সৈয়দ হাসমত জালাল
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান সময়টিকে যদি একটি সন্ধিক্ষণ বলা হয়, তবে তা অত্যুক্তি হবে না। আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, অর্থনীতির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন করে ক্ষমতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের আবহে ভারত ও ইতালির সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে— শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা ছাড়িয়ে তা এখন এক সুসংহত কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। এই অংশীদারিত্বের ভিত গড়ে উঠেছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
ভারত ও ইতালির সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সম্পর্কের
Advertisement
গতিপ্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সংলাপ— সব মিলিয়ে এক নতুন আস্থা তৈরি হয়েছে দুই দেশের মধ্যে। এই আস্থা কেবল বর্তমানের স্বার্থে নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও সামনে রেখে গড়ে উঠছে।
এই অংশীদারিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, দুই দেশ শক্তির ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে। ইতালি তার উন্নত শিল্প কাঠামো, ডিজাইন দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাত। অন্যদিকে, ভারত দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বিপুল জনসংখ্যার কর্মক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এই দুই ভিন্ন শক্তির সংমিশ্রণ কেবল বাণিজ্যিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক ধরনের যৌথ সৃষ্টি, যেখানে পারস্পরিক শক্তি একে অপরকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।
Advertisement
এই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরে তা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, পরিষ্কার শক্তি, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ওষুধশিল্প, বস্ত্র, কৃষিপণ্য ও পর্যটন— এই সমস্ত ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে যৌথ উদ্যোগের।
‘মেড ইন ইতালি’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’— এই দুই ধারণার মধ্যে এক স্বাভাবিক সাযুজ্য তৈরি হয়েছে। ইতালির সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতা ও নান্দনিকতা যখন ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি কোম্পানি একে অপরের দেশে কাজ করছে, যাকে ভবিষ্যতের গভীরতর অর্থনৈতিক একীকরণের ইঙ্গিত বলে মনে করা যেতে পারে।
আজকের বিশ্বে ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ডিজিটাল পরিকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা— এই সমস্ত ক্ষেত্রে ভারত ও ইতালির সহযোগিতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার আজ বহু উন্নয়নশীল দেশের কাছে একটি মডেল হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, ইতালি গুরুত্ব দেয় প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার এবং মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে, তা হলো— প্রযুক্তি মানুষের জন্য, মানুষের বিকল্প নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে দুই দেশের যে যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এআই-কে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। বহুভাষিক প্রযুক্তি, সহজলভ্য ডিজিটাল পরিষেবা এবং মানবিক মূল্যবোধের সুরক্ষা— এই সমস্ত বিষয়কে সামনে রেখে এআই ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবধান কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মহাকাশ গবেষণাও দুই দেশের সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ভারতের সাশ্রয়ী ও কার্যকর মহাকাশ কর্মসূচি এবং ইতালির উন্নত এয়ারোস্পেস প্রযুক্তি একসঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে। উপগ্রহ প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনে যৌথ উদ্যোগ বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এই সম্পর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সন্ত্রাসবাদ, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে চায়। এছাড়া, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা— বিশেষ করে ভারত মহাসাগর এবং ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে— এই সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ এই সমুদ্রপথগুলিই আজকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণরেখা।
শক্তি বা এনার্জি সহযোগিতা এই অংশীদারিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন ভারত ও ইতালি যৌথভাবে এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে চায়। সৌরশক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন, স্মার্ট গ্রিড— এই সমস্ত ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে। ভারত যেখানে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনে একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে চায়, ইতালি সেখানে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই সম্পর্কের একটি নতুন দিক হল ‘ইন্দো-মেডিটেরানিয়ান’ ধারণা। এতদিন ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে আলাদা ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এই দুই অঞ্চল ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠছে— বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং তথ্য আদানপ্রদানের মাধ্যমে। এই নতুন সংযোগের কেন্দ্রেই রয়েছে ভারত ও ইতালির অংশীদারিত্ব।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (IMEC) এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বাস্তব রূপ। এই করিডোরের মাধ্যমে পরিবহন, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, জ্বালানি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা— সব ক্ষেত্রেই একটি নতুন সংযোগ তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বাণিজ্যই বাড়বে না, বরং কৌশলগত দিক থেকেও এই অঞ্চলগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
তবে এই সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর দিকটি হয়তো অর্থনীতি বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক সংযুক্তি। ভারতের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ অর্থাৎ বিশ্ব এক পরিবার, এই ধারণা এবং ইতালির রেনেসাঁস-উদ্ভূত মানবতাবাদী দর্শন একে অপরের সঙ্গে এক স্বাভাবিক মিল খুঁজে পায়। উভয় দেশই বিশ্বাস করে যে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে— তার মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতাকে।
আজকের বিশ্বে যেখানে প্রযুক্তি প্রায়শই মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে, সেখানে এই মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যেন মানুষের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ণ না করে, বরং তাকে শক্তিশালী করে— এই লক্ষ্যেই ভারত ও ইতালি একসঙ্গে কাজ করতে চায়।
সব মিলিয়ে, ভারত ও ইতালির এই নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব কেবল দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় নয়; এটি এক বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। ইন্দো-মেডিটেরানিয়ান অঞ্চলের উত্থান, প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার, অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মডেল— এই সবকিছুর মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
এই অংশীদারিত্ব সফল হলে, তা শুধু ভারত ও ইতালির জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করবে যে— সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই আগামী দিনের বিশ্বকে আরও স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়সঙ্গত করে তুলতে পারে।
Advertisement



