• facebook
  • twitter
Thursday, 26 February, 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মঞ্চে ভারত: ঘোষণা, গর্ব ও গভীর সংকট

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল উন্নত দেশের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি করা নয়। তাদের কাজ এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা একটি জাতিকে কৌশলগত স্বাধীনতা দেয়।

প্রতীকী চিত্র

উজ্জ্বল কুমার দত্ত

নতুন দিল্লিতে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’ শেষ হয়েছে। পাঁচ দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলেও, তার অভিঘাত, বিতর্ক ও প্রতীকী তাৎপর্য এখনও বহমান। একদিকে এই সম্মেলন ভারতকে ‘বৈশ্বিক দক্ষিণ’ (গ্লোবাল সাউথ)-এর নেতৃত্বদানের দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা করেছে; অন্যদিকে একই মঞ্চে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার নৈতিকতা এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার প্রশ্নে গভীর অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Advertisement

এই সম্মেলনে ৮৮টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একসঙ্গে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে— যা কূটনৈতিক দিক থেকে নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হবে সহযোগিতামূলক, নিরাপদ ও মানবকল্যাণমুখী। বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ভারতীয় দর্শনের সেই চিরন্তন ভাবনা— ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মানবকেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাবনাকে যে আন্তর্জাতিক সমর্থন মিলেছে, তা প্রমাণ করে যে বিশ্ব আজ প্রযুক্তিকে সামাজিক ন্যায় ও সমতার আলোকে দেখতে চাইছে। এই ঘোষণাপত্রের প্রতিশ্রুতিগুলি অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক। অর্থাৎ, এগুলি কতটা বাস্তবে রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত আন্তরিকতার উপর। তবু এটুকু বলা যায় যে, এই সম্মেলনের মাধ্যমে প্রথমবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্র উন্নত বিশ্বের বাইরে, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এ স্থান পেল। এটিই ইতিহাস।

Advertisement

সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এই অঙ্ক ভারতীয় নীতির স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার উপর আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিকাঠামোর বিস্তার ঘটতে পারে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রে বিশ্বমানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। আধার, ইউপিআই, ডিজিলকার— এই ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও যদি অনুরূপ গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল গড়ে তোলা যায়, তবে তা ভারতের সঙ্গে-সঙ্গে সমগ্র বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ— এই চারটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ভারতের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সঠিক কৃষি পরিকল্পনা, রোগের পূর্বাভাস, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও জলবায়ু বিশ্লেষণ— এই সম্ভাবনাগুলি যদি গ্রামবাংলা পর্যন্ত পৌঁছায়, তবে উন্নয়নের মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
এই উজ্জ্বল ঘোষণার মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য। সম্মেলন চলাকালীন একটি ভারতীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড দেশকে কার্যত আন্তর্জাতিক স্তরে বিব্রত করে তোলে। গ্যালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি একটি যান্ত্রিক কুকুর প্রদর্শন করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘ওরিয়ন’— এবং সেটিকে নিজেদের উদ্ভাবন বলে উপস্থাপন করা হয়। পরে জানা যায়, এটি আদতে চিনা সংস্থা ইউনিট্রী-র তৈরি একটি বাণিজ্যিক যন্ত্র।

এই ঘটনা আমাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সংস্কৃতির গভীরে থাকা এক রোগের লক্ষণ। আজকের বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বিজ্ঞাপনে গবেষণার কথা হয় কম বলে বা তা উচ্চারণই করে না। বেশি করে বলে— কত ছাত্র কোন বহুজাতিক সংস্থায় কত বেতনে চাকরি পেয়েছে। জ্ঞানের সাধনার বদলে চাকরির বাজারই হয়ে উঠেছে শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি।

অন্যদিকে, চিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দিকে তাকালে এই ফারাক আরও স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থাগুলির তালিকায় যেখানে একসময় মাত্র একটি চিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেত, আজ সেখানে একাধিক চিনা প্রতিষ্ঠান শীর্ষস্থানে। গবেষণা, পরীক্ষাগার, গ্রন্থাগার—সবই সেখানে জীবন্ত। আর আমাদের বহু প্রতিষ্ঠানে গবেষণা পরিণত হয়েছে সংখ্যার খেলায়— প্রকাশনার সংখ্যা, পেটেন্টের হিসাব কিন্তু মৌলিকতার প্রশ্ন সেখানে প্রায় অনুপস্থিত।

আজকের তথ্যবিস্ফোরণের যুগে নকল করা যেমন সহজ, তেমনই সহজ তা ধরা পড়ার। তবু আমাদের গবেষণা পরিকাঠামোতে এমন এক বেপরোয়া সাহস দেখা যাচ্ছে, যেখানে নকলও নির্লজ্জ হয়ে উঠছে। ‘কাট-কপি-পেস্ট’ গবেষণাপত্র, ভাড়াটে গবেষণা, আর দ্রুত ডিগ্রি পাওয়ার হুড়োহুড়ি— সব মিলিয়ে জ্ঞানের ভিত ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর নিয়ম, যোগ্যতা পরীক্ষার শর্ত—সবই আছে কাগজে। কিন্তু কঠোর ও স্বচ্ছ তদারকির অভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা আজও সীমিত।
আজ যখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্বের দাবি করছি, তখন ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের অধিকাংশ যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি এখনও বিদেশনির্ভর। বাইরের গবেষণার উপর দাঁড়িয়ে প্রযুক্তিগত গর্ব টেকসই হয় না। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বৈদ্যুতিন গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্যনিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল উন্নত দেশের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি করা নয়। তাদের কাজ এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা একটি জাতিকে কৌশলগত স্বাধীনতা দেয়। সেই স্বাধীনতা না থাকলে, বিদেশি যন্ত্রের নাম বদলে দেশীয় বলে চালানোর প্রবণতা থামবে না। নতুন দিল্লির এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন আমাদের সামনে দু’টি ছবি একসঙ্গে মেলে ধরেছে। একদিকে— আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, কূটনৈতিক সাফল্য ও সম্ভাবনার দিগন্ত। অন্যদিকে— শিক্ষা ও গবেষণার গভীর সংকট, নৈতিকতার অভাব এবং আত্মপ্রবঞ্চনার বাস্তবতা।

প্রশ্ন একটাই— আমরা কোন পথে হাঁটব? ঘোষণার মোড়কে আত্মতৃপ্তির পথে, না কি আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে সত্যিকারের জ্ঞানসভ্যতার দিকে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ আসলে নির্ভর করছে মানুষের বিবেক, শিক্ষা ও সাহসের উপর।

Advertisement