২০২৩ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল, ঘৃণা ভাষণ রুখতে সরকারকে আর অভিযোগ দায়েরের জন্য বসে থাকলে চলবে না। স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পুলিশকে মামলা করতে হবে, প্রশাসনকে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। সেই নির্দেশকে সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছিল, রাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত সংবিধানের পথে হাঁটবে? দু’বছর পর উত্তর আরও স্পষ্ট, আরও অস্বস্তিকর। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ কাগজেই রয়ে গিয়েছে, বাস্তবে দেশে ঘৃণা-রাজনীতি আরও বেপরোয়া।
‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর সদ্যপ্রকাশিত ১০০ পাতার রিপোর্ট সেই বাস্তবতাকেই নির্মমভাবে তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালে দেশে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে ঘৃণা ভাষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ১,৩১৮টি—প্রতিদিন গড়ে চারটি করে। তুলনায় ২০২৩ সালে, অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বছরেই, এই সংখ্যা ছিল ৬৬৮। মাত্র দু’বছরে প্রায় দ্বিগুণ— ৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি। সংখ্যাটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার দলিল।
এই বিদ্বেষের মূল নিশানা কারা, তা নিয়ে আর কোনও ধোঁয়াশা নেই। রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের ১,৩১৮টি ঘটনার মধ্যে ১,১৫৬টি ক্ষেত্রেই সরাসরি মুসলিমদের লক্ষ্য করা হয়েছে। আরও ১৩৩টি ঘটনায় মুসলিম ও খ্রিস্টান— উভয় সম্প্রদায়কে একসঙ্গে নিশানা করা হয়েছে। শুধু খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ভাষণ ছিল ২৯টি। মোট মিলিয়ে ১৬৯টি ঘটনায় খ্রিস্টান সম্প্রদায় আক্রান্ত, যা শতাংশের হিসেবে ২০২৪ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ঘৃণার ক্ষেত্র ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে।
আর এই ঘৃণার ভূগোলও স্পষ্ট। ২৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সমীক্ষা চালিয়ে ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ দেখিয়েছে, মোট ঘটনার ৮৮ শতাংশ— ১,১৬৪টি— ঘটেছে বিজেপি বা তাদের জোট শাসিত তথাকথিত ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলিতে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৩১। এক বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। বিপরীতে, বিরোধী শাসিত সাতটি রাজ্যে ঘৃণা ভাষণের ঘটনা কমেছে ৩৪ শতাংশ। এই বৈপরীত্য কাকতালীয় নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পার্থক্য।
রাজ্যভিত্তিক তালিকায় শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ— মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে ২০২৫ সালে ২৬৬টি ঘৃণা ভাষণের ঘটনা। তার পরেই মহারাষ্ট্র (১৯৩), মধ্যপ্রদেশ (১৭২) এবং উত্তরাখণ্ড (১৫৫)। রাজধানী দিল্লিতেও বিদ্বেষ ভাষণের সংখ্যা কম নয়— ৭৬টি। বিরোধী রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম দশে একমাত্র কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটক— ৪০টি ঘটনা নিয়ে।
ব্যক্তি তালিকাও আরও উদ্বেগজনক। বিদ্বেষ-বক্তাদের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি— ২০২৫ সালে ৭১টি ঘৃণা ভাষণ তাঁর নামেই। দ্বিতীয় স্থানে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রবীণ নেতা প্রবীণ তোগাডিয়া (৪৬টি), তৃতীয় স্থানে বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় (৩৫টি)। প্রশ্ন উঠতেই পারে— যেখানে শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রীরাই তালিকার শীর্ষে, সেখানে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
রিপোর্টে আরও উল্লেখযোগ্য একটি দিক—২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঘৃণা ভাষণের ঘটনা হঠাৎ করেই তুঙ্গে ওঠে। রাম নবমীর শোভাযাত্রা এবং পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলাকে কেন্দ্র করে ওই এক মাসেই ঘটেছে ১৫৮টি বিদ্বেষমূলক ঘটনা। অর্থাৎ, ধর্মীয় উৎসব বা সন্ত্রাসী হামলার মতো স্পর্শকাতর মুহূর্তকে ব্যবহার করেই ঘৃণার রাজনীতি আরও উসকে দেওয়া হয়েছে।
এই বাস্তবতার পর প্রশ্ন একটাই— সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানবে কে? যদি শাসকরাই ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করেন, যদি পুলিশ-প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়, তবে সংবিধানের আশ্রয় নেবে কারা? ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু প্রস্তাবনায় নয়, শাসনের প্রতিদিনের আচরণে প্রতিফলিত না হলে তার কোনও অর্থ থাকে না।
ঘৃণা ভাষণ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সমাজকে ভাঙার, নাগরিকদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর রাজনৈতিক অস্ত্র। রাষ্ট্র যদি সেই অস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বুজে থাকে,তবে সেই দায় ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
Advertisement