ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু পশ্চিম এশিয়ার জ্বলন্ত সংঘাতে এক যুগান্তকারী মোড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি ব্যক্তির পতন নয়, এটি একটি যুগের অবসান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সূচনা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কঠোর হাতে ইরান শাসন করেছেন। তাঁর আমলে পশ্চিমবিরোধী অবস্থান ছিল রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে, আর দেশের অভ্যন্তরে সংস্কারপন্থী বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর প্রায়শই দমিত হয়েছে। ফলে তাঁর বিদায়ে অনেকের চোখে সম্ভাবনার একটি দিক খুলে গেলেও সেই সম্ভাবনা কতটা স্থিতিশীল, তা নিয়ে সংশয় প্রবল।
খামেনি-বিরোধীরা আশা করতে পারেন, এই আঘাত ইরানের রক্ষণশীল ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকার দখলের আহ্বান জানিয়েছেন। কিছু জায়গায় খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের খবরও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু ইরানের সাধারণ মানুষ কি আরেক দফা অস্থিরতার পথে হাঁটতে প্রস্তুত? প্রতিবেশী ইরাকের অভিজ্ঞতা তাঁদের সামনে স্পষ্ট— এক স্বৈরশাসকের পতন কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা, গৃহদ্বন্দ্ব ও বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়। তাই স্বৈরাচারের বদলে অরাজকতা আসুক, এমনটা অধিকাংশ ইরানি নিশ্চয়ই চাইবেন না।
Advertisement
প্রশ্ন হচ্ছে, তেহরানের পুরনো কাঠামো কি ভেঙে পড়বে, নাকি আরও কঠোর রূপে আত্মপ্রকাশ করবে? ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তী নেতৃত্বে আলী রেজা আরাফির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট, ইরানের শাসকগোষ্ঠী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল না। বরং অনুমান করা যায়, খামেনি নিজেই সম্ভাব্য উত্তরাধিকার রূপরেখা তৈরি করে গিয়েছিলেন। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতা পদটি কেবল আধ্যাত্মিক নয়, সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপরও গভীর প্রভাব বিস্তার করে। সেই ক্ষমতার কেন্দ্র দ্রুত পূরণ করার উদ্যোগ বুঝিয়ে দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেকে টিকিয়ে রাখতে প্রস্তুত।
Advertisement
তবে বহির্বিশ্বের দৃষ্টিতে এখন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন, ইরান কি প্রতিশোধে আরও আক্রমণাত্মক হবে? আঞ্চলিক উত্তেজনা ইতিমধ্যেই তীব্র। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া— পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে সংঘাতের আগুন জ্বলছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরান যদি প্রতিক্রিয়ায় আরও কড়া পদক্ষেপ নেয়, তবে সংকট বহু গুণ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক চাপও ক্রমে বাড়ছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, এমন সংকটে যুক্তি ও সংযমের চেয়ে আবেগ ও প্রতিশোধপ্রবণতা প্রায়ই প্রাধান্য পায়।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও আলোচ্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ কতটা কৌশলগত, আর কতটা রাজনৈতিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দেশে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আইনি টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে বিতর্ক এবং কমতে থাকা জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপটে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে নিরস্ত্র করা তাঁর কাছে রাজনৈতিক লাভের হিসাব হতে পারে। কিন্তু মজার কথা, ক্ষমতায় আসার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশ্বজুড়ে নতুন যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়াবেন না। তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা যেখানে কূটনীতির পথ খুঁজেছিলেন, সেখানে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন সামরিক হস্তক্ষেপ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যখন আলোচনা চলছিল, তখনই এই হামলা হয়েছে, যা ইরানের ভাষায় বিশ্বাসভঙ্গের সামিল। ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, ইরানের দমনমূলক শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারলে ইতিহাস তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখবে। কিন্তু তাঁর পূর্বসূরিদের কেউই সে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি। বহিরাগত শক্তির চাপ প্রায়শই জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়, শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে সাময়িকভাবে স্তিমিত করে। ফলে ইরানের ভেতরে যে গণঅসন্তোষ ছিল, তা বিদেশি হামলার মুখে একত্রিত প্রতিরোধে রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এই অভিযানের সাফল্য, যদি তা আদৌ আসে, তার মূল্য কত? একটি রক্তাক্ত ও বিভক্ত পশ্চিম এশিয়া, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, শরণার্থীর ঢল এবং আন্তর্জাতিক শক্তির নতুন মেরুকরণ— এই সবই সম্ভাব্য পরিণতি। খামেনির মৃত্যু হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তার পরবর্তী অধ্যায়ে শান্তির নিশ্চয়তা নেই। বরং অনিশ্চয়তার কালো মেঘ আরও ঘন হয়েছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণেরই। বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে—কিন্তু তা স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দেয় না। পশ্চিম এশিয়ার এই জটিল সমীকরণে এখন প্রয়োজন সংযম, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে নতুন সমঝোতার উদ্যোগ। অন্যথায়, এক স্বৈরশাসকের অবসান হয়তো ইতিহাসে বড় ঘটনা হয়ে থাকবে, কিন্তু তার ছায়ায় গোটা অঞ্চল ডুবে যাবে আরও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার এক গভীর অন্ধকার পর্বে।
Advertisement



