• facebook
  • twitter
Sunday, 8 February, 2026

দশ মিনিটে ডেলিভারি নয়— গিগ কর্মীরা একই তিমিরে

গ্রাহককে কত ক্ষণে ডেলিভারি দেওয়া হবে, সেটা না বলা হলেও ডেলিভারি কর্মীকে টার্গেট পূরণের লক্ষ্যে পরের বরাত পেতে সেই ছুটতেই হবে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শোভনলাল চক্রবর্তী

বর্তমান দশকের প্রথম পাঁচ বছরে ‘গিগ ওয়ার্কার’ শব্দটি ভারতীয় অর্থব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করেছে— নির্দিষ্ট সংস্থার পোশাক পরে ব্যাগ পিঠে মোটরবাইক বা সাইকেলে ধাবমান কর্মীদলের সামগ্রিক পরিচিতি এই শব্দটি। এই পেশার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বটি তার নামেই নিহিত, বহুলব্যবহারে যা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ইংরেজিতে ‘গিগ’ শব্দটির লোকজ ব্যবহার হয় কোনও সাময়িক, অস্থায়ী কাজকে বোঝাতে। অর্থাৎ, ধারণাগতভাবেই পণ্য পরিবহণের এই পেশাটি অস্থায়ী, ফলে তার চরিত্রও তেমনই। কিন্তু, ভারতে কর্মসংস্থানের অবস্থা এমনই যে, বহু মানুষের কাছে এটিই নির্বিকল্প পেশা, হয়তো আজীবন জীবিকা। সংঘাতের সূত্রপাত এখানেই— সংস্থাগুলি বিলক্ষণ জানে যে, এই ক্ষেত্রে ‘ডেলিভারি পার্টনার’ হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের কাছে এ পেশা সাময়িক সংস্থান নয়; কিন্তু ব্যবস্থাগতভাবে সে কথা স্বীকার করতে তারা নারাজ। গত বছরের শেষ দিন গিগ শ্রমিকরা যে কারণগুলিতে দেশব্যাপী ধর্মঘট ডেকেছিলেন, তাতে এই দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। তাঁদের ধর্মঘট সেভাবে সফল হয়নি, বর্ষশেষে রেকর্ড পরিমাণ অনলাইন ডেলিভারি হয়েছে, সে কথা সত্য।

Advertisement

ধর্মঘট যে আজকের দুনিয়ায় দাবিদাওয়া আদায়ের উৎকৃষ্টতম পন্থা নয়, সে কথাও সত্য। তেমনই এ কথাটিও সত্য যে, ভারতে গিগ কর্মীরা যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য হন, প্রকৃত ধনতন্ত্র তাকে সমর্থন করে না। কার্ল মার্ক্স বহু আগেই বলেছিলেন যে পুঁজির প্রবণতা হল মুনাফা যেখানে বেশি, সেখানে আইন, নৈতিকতা ও মানবিকতা সবই পদদলিত হয়। গিগ ইকোনমি সেই সত্যের আধুনিক রূপ। এখানে শ্রমিক আছে, উদ্বৃত্ত শ্রম আছে, মুনাফা আছে কিন্তু শ্রমিকের অধিকার নেই। মালিক নিজেকে আড়াল করেছে ‘প্ল্যাটফর্ম’ নামক এক প্রযুক্তিগত পর্দার আড়ালে, আর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে অ্যালগোরিদমের হাতে। এই অ্যালগোরিদমই আজকের দিনের সুপারভাইজার। সে ঠিক করে দেয় কে কতক্ষণ কাজ করবে, কে কত আয় করবে, কে শাস্তি পাবে, আর কাকে এক মুহূর্তে কাজ থেকে ছেঁটে ফেলা হবে। কোনও লিখিত চার্জশিট নেই, কোনও শুনানি নেই। আছে শুধু ‘আইডি ব্লক’। এটি পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থারই এক নতুন, আরও নির্দয় রূপ। ধর্মঘটের ঘোষণার পর কর্পোরেট প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ পূর্বানুমেয়। বছরের সবচেয়ে লাভজনক সময় নিউ ইয়ার্স ইভে ব্যবসা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানিগুলি হঠাৎ করেই ডেলিভারি ইনসেনটিভ বাড়ানোর ঘোষণা করে।

Advertisement

কোথাও প্রতি অর্ডারে অতিরিক্ত টাকা, কোথাও কয়েক হাজার টাকা আয়ের প্রলোভন, আবার কোথাও সাময়িকভাবে পেনাল্টি তুলে নেওয়ার ভান। এই আচরণ আসলে প্রমাণ করে যে, কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছে শ্রমিকের অধিকার নয়, শ্রমিকের উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ, তাও কেবল মুনাফার স্বার্থে। লেনিন বলেছিলেন যে পুঁজিবাদ সঙ্কটে পড়লেই তার আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। এই ইনসেনটিভ ঘোষণাও তেমনই এক মুহূর্ত। যদি আজ অতিরিক্ত টাকা দেওয়া যায়, তবে সারা বছর তা দেওয়া হয় না কেন? কেন দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণের জন্য রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়? কেন কোনও আইনি সুরক্ষা ছাড়াই শ্রমিককে পার্টনার বলে দায় ঝেড়ে ফেলা হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর কর্পোরেট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে নেই। কারণ এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি, যেখানে শ্রমিককে শ্রমিক বলা হবে না বরং তাকে বলা হবে ‘পার্টনার’। কিন্তু মার্ক্সবাদ আমাদের শেখায়, উৎপাদনের উপকরণের মালিক যে, সেইই মালিক শ্রেণী এবং আর যে শ্রম বিক্রি করে বাঁচে, সে শ্রমিক। নাম বদলালেই সম্পর্ক বদলায় না।

এই ধর্মঘট তাই শুধুই মজুরির প্রশ্ন নয়। এটি শ্রেণী স্বীকৃতির লড়াই। এটি সেই লড়াই, যেখানে গিগ শ্রমিকরা স্পষ্টভাবে বলছেন যে, তাঁরা ইনসেনটিভের ভিক্ষা চান না, তাঁরা নিজেদের শ্রমিক হিসেবে অধিকার বুঝে নিতে চান। এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হোক, যেখানে শ্রমিকের জীবন পুঁজির মুনাফার চেয়ে কম দামি হবে না। শব্দ বদল হল, কিন্তু তার বেশি কিছু বদলাল কি? ১০ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচার বদলে ফেলা হলেও এখন এমনই প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন ‘কুইক কমার্স’ (দ্রুত পণ্য পৌঁছনো) সংস্থায় সরবরাহের কাজে যুক্ত কর্মীরাই। তাঁদের দাবি, আদতে কিছুই বদলায়নি। আগের মতোই এখনও অ্যাপ-নির্ভর ‘অ্যালগরিদম’ই নিয়ন্ত্রণ করবে সমস্তটা। দেখা হবে, কোন ডেলিভারি কর্মী কম সময়ে, কত সংখ্যক অর্ডার পৌঁছেছেন। দেখা হবে, তার ভিত্তিতে তিনি কত ‘রেটিং’ পেয়েছেন।

ফলে, দ্রুত পণ্য পৌঁছনোর প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে, এমন আশা করছেন না তাঁরা। এর সঙ্গেই থাকছে আগের মতো উৎসাহ-ভাতার হাতছানি। ‘ডেলিভারি টার্গেট’ পূরণ করে সেই অতিরিক্ত আয়ের জন্য বেপরোয়া বাইক ছোটানো আদৌ বন্ধ হবে না বলেই আশঙ্কা অনেকের। আগের ১০ মিনিটে ১০ হাজারের বেশি পণ্য ডেলিভারি’র ক্যাচলাইন ছিল। এখন তা বদলে করা হয়েছে, ৩০ হাজারের বেশি পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আপনার দোরগোড়ায়। কত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি করা হবে, সেটা তুলে দেওয়া হলেও কত সংখ্যক পণ্য পৌঁছনো হয়েছে, সেই সংখ্যাটা রেখে দেওয়া হয়েছে। কারণ, কুইক কমার্স সংস্থায় একটি গোটা দিনে কত পণ্য পৌঁছনো গেল, সেই হিসাব সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, মুখে না বললেও কম সময়ে বেশি সংখ্যক পণ্য ডেলিভারি করাতে সেই ছোটানোই হবে ডেলিভারি কর্মীদের। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে অ্যাপে লগ-ইন করে থাকতে হয় ডেলিভারি কর্মীদের। প্রতিদিন আলাদা আলাদা ইনসেনটিভ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতগুলি ডেলিভারি করতে পারলে ইনসেনটিভ পাওয়া যাবে, তা-ও অ্যাপেই জানিয়ে দেওয়া হয়।

গ্রাহককে কত ক্ষণে ডেলিভারি দেওয়া হবে, সেটা না বলা হলেও ডেলিভারি কর্মীকে টার্গেট পূরণের লক্ষ্যে পরের বরাত পেতে সেই ছুটতেই হবে। দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে পারলে গ্রাহকের থেকে ভাল রেটিং পাওয়ার আশা থাকে। রেটিং যত ভাল হয়, ততই বেশি ডেলিভারির বরাত পাওয়া যায়। অনেক দাবিদাওয়া সামনে রেখে গিগ কর্মীরা আন্দোলন করেছিলেন। তার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তার ব্যাপারে গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে কিছু না করে শুধু ‘১০ মিনিটে ডেলিভারি’র এই প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ১০ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়া হল কিনা, সে তো কুইক কমার্স সংস্থা আর গ্রাহকের বোঝাপড়ার ব্যাপার। এতে ডেলিভারি কর্মীদের জীবনে পরিবর্তন আসবে না। একটি পণ্য ডেলিভারি করে পরের ডেলিভারির বরাত পেতে কর্মীকে লাইনে দাঁড়াতে হয় কেন? কারণ, তাঁদের জীবনের নিশ্চয়তা নেই। আসলে বিজ্ঞাপনের শব্দে বদল হল, ডেলিভারি কর্মীদের ঝুঁকি বদলায়নি।দশ মিনিটে জিনিস পৌঁছে দিতে জীবন-মরণ দৌড়ের বাধ্যবাধকতা, কোনও স্বচ্ছ নিয়ম না মেনেই হঠাৎ রেটিং কমিয়ে দেওয়া, মজুরি কাটছাঁট বা কাজ থেকে বহিষ্কার— যে পুঁজি শ্রমশক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থায়ী সম্পর্ক চায়, এগুলি তার পথ নয়। তবু ভারতের গিগ অর্থনীতি এ পথেই হাঁটছে, তার কারণ— গিগ অর্থ যে ভারতে বহু মানুষের কাছেই সাময়িক কাজ নয়, বিকল্পহীন বাধ্যবাধকতা, এ কথাটি তারা একই সঙ্গে অস্বীকার করে, এবং বোঝে। দশ মিনিটে ডেলিভারি, বা কার্যত নিখরচায় বাড়িতে বসে পণ্য পাওয়ার মতো যে বিলাসিতা উন্নত দুনিয়ায় অকল্পনীয়, ভারতে তা অতি স্বাভাবিক বাস্তব। কারণ একটিই— প্রকৃত কর্মসংস্থানের অভাবে বাজারে অতি সস্তা শ্রমের জোগান। শ্রমের জোগান সস্তা হলে শিল্পক্ষেত্রে তার চাহিদা বাড়বে, শ্রমনিবিড় ব্যবসা তৈরি হবে বা তা ফুলেফেঁপে উঠবে, স্বাভাবিক।

এখানে দু’টি ভিন্ন প্রশ্ন করা প্রয়োজন। ‘দশ মিনিটে ডেলিভারি’-র মতো ব্যবসায়িক উদ্যোগ সফল হয় তখনই, যখন ক্রেতাদের মধ্যে তার চাহিদা থাকে। এই চাহিদা নিতান্তই তৈরি করা, কারণ আজ থেকে এক দশক আগে কেউ ভাবতেই পারতেন না যে, অনলাইনে কিছু কেনার কার্যত সঙ্গে সঙ্গে সে পণ্য বাড়িতে পৌঁছে যাবে। এতে ক্রেতার সুবিধাও হচ্ছে নিশ্চিত। তবে, নৈতিক ভোগবাদ বস্তুটি যদি নিতান্ত সোনার পাথরবাটি না হয়, তবে এই ধরনের পরিষেবা ক্রয় করার আগে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানো ক্রেতার কর্তব্য নয় কি? এ কথা কি ভাবা উচিত নয় যে, এই চাহিদা বহু মানুষকে আরও বেশি শোষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? অতি সামান্য মূল্যে যথেচ্ছ পরিষেবা কিনতে পারার ‘স্বাধীনতা’য় ক্রেতারা এই ‘ডেলিভারি পার্টনার’দের ক্রমশ যন্ত্র হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত হচ্ছেন? কেউ পাল্টা যুক্তি দিতে পারেন যে, এই চাহিদা আছে বলেই কর্মসংস্থান হচ্ছে। কথাটি একই সঙ্গে ঠিক এবং ভুল। ক্রেতা যদি নৈতিকতাকে নিজেদের চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করেন, শিল্পক্ষেত্রও তাকে মর্যাদা দিতে বাধ্য। অনৈতিক উৎপাদনের বিরুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে ক্রেতাদের আপত্তি বহু উৎপাদককে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। তবে, ক্রেতার চেয়েও বেশি দায়িত্ব সরকারের। নতুন শ্রম বিধিতে গিগ অর্থনীতির স্বীকৃতি আছে, শ্রমিকদের জন্য ‘পোর্টেবল’ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, তা কোনও মতেই যথেষ্ট নয়। শ্রমিকের কাজের শর্ত ‘মানবিক’ করা ধনতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত। তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।

Advertisement