক সময়ে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে— যা বিশ্ব তেল সরবরাহের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তেল পৌঁছনোর পথই যদি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হবে। আর বাজার অর্থনীতিতে আশঙ্কাও অনেক সময় দামের ওপর বাস্তব প্রভাব ফেলে।

তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহনে। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক, বাস, জাহাজ ও বিমান পরিবহনের খরচও বাড়ে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। কৃষিক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে— সেচের পাম্প, কৃষিযন্ত্র, সার ও কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। ফলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেবল পেট্রোল পাম্পের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে স্বল্পমেয়াদে দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি গড়ে প্রায় ০.৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে। তবে দেশভেদে এই প্রভাবের মাত্রা আলাদা হয় এবং পরিবহন ব্যয়ের গুরুত্ব, জ্বালানি ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মতো বিষয় তার ওপর প্রভাব ফেলে।

সমস্যার আরেকটি দিক সুদের হার। তেলের মূল্যবৃদ্ধি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ বাড়বে। সুদের হার বাড়লে ঋণের খরচ বাড়ে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং মানুষের ভোগব্যয়ও কমে যেতে পারে। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি— দুই ধরনের চাপ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।

তবে পরিস্থিতিকে অবধারিত বিপর্যয় হিসেবে দেখারও কারণ নেই। কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে, তেলের সরবরাহের বিকল্প পথ স্বাভাবিক হলে এবং সৌদি পাইপলাইন দ্রুত চালু হলে বাজারের উদ্বেগ কমতে পারে। ইতিমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনা এবং সৌদি তেল রপ্তানির আংশিক পুনরুদ্ধারের খবরে তেলের দাম কিছুটা নেমেছে।

কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তিকে স্থায়ী নিশ্চয়তা বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে— বিশ্ব অর্থনীতি যতই বহুমুখী হোক, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ও জলপথের ওপর তার নির্ভরতা এখনও অত্যন্ত বেশি। তাই পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের আগুন নিভবে কি না, তার উপর শুধু তেলের দাম নয়, আগামী দিনে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সংসার খরচের হিসাবও অনেকটাই নির্ভর করছে।