• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 26 August, 2026

মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারত

কোনও একটি সংস্থা বা অল্প কয়েকটি সংস্থার হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে উদ্ভাবনের গতি কমতে পারে এবং খরচও বাড়তে পারে। তাই একাধিক ভারতীয় সংস্থাকে একই ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকলে প্রযুক্তির মান উন্নত হবে, পরিষেবার খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় সংস্থাগুলি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারত

File Photo

মহাকাশ একসময় ছিল কেবল পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। এখন তা আর শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণাগার নয়। মহাকাশ প্রযুক্তি একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্পক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কৌশলগত শক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। যোগাযোগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি, নেভিগেশন, দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা— জীবনের বহু ক্ষেত্রই আজ মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। ফলে মহাকাশে এগিয়ে থাকা মানে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতেও এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি করা।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ-প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে আমেরিকার সাফল্য শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অর্জন ছিল না, তা বিশ্বকে তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও বার্তা দিয়েছিল। আজ সেই প্রতিযোগিতার চরিত্র বদলেছে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলিও মহাকাশ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ভারতকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় শক্তি হল তুলনামূলক কম খরচে জটিল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা। (ইসরো) বহু বছর ধরে সীমিত সম্পদের মধ্যে সাফল্যের নজির তৈরি করেছে। কিন্তু আগামী দিনের লক্ষ্য শুধু সফল উৎক্ষেপণ নয়, মহাকাশকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী শিল্প-পরিবেশ গড়ে তোলা। ভারত যদি মহাকাশ প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ভূমিকা নিতে চায়, তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পকে আরও দ্রুত এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে।

ইতিমধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলি রকেট, উপগ্রহ এবং অন্যান্য মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। দেশের তরুণ প্রযুক্তি-উদ্যোগীদের মধ্যে এই ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। এই উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতির অংশ করা জরুরি।

প্রশ্ন হল, ইসরোর ভূমিকা তাহলে কী হবে? এর উত্তর বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং তাদের পাশাপাশি আরও উচ্চাভিলাষী গবেষণায় মন দেওয়া। এমন বহু মহাকাশ অভিযান রয়েছে যার তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক লাভ স্পষ্ট নয়, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও জ্ঞানের জন্য সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে, যোগাযোগ-উপগ্রহ, উৎক্ষেপণ পরিষেবা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট কিংবা বাণিজ্যিক মহাকাশ পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ দ্রুত ফল দিতে পারে। এতে সরকারি সংস্থার ওপর চাপও কমবে, আবার নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগও বাড়বে।

বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতকে আরও একটি বিষয়ে নজর দিতে হবে— প্রতিভার অবাধ চলাচল। মহাকাশ প্রযুক্তিতে দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ভারতকে আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র করে তুলতে হবে। দেশের মেধাবীদেরও যেন অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের কারণে বিদেশে চলে যেতে না হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে বিদেশের দক্ষ পেশাদারদের ভারতীয় মহাকাশ শিল্পে কাজ করার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

পুঁজির ক্ষেত্রেও সংস্কার জরুরি। মহাকাশ প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দাবি করে। তাই বেসরকারি পুঁজির প্রবাহ সহজ করতে হবে। অবশ্য মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। ফলে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও শিল্পের বিকাশ থামিয়ে দিতে পারে। প্রয়োজন হবে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিযোগিতার পরিবেশ। কোনও একটি সংস্থা বা অল্প কয়েকটি সংস্থার হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে উদ্ভাবনের গতি কমতে পারে এবং খরচও বাড়তে পারে। তাই একাধিক ভারতীয় সংস্থাকে একই ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকলে প্রযুক্তির মান উন্নত হবে, পরিষেবার খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় সংস্থাগুলি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

মহাকাশ এখন শুধু আকাশের ওপরে পৌঁছনোর গল্প নয়, এটি আগামী দিনের অর্থনীতি ও ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ভারত ইতিমধ্যেই একটি শক্ত ভিত তৈরি করেছে। এখন সেই ভিতের ওপর সরকারি গবেষণা, বেসরকারি উদ্যোগ, দক্ষ মানবসম্পদ, সহজলভ্য পুঁজি এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ-অর্থনীতি গড়ে তোলার সময়। এই পথে এগোতে পারলে ভারত শুধু মহাকাশে সাফল্যের খবর দেবে না, বিশ্ব মহাকাশ-বাজারেও নিজের জন্য একটি স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করতে পারবে।