• facebook
  • twitter
Thursday, 16 April, 2026

বিপন্ন বিশ্বের গণতন্ত্র— এক পরিবর্তনের সূচনা

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইরান, ভেনেজুয়েলা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক।

প্রতীকী চিত্র

সুপ্রিয় দেবরায়

২৮ মার্চ যে ‘নো কিংস’ প্রতিবাদ আন্দোলন হয়ে গেল আমেরিকা জুড়ে, তা কি এখন শুধু সীমাবদ্ধ আমেরিকাতে, নাকি তার অভিঘাত অনুভূত ঘরে বাইরেও! বিশ্ববাসীর ‘অবিশ্বাস’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বের প্রতিও কি ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে! যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায়, একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় একে অপরের প্রতি অঙ্গীকার পালনের অযোগ্যতা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ওমানের মধ্যস্থতায় পরমাণু সমঝোতা প্রায় হাতের নাগালে ছিল, তখনই ইরানে সামরিক অভিযান শুরু হয় অর্থাৎ যুদ্ধটা শুরুই হয়েছিল এক তীব্র অবিশ্বাস থেকে। আলোচনার মাঝপথে এ হামলা যে কোনও ভবিষ্যৎ কূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধসিয়ে দিয়েছে। এবং এ কারণেই তেহরানের দাবি, কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, সংঘাতের চিরস্থায়ী অবসান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

Advertisement

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধে যোগ না দেওয়া দেশগুলির উদ্দেশে ট্রাম্পের বিবৃতি (৩১ মার্চ), ‘যেসব দেশ যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করেছে, তাদের উচিত হরমুজ প্রণালী দখল করে নিজেদের তেল সংগ্রহ করা।’ ঠিক তার দু’দিন আগেই (২৮ মার্চ) তিনি বলেছিলেন, ‘হরমুজ প্রণালী আমাদের খুলতেই হবে।’ অবশ্য ট্রাম্পের বিবৃতি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে বদলে যায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলির জন্য শুধু উদ্বেগ নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। অবশ্য পরদিনই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার ঘোষণা করেছিলেন, কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালীকে ইরানের কবজা থেকে মুক্ত করতে বিশ্বের ৩৫টি দেশ একজোট হয়েছে। লন্ডনে বসেছিল এক মেগা আন্তর্জাতিক সম্মেলন। তাঁদের মূল লক্ষ্য সমুদ্রে আটকে পড়া ৩ হাজার জাহাজ ও ২০ হাজার নাবিকদের নিরাপত্তা।

Advertisement

অবিশ্বাস পরিলক্ষিত রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বন্দ্বেও। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে ইরান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তাৎক্ষনিক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রচলিত সামরিক মানদণ্ডে ইরান হয়তো দুর্বল অবস্থানে, কিন্তু কৌশলগতভাবে দেশটি যুদ্ধে এগিয়ে। ইরানের মূল লক্ষ্য, টিকে থাকা এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্বের জনমত তত আমেরিকা বিরোধী হবে। অপরদিকে রোজ রণহুংকার দিলেও বাস্তবে ট্রাম্প যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন মরিয়া হয়ে। কিন্তু সমাধানের সূত্র মিলছে না। সিজফায়ার নিয়ে চলতে থাকা জল্পনার মধ্যেই ‘একরাতের মধ্যে’ ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়ে বসলেন ট্রাম্প। কীভাবে ইরানে আটকে পড়া পাইলটকে মাত্র ‘সাত ঘণ্টায়’ উদ্ধার করা হয়েছে, তার সবিস্তার বর্ণনার সঙ্গে ট্রাম্পের হুমকি, ‘এক রাতেই আমরা পুরো ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা রাখি, এবং সেটা মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতেই হতে পারে।’

ইতিমধ্যে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে। খবর অনুযায়ী, ইরান কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা স্বীকার করে নিলেও হরমুজ প্রণালী খোলা নিয়ে এখনও প্রস্তুত নয়; তাদের দাবি, ওয়াশিংটন চিরস্থায়ী শান্তি স্থাপনে রাজি না হলে, তেহরানও হরমুজ খুলবে না। ইরানের প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়েছে আইআরজিসি। তারা জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে হরমুজে যে পরিস্থিতি ছিল, তা আর কোনও দিনই ফিরবে না। অন্তত আমেরিকা-ইজরায়েলের জন্য নয়। তাই ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজোশকিয়ান যুদ্ধ থামাতে চাইলেও, তেহরান রাজি নয়। অর্থাৎ চলতি সংঘাত আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরে শুধু যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে অনীহা নয়, যুদ্ধের বিরুদ্ধেও জনমত তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি রিপোর্ট দিচ্ছে, ট্রাম্পের পিছু হটা ইরানকে আরও সাহসী করে তুলবে। তাই ট্রাম্প যুদ্ধের বদলে আলোচনার টেবিলে বসার চেষ্টা করলেও তাতে সায় দিচ্ছে না ইজরায়েল। ইজরায়েল শুরু থেকেই চেয়েছিল, ইরানকে সামরিকভাবে পঙ্গু করে দিক আমেরিকা। তাই আমেরিকা পাশে না থাকলেও, ইজরায়েল নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতেও দুই বন্ধু দেশের মধ্যে ফাটল চওড়া হচ্ছে অর্থাৎ অবিশ্বাসের জন্ম নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু করাটা আক্রমণকারীর হাতে থাকলেও শেষ করার চাবি কারোর কাছে থাকে না, বিশেষ করে যুদ্ধ যখন মহাযুদ্ধে পরিণত হয়। পরিণতি— শুধু পশ্চিম এশিয়ার শান্তিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক তীব্র অস্থিরতা তৈরি, যার আঁচ ইতিমধ্যেই লেগে গিয়েছে তেল আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রগুলিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইরান, ভেনেজুয়েলা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব, যাতে ইরান পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ, যেটি আন্তর্জাতিক আইনের বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এবং প্রশাসনিক তদারকি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বর্তমানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সংস্কার করে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় আনার চেষ্টা করলেও, ইজরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আইএমফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর তাদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনেক দেশের অর্থনীতিকে চাপে রাখা। যদি কোনও দেশ মার্কিন নীতি অনুসরণে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে গণতন্ত্রের অভাবের অজুহাতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়। যেসব দেশ মার্কিন বলয়ে থাকতে চায়, তাদের গণতান্ত্রিক তকমা দেওয়া হচ্ছে, আর যারা সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপসহীন, তাদের স্বৈরাচারী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে চিন ও রাশিয়ার উত্থান মার্কিন একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিলে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্কযুদ্ধের আশ্রয় নিয়েছে। পৃথিবীর গণতন্ত্র বর্তমানে একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে আবার ‘ন্যাটো’ ছাড়ার হুমকি, অবশ্য এই হুমকি ট্রাম্প প্রথম দফায় একাধিকবার দিয়েছেন। ‘ন্যাটো’ সদস্যরা হরমুজ প্রণালী মুক্ত করার কাজে আমেরিকার পাশে না-দাঁড়ানোয় ক্ষিপ্ত ট্রাম্প। যদিও চাইলেও সহজ নয়, কারণ সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন জোগাড় করা এই মুহূর্তে ট্রাম্পের পক্ষে বেশ কঠিন। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যখানে, ‘ন্যাটো’ সদস্যদের ট্রাম্পের পাশে

না-দাঁড়ানো তাঁর কাছে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র পর্যায়ে। বিশ্বব্যবস্থা এখন একটি অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও সংকটের মুখে। যতক্ষণ পর্যন্ত একক মেরুকরণ বজায় থাকবে, ততক্ষণ ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই বৃহৎ শক্তির মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ইতিহাস বলে, প্রতিটি বড় সংকটের পর মানবসমাজ নতুন ধরনের সহযোগিতা তৈরি করার পথ খুঁজে বের করেছে। যদিও তার রূপের আভাস এখনও সম্মুখে না আসলেও, আশা করা যায়— যখন একটি আধিপত্যকামী শক্তির চাপে পৃথিবীর গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে, তখন সংকট থেকেই তৈরি হয় সমাধান।

আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের চতুর্থ দিন ৩ অক্টোবর ২০২৫, ভাষণের জন্য নেতানিয়াহুর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করতে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। একপর্যায়ে তাঁরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ (ওয়াকআউট) করেন। পরিষদের সভাপতি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বললেও তাতে কাজ হয়নি। পরে নেতানিয়াহু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর সামনের আসনগুলো ফাঁকা দেখা যায়। প্রায় সব আরব ও মুসলিম দেশ, আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশন বর্জন করেছিলেন। জাতিসংঘের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্য, গাজা সংঘাত, ইরান-সহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ঠিক একই সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনের কাছে গাজায় জাতিগত নিধনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ইরান অসম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক। গ্লোবাল সাউথের অনেক মানুষের কাছে ইরানের এই অবস্থান প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি রাষ্ট্র, যা একটি অসম ব্যবস্থার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এটি নিখুঁত সমর্থনের প্রশ্ন নয়, একটি অনুভূতির প্রশ্ন। ৩ অক্টোবর ২০২৫ জাতিসংঘে সেই নীরব প্রস্থান শুধু একটি প্রতিবাদ ছিল না, ছিল একটি সতর্কবার্তা। একটি বিশ্ব, যেখানে মানুষ আর অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না, যেখানে সত্য ধীরে ধীরে নিজের পথ খুঁজে নেয়। গাজার ধ্বংসস্তূপ, ইরানের প্রতিরোধ এবং নীরব দেশগুলোর অপ্রকাশিত অবস্থান— এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে, হয়তো এক পরিবর্তনের সূচনা।

Advertisement