• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 8 June, 2026

জলরাশির বুকে জমছে আগুন

প্রকৃতি যেন নিজেরই তৈরি ব্যাকরণ ভুলে যাচ্ছে।

একসময় মানুষ সমুদ্রকে শুধু জলরাশি বলে ভাবত না। সমুদ্র ছিল পৃথিবীর নিঃশব্দ অভিভাবক। গ্রীষ্মের উন্মত্ত আগুন যখন মহাদেশের উপর নেমে আসত, তখন সেই আগুনের অনেকখানি নিজের বুকে টেনে নিত সমুদ্র। পৃথিবীর আবহাওয়াকে ভারসাম্যে রাখার জন্য প্রকৃতি যেন তাকে এক বিশাল বাতানুকূল যন্ত্রের দায়িত্ব দিয়েছিল। সে নিঃশব্দে উত্তাপ শুষে নিত, মেঘ তৈরি করত, বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করতো ও বাতাসের গতিপথ ঠিক করত। সভ্যতা এগুলির কিছুই জানত না, কিন্তু তাদের শহর, কৃষিক্ষেত্র, নদী, বন— সবকিছু বেঁচে আছে এই নীল জলরাশির অদৃশ্য ত্যাগে।

দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর মানুষ ভেবেছিল, সমুদ্র অসীম। তার সহ্যশক্তিরও সীমা নেই। শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া, কয়লার আগুন, তেল-গ্যাসের বিষ, শহরের কংক্রিটের উষ্ণতা— সবকিছু সমুদ্র নীরবে বহন করে নেবে। কিন্তু প্রকৃতিরও একসময় ক্লান্তি আসে। আজ আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের জলে সেই ক্লান্তির উত্তাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের অতলে যে তাপ জমছে, তা শুধু সাময়িক পরিবর্তন নয়; এটি এক গভীর বিপদের পূর্বাভাস।

মে মাসের দুপুরে যখন শহরের রাস্তা আগুনের মতো জ্বলতে থাকে, তখন মানুষ ভাবে, সমুদ্র অন্তত ঠান্ডা থাকবে। কিন্তু বাস্তব ছবিটা ভিন্ন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশেন ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে, আরব সাগরের এক বিশাল অংশে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ চলছে। বহু অঞ্চলে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় চার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে। চার ডিগ্রি— সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হলেও প্রকৃতির ভাষায় এটি ভয়ঙ্কর এক বিপর্যয়। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা যদি চার ডিগ্রি বেড়ে যায়, তবে যেমন জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে, সমুদ্রের ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটছে।

গুজরাতের উপকূলে জেলেরা বলছেন যে, মাছেদের আচরণ বদলে গেছে। মহারাষ্ট্রের উপকূলে সাগরের বাতাসে যেন আগের সেই শীতলতা নেই। গোয়া ও কেরলের সৈকতে দাঁড়ালে মনে হয়, সমুদ্র যেন নিঃশ্বাস ফেলছে উত্তপ্ত বাষ্পে। সমুদ্রের গরম জল থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প বাতাসে মিশছে। সেই বাষ্প আকাশে গিয়ে আচমকা বিস্ফোরণের মতো বৃষ্টি নামাচ্ছে। কখনও মেঘভাঙা বর্ষণ, কখনও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহর ডুবে যাওয়া— আবহাওয়ার ছন্দ যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে।

একসময় গ্রামের বৃদ্ধ কৃষকরা আকাশের রং দেখে বৃষ্টির সময় আন্দাজ করতে পারতেন। আষাঢ়ের মেঘ, শ্রাবণের গন্ধ, বাতাসের দিক— সবকিছুর মধ্যে ছিল এক নির্ভরযোগ্য ছন্দ। এখন সেই ছন্দ ভেঙে গেছে। কোথাও অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা। কোনো জেলা বন্যায় ডুবে যাচ্ছে, পাশের জেলা জলের জন্য হাহাকার করছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সমুদ্রের উষ্ণতা ভারতের বর্ষা ব্যবস্থাকেই বদলে দিচ্ছে। প্রকৃতি যেন নিজেরই তৈরি ব্যাকরণ ভুলে যাচ্ছে।

সমুদ্রের এই জ্বরের সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবি দেখা যাচ্ছে প্রবাল প্রাচীরগুলোর মধ্যে। আন্দামান-নিকোবর কিংবা মান্নার উপসাগরের প্রবালগুলো একসময় ছিল সমুদ্রের রঙিন বাগান। অসংখ্য মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী, ক্ষুদ্র জীব— সবাই সেখানে আশ্রয় নিত। সেই প্রবালগুলো আজ সাদা হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘কোরাল ব্লিচিং’। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব মৃত্যু।
প্রবাল আসলে জীবন্ত প্রাণ। সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তারা ধীরে-ধীরে নিজের রং হারায়, তারপর মারা যায়। আন্দামান ও নিকোবর অঞ্চলের প্রায় পঁচাশি শতাংশ প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রের তলায় যেন এক বিশাল শ্মশান তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ চোখে দেখতে পায় না।

প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনের অদৃশ্য সম্পর্ক থাকে। প্রবাল মারা গেলে মাছ কমে যায়। মাছ কমলে জেলেদের আয় কমে। উপকূলীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে ঝড়ের বিরুদ্ধে উপকূলের স্বাভাবিক প্রতিরোধশক্তিও কমে যায়। অর্থাৎ সমুদ্রের অসুখ শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরেই এসে পৌঁছয়।
ভারত আজ এক অদ্ভুত জলবায়ু সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তাপপ্রবাহ, বজ্রপাত, শৈত্যপ্রবাহ, বন্যা, ভূমিধস— সবকিছু যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান শুনলে মনে হয়, আমরা যেন ধীরে-ধীরে এক দুর্যোগের দেশে পরিণত হচ্ছি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত বছরে দেশে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর মধ্যে রয়েছে হাজার-হাজার পরিবার, অসংখ্য অসমাপ্ত স্বপ্ন, অসহায় শিশুদের কান্না।

বাংলার গ্রামে বর্ষাকালে বিদ্যুতের ঝলকানি একসময় ছিল সৌন্দর্যের অংশ। দূরের কালো মেঘে বিদ্যুতের রেখা দেখে শিশুরা মুগ্ধ হত। এখন সেই বজ্রপাত মৃত্যুর আরেক নাম হয়ে উঠছে। মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষক, নদীতে থাকা জেলে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিক— মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাডু, গোয়া, মণিপুর— দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বজ্রপাত এক ভয়ঙ্কর ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
শহরের রাস্তায় দুপুরের সময় হাঁটলে মনে হয় যেন মাটির নিচে আগুন জ্বলছে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালকের চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। নির্মাণ শ্রমিকের শরীর থেকে জল শুকিয়ে যাচ্ছে। বহু মানুষ সানস্ট্রোকে মারা যাচ্ছেন। একসময় উত্তর ভারতের গরম ভয়ঙ্কর ছিল, কিন্তু এখন পার্বত্য অঞ্চলও নিরাপদ নয়। পাহাড়ে অতিবৃষ্টি, হড়পা বান, ভূমিধস— সবকিছু বেড়ে চলেছে।

হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আজ মানুষ রাতে বৃষ্টির শব্দ শুনে ভয় পায়। কারণ সেই বৃষ্টি কখন পাহাড় ভেঙে নামবে, কেউ জানে না। কেরল, মেঘালয়, সিকিম, মিজোরামে ভূমিধস বহু পরিবারকে মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। পাহাড়ের বুক কেটে রাস্তা, হোটেল, রিসর্ট বানানোর যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলছে, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় হল— প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আর কেবল দরিদ্র বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা নয়। শহরও নিরাপদ নয়। দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই, বেঙ্গালুরু— বড় শহরগুলো কংক্রিটের তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। গাছ কমছে, জলাশয় ভরাট হচ্ছে, বাতাস ভারী হচ্ছে। ফলে তাপপ্রবাহ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

এই বিপর্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মধ্যবয়সিরা— যাঁরা পরিবারের উপার্জনকারী। তাঁদের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; একটি পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া। আবার শিশুদের মৃত্যুও বাড়ছে। প্রকৃতি যেন কাউকেই রেহাই দিচ্ছে না।
সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, এই বিপর্যয় হঠাৎ আসেনি। বহু দশক ধরে মানুষ উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে আঘাত করেছে। কয়লাভিত্তিক শিল্প, অযাচিত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, প্লাস্টিক দূষণ, জীবাশ্ম জ্বালানির অবাধ ব্যবহার— সব মিলিয়ে পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমশ বেড়েছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অংশ শুষে নিয়েছে সমুদ্র। বিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত তাপের প্রায় নব্বই শতাংশ সমুদ্র নিজের মধ্যে জমা করেছে। অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীকে গরম করেছে, আর সেই আগুন নিজের শরীরে নিয়েছে সমুদ্র।

সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে ঘূর্ণিঝড়ও শক্তিশালী হয়। কারণ গরম জল ঝড়কে শক্তি জোগায়। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। তারা দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে, দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, উপকূলে ভয়ঙ্কর ধ্বংস ডেকে আনছে। আগে আরব সাগরে এত ঘন-ঘন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখা যেত না। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
আজকের শিশু যে পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, সেই পৃথিবী কি আগামী তিরিশ বছরে বাসযোগ্য থাকবে? উপকূলবর্তী শহরগুলো কি সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির ফলে বিপদের মুখে পড়বে না? কৃষিজমি কি অনিয়মিত বর্ষার কারণে ক্রমশ অনুর্বর হবে না? পানীয় জলের সংকট কি আরও বাড়বে না?

প্রকৃতি কখনও হঠাৎ ধ্বংস ডেকে আনে না। প্রকৃতি আগে সতর্ক করে। নদীর চরিত্র বদলায়, পাখির সংখ্যা কমে, গ্রীষ্ম দীর্ঘ হয়, বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক হয়। আজ সমুদ্রের উত্তাপ সেই সতর্কবার্তারই সবচেয়ে বড় প্রতীক। পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল জলরাশি যখন গরম হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে বিপদ গভীর।
মানুষ যদি চায়, পরিস্থিতি বদলানো এখনও সম্ভব। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বনভূমি রক্ষা করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল ও পাহাড়ে নির্বিচার নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। শহর পরিকল্পনায় জলাশয় ও সবুজ অঞ্চলকে গুরুত্ব দিতে হবে। আবহাওয়া সংক্রান্ত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সাধারণ মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
সমুদ্র কেবল পর্যটনের জায়গা নয়। সে পৃথিবীর প্রাণরস। তার ঢেউয়ের মধ্যে শুধু সৌন্দর্য নেই, আছে মানবসভ্যতার অস্তিত্বও। সেই সমুদ্র আজ উত্তপ্ত। তার জলের ভেতরে জমছে মানুষের ভুলের ইতিহাস।

রবীন্দ্রনাথ একসময় লিখেছিলেন— ‘প্রকৃতির পরশমণি লাগে যার প্রাণে…’
কিন্তু আধুনিক সভ্যতা সেই পরশমণিকে ক্রমশ বিষে পরিণত করছে। আমরা প্রযুক্তির অহংকারে ভুলে গেছি, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ কখনও জিততে পারে না। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই নিজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে—আর সেই প্রক্রিয়ায় সভ্যতার বহু অহংকার ধুলিসাৎ হয়ে যায়।
সমুদ্র আজ নীরবে সেই কথাই বলছে। তার উত্তপ্ত জল যেন পৃথিবীর কপালে জ্বর মাপছে। তার ঢেউয়ের শব্দে যেন শোনা যাচ্ছে এক অদৃশ্য সতর্কবার্তা— মানুষ, এখনও সময় আছে। থামো। প্রকৃতিকে বাঁচাও। নইলে একদিন এই নীল পৃথিবীই মানুষের কাছে অচেনা হয়ে যাবে।