সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নীতি এবং কূটনৈতিক ভাষ্যের প্রেক্ষিতে এই সম্পর্কের ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য মাত্র ৩০ দিনের একটি ছাড় ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কার্যত আমেরিকার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। বিরোধীদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের ভাষ্য ও আচরণ এমন এক ধারণা তৈরি করছে যেন ভারত একটি অধীনস্থ রাষ্ট্র, আর এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা সেই সমালোচনাকেই আরও জোরালো করে তুলছে।
এই বিতর্কের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য উঠে এসেছে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউয়ের বক্তব্যে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা ডায়ালগে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দেন, চিনের মতো বিশেষ সুবিধা বা ছাড় ভারত আশা করতে পারে না। তাঁর বক্তব্যের পেছনে রয়েছে আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি।
Advertisement
গত কয়েক দশকে আমেরিকা চিনের প্রতি নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা দিয়েছিল। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ মর্যাদা প্রদান, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চিনের প্রবেশে সহায়তা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে বিস্তৃত সুযোগ— এসব পদক্ষেপ বেইজিংয়ের দ্রুত উত্থানের পথকে অনেকটাই মসৃণ করেছিল। কিন্তু সেই উত্থানই পরবর্তীকালে আমেরিকার সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের দিনে ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকেরা মনে করছেন, সেই সময়কার সিদ্ধান্তগুলি কার্যত চিনের শক্তি বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং আমেরিকার আন্তর্জাতিক প্রাধান্যের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ফলে ভারতের ক্ষেত্রে তারা সেই একই নীতি অনুসরণ করতে চাইছে না।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের কাছে ভারত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে। কিন্তু সেই গুরুত্ব মানেই নিঃশর্ত সহযোগিতা নয়। বরং বর্তমান মার্কিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্কের ভিত ক্রমশ হয়ে উঠছে লেনদেনমূলক বা ‘ট্রানজ্যাকশনাল’। বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে এই প্রবণতা সুস্পষ্ট। তাঁর দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেকটাই ব্যবসায়িক চুক্তির মতো, যেখানে প্রতিটি পক্ষকে নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে এগোতে হয়।
এই বাস্তবতার অর্থ হল, ভবিষ্যতে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আরও বেশি করে পারস্পরিক স্বার্থের নিরিখে পরিচালিত হবে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় কিংবা জ্বালানি— সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখবে। এমনকি ‘পারস্পরিকতা’ বা reciprocity-র ধারণাটিও সব সময় সমান না-ও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকা তার বাজার বা প্রযুক্তির বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের ছাড় প্রত্যাশা করতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতিকে কেবল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ধরা পড়বে না। এর মধ্যে একটি বড় সুযোগও রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও তার বিশাল বাজারের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা আমেরিকার পক্ষেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার একটি বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই নির্ভরতাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে ভারতের কূটনীতিকে আরও বাস্তববাদী ও দূরদর্শী হতে হবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে নিজেদের নীতিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের স্বায়ত্তশাসিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই তার কূটনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
ভারতের সামনে তাই এক জটিল ভারসাম্যের প্রশ্ন উপস্থিত হয়েছে। একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখা, অন্যদিকে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা— এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় রক্ষা করাই হবে ভবিষ্যতের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান সময়ে সম্পর্কগুলো ক্রমশ অনিশ্চিত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ভারত-মার্কিন সম্পর্কও নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে—যেখানে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই সহযোগিতার ভিত্তি হবে কঠোর স্বার্থের হিসাব। এই নতুন সমীকরণের মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজে নেওয়াই এখন ভারতের কূটনীতির বড় পরীক্ষা। কীভাবে দিল্লি এই অনিশ্চিত ও কখনও কখনও প্রতিকূল স্রোতের মধ্যে নিজের অবস্থান দৃঢ় রাখে, তার উপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ভারত–মার্কিন সম্পর্কের প্রকৃত রূপ।
Advertisement



