কিছু মানুষের জীবন হয়ে ওঠে যেন এক-একটি উপন্যাস। সেখানে থাকে উত্থান, পতন, প্রেম, অর্থ, ক্ষমতা, প্রতারণা, কারাবাস। আর থাকে বারবার শূন্য থেকে উঠে দাঁড়ানোর এক অদম্য জেদ। জেফ্রি আর্চার ছিলেন তেমনই এক মানুষ। তাঁর লেখা উপন্যাসের কাহিনি যতটা নাটকীয়, তাঁর নিজের জীবন তার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, একজন অসাধারণ গল্পকার শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের সত্য আর নিজের তৈরি গল্পের মধ্যে সীমারেখাটি মুছে ফেলেছিলেন।
জেফ্রি হাওয়ার্ড আর্চারের জন্ম ১৯৪০ সালের ১৫ এপ্রিল, লন্ডনের উত্তরাংশে। শৈশব থেকে তাঁর জীবন ছিল নানা বৈপরীত্যে ভরা। পড়াশোনায় অসাধারণ সাফল্য ছিল না, কিন্তু নিজের চেহারা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। জীবনের শুরুতে নানা কাজ করেছেন—সেনাবাহিনী, পুলিশ, শরীরচর্চার শিক্ষকতা। পরে অক্সফোর্ডে পড়ার সুযোগ পান। সেখানেই তাঁর জীবনের দরজা খুলে যায় রাজনীতি, সমাজ ও উচ্চবিত্তের জগতে।
আর্চারের একটি অসাধারণ গুণ ছিল মানুষের মন জয় করার ক্ষমতা। তিনি জানতেন কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়। কথাবার্তায় আকর্ষণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষার আগুন এবং সাফল্যের প্রতি এক অদম্য ক্ষুধা তাঁকে খুব দ্রুত রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়। কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হয়ে ১৯৬৯ সালে লিঙ্কনশায়ারের লাউথ কেন্দ্র থেকে সংসদে নির্বাচিত হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ঊনত্রিশ।
রাজনীতিতে তাঁর শুরুটা ছিল উজ্জ্বল। তিনি দলের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী মুখ হিসেবে পরিচিত হন। কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় তাঁকে দ্রুত সংসদ থেকে ছিটকে দেয়। একটি কানাডীয় সংস্থায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে তিনি প্রতারিত হন। ঋণ করে করা সেই বিনিয়োগ ডুবলে দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালে সংসদ ছাড়তে হয় তাঁকে।
অনেকের জীবন সেখানেই থেমে যায়। আর্চারের থামার অভ্যাস ছিল না। তিনি কলম ধরলেন। এবং সেই কলমই তাঁকে আবার তৈরি করল। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নট আ পেনি মোর, নট আ পেনি লেস’। নিজের আর্থিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতাও সেখানে কাহিনির উপাদান হয়ে উঠেছিল। সমালোচকেরা খুব উৎসাহ দেখাননি, কিন্তু পাঠকেরা দেখালেন। বই বিক্রি হল, অর্থ এল, এবং আর্চার বুঝে গেলেন— রাজনীতির মঞ্চ তাঁকে যতটা দেয়নি, গল্পের মঞ্চ তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে পারে।
তারপর এলো ‘কেন অ্যান্ড অ্যাবেল’। দুই ভিন্ন পৃথিবীর দুই মানুষের জীবন, অর্থ ও সাফল্যের জন্য তাদের লড়াই— বইটি তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিল। এরপর ‘ফার্স্ট অ্যামং ইকুয়্যালস’। রাজনীতির অন্তর্লোক নিয়ে লেখা এই উপন্যাস যেন আর্চারের নিজের অসমাপ্ত রাজনৈতিক স্বপ্নেরই সাহিত্যিক প্রতিধ্বনি। পাঠককে পাতা ওলটাতে বাধ্য করার এক বিশেষ কৌশল তাঁর ছিল। তাঁর ভাষা হয়তো সাহিত্যসমালোচকের কাছে মহৎ গদ্যের আদর্শ ছিল না, চরিত্রের গভীরতাও অনেক সময় সীমিত; কিন্তু গল্প বলার গতি এবং কৌতূহল ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
সাহিত্য তাঁকে বিপুল অর্থ দিল। তিনি কিনলেন গ্র্যান্টচেস্টারের ঐতিহাসিক ‘ওল্ড ভিকারেজ’— যেখানে একসময় কবি রুপার্ট ব্রুক বাস করতেন। লন্ডনের বিলাসবহুল পেন্টহাউস, তারকাখচিত আসর, বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসা— আর্চারের জীবন আবার ঝলমলে হয়ে উঠল।
কিন্তু রাজনীতির নেশা তিনি ছাড়তে পারেননি। মার্গারেট থ্যাচার তাঁকে কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি চেয়ারম্যান করেছিলেন। সেই পদও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ফের অন্ধকার নামে। আর্চার অভিযোগ অস্বীকার করে মানহানির মামলা করেন এবং জিতে যান। বিপুল ক্ষতিপূরণও পান। আদালতে তাঁর পক্ষে স্ত্রীর সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মনে হয়েছিল, আবারও তিনি বিপর্যয়কে জয় করেছেন।
কিন্তু এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড়। পরবর্তী সময়ে সেই মামলায় তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৯৯ সালে লন্ডনের মেয়র পদে কনজারভেটিভ প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির সময় পুরনো বন্ধুর অভিযোগ সামনে আসে— আর্চার আদালতে মিথ্যা বলেছিলেন। রাজনীতি তাঁকে আর রক্ষা করল না। ২০০০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ আনা হয়।
এবার গল্পের শেষটা তিনি নিজের মতো করে লিখতে পারলেন না। ২০০১ সালে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। চার বছরের কারাদণ্ড হল। যে মানুষটি একসময় সংসদে বসেছেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি করেছেন, তিনিই এবার কারাগারের বন্দি।
তবু আর্চার সেখানেও লেখককে মরতে দেননি। কারাগারের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন ‘মাই প্রিজন ডায়েরি’। জীবনের প্রতিটি বিপর্যয়কে তিনি যেন উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতেন। অন্য কেউ যেখানে পতন দেখতেন, আর্চার সেখানে কাহিনি খুঁজে পেতেন।
কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি আবার লিখতে শুরু করলেন। ‘দ্য ক্লিফটন ক্রনিকলস’ দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকদের ধরে রাখল। পরে এল উইলিয়াম ওয়ারউইককে নিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস। আশ্চর্যের বিষয়, জীবনের শেষ প্রান্তেও তাঁর লেখার গতি থামেনি। আশি পেরিয়েও তিনি লিখেছেন। ২০২৬ সালে ঘোষণা করেছিলেন, ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’ হবে তাঁর শেষ উপন্যাস।
জেফ্রি আর্চারের জীবন তাই শুধু একজন জনপ্রিয় লেখকের জীবন নয়। এটি উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি উপাখ্যান। সাফল্য মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে, আবার নিজের তৈরি মিথ্যা তাকে কত গভীর খাদে ফেলতে পারে— তারও এক নির্মম উদাহরণ।
তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এই নয় যে, তিনি ভালো লেখক ছিলেন কি না। পাঠকের রায়ে তিনি নিঃসন্দেহে সফল গল্পকার। তাঁর বই কোটি কোটি পাঠককে বিনোদন দিয়েছে। কিন্তু সাহিত্যিক প্রতিভা আর নৈতিক চরিত্র এক জিনিস নয়। মানুষ একই সঙ্গে অসাধারণ প্রতিভাবান এবং গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। আর্চারের জীবনে সেই দ্বন্দ্বটিই সবচেয়ে স্পষ্ট।
তিনি জানতেন কীভাবে মানুষকে গল্পে বিশ্বাস করাতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকেও তিনি যেন একটি গল্প বানিয়ে ফেলেছিলেন— যেখানে নায়ক কখনও হারেন না, পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ান, প্রতিকূলতাকে পরাজিত করেন।
বাস্তব জীবন অবশ্য উপন্যাসের মতো নয়। সেখানে আদালতের রায় আছে, ইতিহাসের স্মৃতি আছে, মানুষের আস্থার হিসাব আছে। অর্থ দিয়ে সব ক্ষত সারানো যায় না, জনপ্রিয়তা দিয়ে সব সত্য ঢেকে রাখা যায় না।
জেফ্রি আর্চার শেষ পর্যন্ত ধনী হয়েছিলেন, বিখ্যাত হয়েছিলেন, দীর্ঘ সাহিত্যজীবন পেয়েছিলেন। কিন্তু জনজীবনে বিশ্বাস হারানোর মূল্য তাঁকে দিতেই হয়েছিল। একজন গল্পকারের জন্য এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে! তিনি সারা জীবন পাঠককে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন তাঁর গল্প, অথচ নিজের জীবনের গল্পে বিশ্বাসযোগ্যতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে দুর্বল অধ্যায়।
আর্চারের জীবন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভা মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার বিশ্বাসযোগ্যতা, তার খ্যাতি নয়। আর সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সবচেয়ে সফল গল্পকারের পক্ষেও তার হারানো শেষ পাঠটি ফিরে পাওয়া কঠিন।




