• facebook
  • twitter
Sunday, 1 March, 2026

গণহত্যাকারী ইজরায়েলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী— লজ্জা!

আসলে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী এবং জায়নবাদী ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দু’জনেই একই ধারার পথিক।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

অজয় পাঠক

গত দুই বছর ধরে সংবাদপত্রের পাতায় আর টিভির পর্দায় মাটির ওপর সার বেঁধে শোয়ানো সাদা কাপড়ে ঢাকা শিশুদের লাশের অথবা শিশুদের গণকবরের নির্মম ছবি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। প্রতিদিন বর্বর ইজরায়েলি আক্রমণে ছোট ছোট নিথর শরীরগুলি শুয়ে পড়ছিল কবরে, বোমার শব্দে আর ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় চাপা পড়ে যাচ্ছিল পিতা-মাতার আর্তনাদ। কখনও দেখছিলাম সন্তানের লাশ কোলে তুলে হাহাকার করছেন মা, কখনও সন্তানের মৃতদেহের পাশেই শোয়ানো হচ্ছিল পিতার লাশ! আমরা ভারতবাসীরা সব দেখেও দিব্বি বেঁচে আছি খাওয়া-দাওয়া-সিনেমা-থিয়েটার-দুর্গাপুজো-কালীপুজো-বিশ্বকাপ-বিরাট-অনুস্কা-হুল্লোড়-মোচ্ছব করে, শুধু মরে গেছে ওই ফুলের মতো মানবশিশুরা!

Advertisement

কিন্তু এবার লজ্জাহীনতা আর নির্মমতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছেন আমাদেরই প্রধানমন্ত্রী৷ গত ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে হামাস গোষ্ঠীকে খতম করার নামে প্যালেস্তাইনের গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রায় আশি হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে ইজরায়েলের সামরিক বাহিনী ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স, যাদের মধ্যে ৩০ হাজার শিশু। গত ২ বছরে প্রতি ১৫ মিনিটে ১ জন প্যালেস্তিনীয় শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, ৩০ লক্ষ গাজাবাসীর বাসস্থান ধ্বংস করে তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। গাজার হাসপাতালগুলি দখল নিয়ে সেখানকার বিদ্যুৎসংযোগ ও অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে অসুস্থ শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে ইজরায়েলি সেনারা। এই ঘৃণ্য গণহত্যার ছবি যাতে সারা বিশ্বের কাছে না পৌঁছয়, সেই লক্ষ্যে প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীকেও হত্যা করেছে ইজরায়েল।

Advertisement

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে গাজাকে অবরুদ্ধ করে সেখানে শিশুখাদ্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর জোগান বন্ধ করে অধিকাংশ শিশুকেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল ইজরায়েল রাষ্ট্র। এই নিষ্ঠুর শিশুঘাতী, গণহত্যাকারী ইজরায়েল রাষ্ট্রের থেকে রাষ্ট্রীয় সন্মান নিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী! বিশ্বজুড়ে ঘৃণিত গণহত্যাকারী ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করে ইজরায়েলের সঙ্গে ‘মউ’ স্বাক্ষর করে সে-দেশ থেকে অস্ত্র আমদানির সামরিক চুক্তি করেছেন, যে অস্ত্র দিয়ে লাগাতার শিশুহত্যা, গণহত্যা চালিয়েছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। যে পুরস্কার তিনি হাসিমুখে নিয়ে আপ্লুত হলেন, সেই পুরস্কারে লেগে আছে সাধারণ প্যালেস্তিনীয় নরনারীশিশুর রক্ত আর গণহত্যার পাপের দাগ!

সারা বিশ্ব জানে, ইজরায়েলের এই হানাদারি হামাসের আক্রমণের বিরুদ্ধে কোনও তথাকথিত আত্মরক্ষা নয়, এটা একটা পরিকল্পিত গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ। বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সামরিক শক্তিসম্পন্ন ও পারমাণবিক শক্তিধর ইজরায়েলের দ্বারা নিরাপরাধ প্যালেস্তাইনবাসীর ওপর নৃশংস সামরিক আক্রমণের সামনে হামাসের মত সামান্য গোষ্ঠীর রকেট হামলা কোনও তুলনাতেই আসে না। হামাসকে দমন করা তো গণহত্যা আর দখলদারির একটি অজুহাত মাত্র।

গত ৭ অক্টোবর, ২০২৩ ইজরায়েলে যা ঘটেছে তা হল— এক অবরুদ্ধ, বন্দি জনগোষ্ঠীর মরণপণ প্রতিরোধ সংগ্রাম। গত ৭৫ বছরের ইজরায়েলের নিষ্ঠুর বেআইনি দখরদারি, গত ১৬ বছরের নির্মম অবরোধে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গাজা ভূখণ্ডের মানুষ তাঁদের জীবন-জীবিকার শেষ লড়াইটা লড়তে নেমেছেন। ইজরায়েলের দীর্ঘ অবরোধে খাদ্য, পানীয় জল, বিদ্যুৎ-সহ বেঁচে থাকার যাবতীয় রসদের অভাবে গাজা আজ বিশ্বের সর্বাধিক দারিদ্র-পীড়িত, ক্ষুধা-পীড়িত অঞ্চল। বিশ্বে সর্বাধিক শিশুমৃত্যু আর অপুষ্টি-জনিত মৃত্যু ঘটে এই গাজাতেই। গাজা এই পৃথিবীর বুকে খোলা আকাশের নিচে এক বৃহৎ কারাগার, যে কারাগারে জায়নবাদী ইহুদি মৌলবাদী রাষ্ট্র ইজরায়েল নিয়মিত তাদের উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন মানবঘাতী যুদ্ধাস্ত্রগুলির মারণক্ষমতা পরীক্ষা করে, যে যুদ্ধাস্ত্রগুলি ভারতে আমদানি করার চুক্তি করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী৷ প্রধানমন্ত্রীর ইজরায়েল সফর এবং ইজরায়েলের সঙ্গে সামরিক চুক্তি আবার দেখিয়ে দিল, ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার নির্লজ্জভাবে গণহত্যাকারী ইজরায়েলকে সমর্থন করে চলেছে। আসলে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী এবং জায়নবাদী ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দু’জনেই একই ধারার পথিক। হিন্দুত্ববাদ আর ইজরায়েলের জায়নবাদ, দুই মতাদর্শই ধর্মান্ধ-নাৎসিবাদী মতাদর্শ।

নরেন্দ্র মোদী তাঁবেদারি করেন পশ্চিমী শক্তিধর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির, যে রাষ্ট্রগুলি নিরীহ প্যালেস্তাইনবাসীর ওপর ইজরায়েলের ঘৃণ্য গণহত্যার ঘোর সমর্থক। আত্মরক্ষার নামে অগণন শিশুহত্যা ও গণহত্যাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা প্রভৃতি দেশ যাদের মদতেই মিথ্যা আত্মরক্ষার নামে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী ইজরায়েল ক্রমাগত দখলদারি আর হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশের শাসকেরা ঘৃণ্যভাবে এদেরই অনুসরণ করে ইজরায়েলের চরম মানবতা-বিরোধী অপরাধকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে চলেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জানা উচিত, গণহত্যাকারী-দখলদার ইজরায়েল একটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা-বিরোধী রাষ্ট্র, যে সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। ১৯৪৯ সালে আয়োজিত চতুর্থ জেনেভা আন্তর্জাতিক কনভেনশনে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে যুদ্ধকালীন সময়ে বা সামরিক সংঘাতে ধৃত ব্যক্তির মৌলিক অধিকারসমূহ নির্দিষ্টভাবে ও বিশদ ভাষায় নিরূপণ করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আহতদের এবং যুদ্ধাঞ্চল ও তার কাছাকাছি এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা।

এই কনভেনশন বলছে যে, ব্যক্তি নিজে ব্যক্তিগতভাবে অপরাধী নন, তাঁর জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মের অন্য কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা সংগঠিত অপরাধের জন্য তাঁকে শাস্তি দেওয়া একটি অপরাধ (‘No protected person may be punished for an offence he or she has not personally committed. Collective punishment and likewise all measures of intimidation or of terrorism are prohibited.’)। বিশ্বের গণতান্ত্রিক, সভ্য রাষ্ট্রগুলি এই নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু যে বর্ণবাদী, সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র যা মধ্যপ্রাচ্যে লুঠেরা পশ্চিমী শক্তিগুলির সামরিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে, সেই ইজরায়েল কোনও বৈধ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। তাই কোনও আন্তর্জাতিক আইন ও সভ্য নিয়ম সে মানে না। আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট বলছে, যে জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বার্থে রক্ষার স্বার্থে লড়াই করছে, তারা আত্মরক্ষার স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতেই পারে। কিন্তু কোনও অবৈধ দখলদারি শক্তি ‘আত্মরক্ষার’ অজুহাতে কোনও জনগোষ্ঠীর উপর সামরিক আক্রমণ চালাতে পারে না। ইজরায়েল হল অবৈধ ঔপনিবেশিক শক্তি, আর প্যালেস্তাইন হল পরাধীন জাতিরাষ্ট্র। প্যালেস্তাইন লড়ছে মুক্তির লড়াই, আর প্যালেস্তাইন চালাচ্ছে বেআইনি দখলদারি। ‘আত্মরক্ষা’-র কোনও প্রশ্ন এখানে অবান্তর, সাজানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সন্ত্রাসী জায়নবাদী ইজরায়েল এযাবৎ বহু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩০টি সিদ্ধান্তকে ইজরায়েল লঙ্ঘন করেছে। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৩৩ নম্বর ধারা বলছে, কোনও অসামরিক জনগোষ্ঠীকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিলে সেটা যুদ্ধাপরাধ, কাজেই ইহুদী মৌলবাদী ইজরায়েল রাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী। পাঁচ লক্ষ বহিরাগত ইহুদী এসে প্যালেস্তাইনের জমি দখল করেছিল, সাড়ে ৭ লক্ষ প্যালেস্তাইনবাসীকে উৎখাত করা, ১৯৬৭ সালে গাজা, পূর্ব জেরুজালেম ও ওয়েস্টব্যাঙ্ক দখল করার সময় আরও ৩ লক্ষ মানুষকে বিতাড়ন করেছিল— এই সবই চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৪৪ নং ধারাকে লঙ্ঘন করে। আর অপরাধকে সমর্থন করা, তার থেকে পুরস্কার নেওয়াও সমান অপরাধ।

আর আমরা ভারতবাসীরা? কবে কাটবে আমাদের এই অপরাধমূলক নীরবতা? কবে প্যালেস্তাইনের কবি মাহমুদ দারউইশের মতো দখলদার ইজরায়েল কে চোখে চোখ রেখে বলতে পারব – ‘….যদি ক্ষুধার্ত হই/ তাহলে আমি আমার দখলদারদের মাংস খেয়ে ফেলি/ সাবধান সাবধান আমার ক্ষুধা থেকে/ আর আমার ক্রোধ থেকেও সাবধান!’

Advertisement