দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস লড়াইয়ের পর বিশ্ব জুড়ে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) World Malaria Report 2025 একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথাও জানাচ্ছে।
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচানো গিয়েছে, এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। এই অঞ্চলের ১৭টি ম্যালেরিয়া-প্রবণ দেশের মধ্যে ১০টিতেই আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। এতদিনের পরিকল্পিত উদ্যোগ, ওষুধ, নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির সাফল্য এখানে স্পষ্ট।
Advertisement
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে জমে উঠছে ভয়ানক কিছু সংকেত। রিপোর্ট বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ২০ লক্ষ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ৬ লক্ষ ১০ হাজার, যেখানে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ লক্ষ ৯৮ হাজার। অর্থাৎ, বহু দেশে অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি এখনও বিপজ্জনক।
Advertisement
এই সংকটের পেছনে দুটি বড় কারণ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। প্রথমত, ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি। বিশেষ করে আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত ভয় ধরাচ্ছে। এই ওষুধই এতদিন ম্যালেরিয়ার প্রধান অস্ত্র ছিল। যদি এই ওষুধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে গত কয়েক দশকের অর্জন খুব দ্রুত ভেস্তে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক সংকট। ২০২৪ সালে ম্যালেরিয়া দমনে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩.৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় কম। অথচ WHO নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯.৩ বিলিয়ন ডলার। বাস্তবে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ জোগাড় করা গিয়েছে। উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় বহু দেশে নজরদারি ব্যবস্থা, ওষুধ সরবরাহ ও জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্য ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র WHO থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে এই অর্থসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যেও ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। ২০২৪ সালে ভারতের অধিকাংশ জেলাতেই ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ কমেছে। সরকারি দাবি অনুযায়ী, দেশে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে, আর মৃত্যু কমেছে ৭৮ শতাংশ। একসময় যেখানে ভারত ছিল উচ্চ-ঝুঁকির দেশ, এখন সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের ভারতের লক্ষ্য তাই একেবারে অলীক নয়।
তবু আত্মতুষ্টির কোনও সুযোগ নেই। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০২৪ সালে যে ৩,৯০০ জন ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন, তার প্রায় ৮৯ শতাংশই ভারতের। অর্থাৎ সামগ্রিক উন্নতির পাশাপাশি কিছু রাজ্য ও অঞ্চলে এখনও ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। সেখানেই নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা সবচেয়ে জরুরি।
ভারতের একটি বড় সাফল্য হল, সংযোজিত ওষুধ চিকিৎসা (combination therapy) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং মুখে খাওয়ার আর্টেমিসিনিন একক ওষুধ নিষিদ্ধ রাখা। উচ্চ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স থাকা সত্ত্বেও এই নীতির ফলে ওষুধের কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে।
ম্যালেরিয়া-মুক্ত পৃথিবীর জন্য এখন প্রয়োজন নতুন করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আর্থিক প্রতিশ্রুতি। আরও অর্থ বরাদ্দ, নতুন প্রজন্মের ওষুধ ও ভ্যাকসিনে বিনিয়োগ, এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা— এই তিনটি দিকেই একযোগে কাজ করতে হবে। না হলে এতদিনের সাফল্য ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যাবে।
ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই এখনও শেষ হয়নি। বরং এই মুহূর্তে প্রয়োজন আরও দৃঢ়, আরও সমন্বিত এবং আরও দূরদর্শী উদ্যোগ— বিশ্বজুড়ে এবং দেশীয় স্তরে।
Advertisement



