• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 11 October, 2026

আইআইটিতে আত্মহত্যা, শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আইআইটিগুলিতে ঘটে যাওয়া ৪৫টি ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি অথবা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির। এই পরিসংখ্যানকে নিছক সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি পরিবার, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং অপূরণীয় ক্ষতি। অবশ্য কোনও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান না করে তাকে সরাসরি জাতিগত বৈষম্যের ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এতগুলি ঘটনার মধ্যে সামাজিক বঞ্চনার অভিযোগ বারবার উঠে এলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।

আইআইটিতে আত্মহত্যা, শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Image: ANI

ভারতের আইআইটিগুলি দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এখানে পড়ার স্বপ্ন দেখেন লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। কিন্তু এই গৌরবের আড়ালে যদি জাতপাতের বৈষম্য, অপমান ও সামাজিক বঞ্চনা লুকিয়ে থাকে, তা হলে সেই শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। বিশেষ করে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের একাংশের আত্মহত্যার ঘটনা এই প্রশ্নকে বারবার সামনে নিয়ে আসছে।

আইআইটি কর্তৃপক্ষ সাধারণত দাবি করে, তাদের ক্যাম্পাসে জাতপাতের ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য নেই। কিন্তু বাস্তবের নানা ঘটনা সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। আইআইটি বম্বেতে সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর পরেও একই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের তফসিলি জাতি ও জনজাতি সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকলেও ছাত্রছাত্রীদের একাংশের অভিযোগ, সেই ব্যবস্থার উপর তাঁদের যথেষ্ট আস্থা নেই। অভিযোগ কীভাবে গ্রহণ করা হবে, তার তদন্ত কীভাবে চলবে এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে— এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়মের অভাব রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

সমস্যা আরও গভীর। অভিযোগ খতিয়ে দেখার কমিটির সদস্যদের অধিকাংশই সাধারণ শ্রেণির শিক্ষক বা অধ্যাপক। অথচ ছাত্রছাত্রীদের নম্বর দেওয়া, গবেষণার সুযোগ করে দেওয়া, সুপারিশ করা কিংবা ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবনে সাহায্য করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। ফলে কোনও ছাত্র বৈষম্যের শিকার হয়েও অভিযোগ জানাতে ভয় পেতে পারেন। তাঁর আশঙ্কা থাকতে পারে, অভিযোগের কারণে পড়াশোনা বা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সমস্যা তৈরি হবে। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকলেই তাই দায়িত্ব শেষ হয় না, সেই ব্যবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলাও জরুরি।

২০২৩ সালে আইআইটি বম্বের আম্বেদকর-পেরিয়ার-ফুলে স্টাডি সার্কেলের একটি সমীক্ষায় এই ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছিল। সমীক্ষা অনুযায়ী, বহু আইআইটিতে অভিযোগ জানানোর কমিটির জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ ছিল না। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ শোনা বা আলোচনা করার উপযুক্ত ঘরেরও অভাব ছিল। কোথাও কোথাও সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যও সহজে পাওয়া যেত না। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আইআইটিগুলিতে ঘটে যাওয়া ৪৫টি ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি অথবা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির। এই পরিসংখ্যানকে নিছক সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি পরিবার, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং অপূরণীয় ক্ষতি। অবশ্য কোনও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান না করে তাকে সরাসরি জাতিগত বৈষম্যের ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এতগুলি ঘটনার মধ্যে সামাজিক বঞ্চনার অভিযোগ বারবার উঠে এলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।

আইআইটিতে পড়াশোনার চাপ যে প্রবল, তা অস্বীকার করা যায় না। কঠিন প্রতিযোগিতা, পরীক্ষায় ভালো ফল করার চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা যে কোনও ছাত্রছাত্রীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তার সঙ্গে যদি জাত নিয়ে কটূক্তি, পদে পদে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চাপ, কিংবা সহপাঠীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়, তা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। শুধু অভিযোগের তদন্ত নয়, এই মানসিক ও সামাজিক সমস্যাগুলিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট অভিযোগ-প্রক্রিয়া, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং নিয়মিত নজরদারি। পাশাপাশি শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জাতপাতের বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনও ছাত্রের পদবি, সামাজিক পরিচয় বা সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশকে তার যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি করা চলবে না। প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সাহায্যও সহজলভ্য করতে হবে। বৈষম্যহীন, মানবিক ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।