• facebook
  • twitter
Thursday, 12 February, 2026

লড়ছে মমতা, দেখছে জনতা

গত ২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে, ৩ ফেব্রুয়ারি দিল্লির মিডিয়ার সামনে, ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে।

নিজস্ব চিত্র

হীরক কর

ন্যায় কি সত্যিই দরজার আড়ালে কাঁদছে? একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী যখন সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেন, কোথাও বিচার মিলছে না, তখন প্রশ্নটা আর রাজনৈতিক থাকে না, সাংবিধানিক হয়ে যায়।
ভোটের আগে ভোটার তালিকার নামে কী চলছে পশ্চিমবঙ্গে,— সংশোধন না কি সুপরিকল্পিত ছাঁটাই? এআই, মাইক্রো অবজারভার আর ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র আড়ালে কারা, কাদের নাম মুছে দিচ্ছে? যখন জীবিত মানুষ ‘মৃত’, আর ন্যায় বিচার চুপ। তখন এই লড়াই কি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, নাকি দেশের গণতন্ত্রেরই?

Advertisement

সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও ন্যায় মিলছে না— ন্যায় যেন দরজার আড়ালে কাঁদছে। এই কথাগুলো কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সামনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ আর্তি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি দলের জন্য নয়, লড়ছেন ন্যায়ের জন্য। সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে নিজের দায়ের করা মামলায় নিজেই সওয়াল করে অভিযোগ তোলেন, নির্বাচন কমিশন এখন কার্যত ‘হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন’। ছ’বার চিঠি লিখেও কোনও জবাব তিনি পাননি। তাই শেষ ভরসা হিসেবে এসআইআর মামলার শুনানিতে নিজের বক্তব্য রাখার অনুমতি চান। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সেই অনুমতি দিলে, আবেগ নয়— একজন মুখ্যমন্ত্রীর শেষ দায়িত্বের মতো নিজের কথা বলছেন তিনি।

Advertisement

এসআইআর ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক ময়দানে নেমেছেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে, ৩ ফেব্রুয়ারি দিল্লির মিডিয়ার সামনে, ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে।

মূল ধারার মিডিয়ার বড় অংশ একে ‘নন ইস্যু’ বলে উড়িয়ে দিলেও বাস্তব আলাদা। তাদেরই কিছু সংবাদপত্রে দেশের নানা প্রান্তে এসআইআর-এর নামে আপিল ছাড়াই, ফর্ম সেভেন ছাড়াই, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটার নাম কেটে দেওয়ার খবর ছাপা হয়েছে।

৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাকে টার্গেট করা হচ্ছে। চার রাজ্যে ভোট। ২৪ বছর পর যে কাজ সাধারণত দু’বছরে হয়, তা তিন মাসে শেষ করার তাড়া কেন? ফসল কাটার সময়, মানুষের যাতায়াতের ভিড়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া কেন?

তিনি অভিযোগ তোলেন— এআই ব্যবহার করে ভোটার নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। উচ্চারণ ও উপভাষার কারণে নামের সামান্য পরিবর্তন এআই ধরতে পারছে না। অত্যন্ত অর্থবহ বিষয় হলো, প্রধান বিচারপতি বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করেন। বলেন— এ ধরনের ভুলে কোনও বৈধ ভোটার বাদ পড়তে পারে না। কমিশন দায় এড়াতে পারে না।

নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু বলেন, এই অভিযোগগুলোর কথা তাঁদের জানা নেই, তাঁরা এক সপ্তাহ সময় চান। প্রধান বিচারপতি কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন— এক সপ্তাহ অনেক দেরি। প্রক্রিয়ার সময়সীমা আছে। ১০ দিনের বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে, এখন হাতে মাত্র চার দিন। আর কোনও ‘লাক্সারি টাইম’ নেই।

এই প্রেক্ষাপটেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাটা আরও ভয়ংকরভাবে সত্যি শোনায়, সব কিছু কি তবে সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে? কোথাও ন্যায় মিলছে না—ন্যায় যেন দরজার আড়ালে কাঁদছে। সুপ্রিম কোর্টের ভিডিও স্ট্রিমিংয়েই দেখা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে সামনের সারিতে বসে আছেন। সামনে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ— প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পঞ্চোলি শুনানি শুনছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জানান, কীভাবে বানান বা উপাধির সামান্য পরিবর্তনের অজুহাতে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। এতে বিস্মিত হয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন— এমনটা হওয়ার কথা নয়। এই অভিযোগ শুধু আদালতেই নয়, ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন ও দিল্লির মিডিয়ার সামনেও তিনি তুলেছেন, এসআইআর-এর শিকার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে।

তাঁদের মধ্যে অনেকেই জীবিত, অথচ ‘মৃত’ দেখিয়ে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এভাবে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে— কোনও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই। আরও ১ কোটি ৪ লক্ষ ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’-র নামে নোটিস দেওয়া হয়েছে; তাদের নামও কাটার ঝুঁকিতে।

মমতা বলেন, ডুপ্লিকেট নাম কাটতে আপত্তি নেই— আমরাও বলেছি। কিন্তু এআই বসিয়ে কী করা হয়েছে? বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি গেলে ঠিকানা বদলায়। এটা আমাদের সামাজিক রীতি। সেই ‘শিফটেড’ ঠিকানাকে ‘কনসিল’ বলে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। স্বামীর উপাধি নেওয়াকেও বাতিল করা হয়েছে। এটা সরাসরি নারী-বিরোধী।

সংখ্যালঘু, আদিবাসী, তফসিলি জাতির ক্ষেত্রেও একই ছবি। উপাধির ভিত্তিতে মানুষকে এসসি, নন-এসসি, সংখ্যালঘু— এভাবে ভুল শ্রেণিবিন্যাস করে বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রধান বিচারপতির বিস্ময়ের জবাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বলেন, হ্যাঁ মি লর্ড, এটাই হচ্ছে। বিয়ের পর নাম বা বাড়ি বদলালেই নাম কাটা পড়ছে। দরিদ্র কেউ ঠিকানা বদলালে তাকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ নয়, আদালতের চাপে এখন ‘ইনকারেক্ট ম্যাপিং’ বলা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—আদালতের নির্দেশও কি অমান্য করা হবে?

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ যাচাই করতে কমিশনের সঙ্গে কর্মকর্তাদের একটি টিম পাঠিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে— এটা নামের ভুল, না কি কেবল উপভাষার পার্থক্য। এর সংশোধন হতেই হবে। সরকারকে জবাব দেওয়ার জন্য একদিন সময় দেওয়া হবে।

মমতা আরও বলেন, কমিশনের সামনে বিরোধীরা অভিযোগ নিয়ে গেলে যে আচরণ দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্ট কখনও তা করেনি। আদালত কখনও বলেনি— ভোটে হারার ভয়ে মিথ্যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে বা অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করা হচ্ছে। তবু সত্য হল, বিহার পর্ব থেকে এসআইআর নিয়ে এত নির্দেশের পরও শুনানি শেষ হয়নি, রায় আসেনি।

নির্বাচন কমিশন–সংক্রান্ত এই মামলায় আপাতত রায় স্থগিত রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য আদালত শুনেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়— ২ ফেব্রুয়ারি তিনি যখন দলের সাংসদদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়েছিলেন, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল? এর সরকারি সত্য প্রকাশ্যে আসা জরুরি। কমিশন ‘সূত্র’-র আড়ালে লুকোতে পারে না।

মমতা অভিযোগ করেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁকে অপমান করেছেন। বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে এসে তিনি প্রকাশ্যে বলেন— নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে আর কোনও ন্যায়ের আশা নেই, তাঁরা বিজেপির দালালের মতো আচরণ করছে। বিহারেও এসআইআর চলাকালে বিরোধী সাংসদরা একই অভিযোগ তুলেছিলেন। যদি এমন আচরণ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়, তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে হওয়া প্রতিটি বৈঠক ক্যামেরাবন্দি হওয়া এবং বিতর্ক উঠলে সেই রেকর্ডিং প্রকাশ করা উচিত।

এসআইআর নিয়ে মমতার অভিযোগ গুরুতর। তিনি দেখিয়েছেন— এআই ব্যবহারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা হচ্ছে, জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ দেখানো হচ্ছে, বিয়ের পর ঠিকানা বা উপাধি বদলালেই নাম বাদ পড়ছে। ৫৮ লক্ষ নাম ইতিমধ্যেই কাটা হয়েছে, আরও ১ কোটি ৪ লক্ষ ঝুঁকিতে। তাঁর দাবি, যেসব আসনে তৃণমূল জেতে সেখানে হাজার হাজার নাম কাটা হয়েছে, বিজেপি-জেতা আসনে তুলনামূলক কম।

বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা মাইক্রো অবজারভারদের ভূমিকা নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা ইআরও-র ক্ষমতা কার্যত দখল করে নাম মুছে দিচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, বানানের গরমিল বা উপভাষার কারণে নাম কাটার আগে সংবেদনশীল হতে হবে, প্রয়োজনে বিএলও-র সই বাধ্যতামূলক করা হবে। এই নির্দেশটাই মমতার বড় সাফল্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য স্পষ্ট, ভোটের আগেই ভোটার তালিকার নামে বড়সড় খেলা চলছে। তিনি প্রশ্ন তুলছেন, এত নাম কাটার পর কতজন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছে? সীমান্ত কেন্দ্রের হাতে, তবে দায় কার? আজ একজন মুখ্যমন্ত্রী বলছেন— সব দরজা বন্ধ। বার্তাটা পরিষ্কার: গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষের অবস্থাও ঠিক এমনই হয়ে যাচ্ছে।

এসআইআর নিয়ে মমতার দায়ের করা মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি। তৃণমূল সূত্রে খবর পেয়েছি, সেদিনও সুপ্রিম কোর্টের সওয়াল করতে পারেন বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা করেছেন, তা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে অভূতপূর্ব তো বটেই, তবে একই সঙ্গে ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক অনবদ্য পোস্টারিং পলিটিক্স । ভোটের আর দু-মাসও বাকি নেই। সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালকে ভোটের প্রচারের হাতিয়ার করে ফেললেন মমতা। সাধারণ মানুষকে বার্তা দিতে চাইলেন, এই দেখুন আপনাদের জন্য লড়েই চলেছেন মমতা ব্যানার্জি। মাঠে লড়ছেন, ময়দানে লড়ছেন, সুপ্রিম কোর্টেও স্বয়ং লড়ছেন।

মানুষের কাছে এই রকম একটা বার্তা পৌঁছল যে, সাধারণ গরিব মানুষের নাম ভোটার তালিকায় রাখার জন্য শুধু মাঠে-ময়দানে বা বক্তৃতামঞ্চে নয়, তিনি সুপ্রিম কোর্টেও লড়ছেন। এই রকম একটা অপটিক্স তৈরি হয়ে গেল যে, লড়ছে মমতা, দেখছে জনতা ।

Advertisement