• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

আরাবল্লী : উন্নয়নের নামে আত্মঘাত

আরাবল্লী ধ্বংস মানে কেবল কয়েকটি পাহাড় হারানো নয়— এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বাসযোগ্য উত্তর ভারতের সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করা।

ছবি: আইএএনএস

দিল্লি ও হরিয়ানার বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আরাবল্লী পাহাড়শ্রেণী শুধু একটি ভূপ্রাকৃতিক কাঠামো নয়— এটি উত্তর ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অবিচ্ছেদ্য রক্ষাকবচ। পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতমালাগুলির একটি এই আরাবল্লী আজ দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের কিনারায়। সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা শুধু আইনি ব্যাখ্যার সীমায় আটকে নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার সঙ্গে পুঁজির ঘনিষ্ঠতার প্রশ্ন।

পরিবেশবিদদের একাংশের অভিযোগ, আদালতের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও তার ব্যাখ্যা কার্যত আরাবল্লী অঞ্চলে খনন ও নির্মাণের পথ আরও প্রশস্ত করে দিচ্ছে। যদিও আদালত সরাসরি খননের ছাড়পত্র দেয়নি, তবু ‘ফরেস্ট ল্যান্ড’-এর সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। এর ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলি—বিশেষত খনিজ ও রিয়েল এস্টেট স্বার্থ জড়িত গোষ্ঠী—আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পাহাড় কেটে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

Advertisement

বিরোধীদের অভিযোগ আরও স্পষ্ট ও রাজনৈতিক। তাঁদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী আদানি সহ বড় কর্পোরেট শক্তিকে সুবিধা দিতেই এই ‘ব্যাখ্যাগত উদারতা’। আদানি গোষ্ঠীর খনন, শক্তি ও অবকাঠামো ক্ষেত্রে আগ্রাসী সম্প্রসারণ নতুন নয়। প্রশ্ন উঠছে—আরাবল্লীর মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে খনিজ উত্তোলনের ছাড়পত্র কি শেষ পর্যন্ত ‘উন্নয়ন’-এর নামে কর্পোরেট মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দেবে?

Advertisement

এই প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির বিষয় নয়। আরাবল্লী ধ্বংস হলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও বিপর্যয়কর। পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন— আরাবল্লী হলো থর মরুভূমির বিস্তার রোধের প্রাকৃতিক প্রাচীর। এই পাহাড়শ্রেণী দুর্বল হলে বা নিশ্চিহ্ন হলে রাজস্থান থেকে উঠে আসা বালিঝড় অবাধে ঢুকে পড়বে দিল্লি, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে। রাজধানী অঞ্চলের বায়ুদূষণ, যা ইতিমধ্যেই বিশ্বে সর্বাধিক বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে, তখন আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।

শুধু বায়ুদূষণ নয়—জলস্তর, জীববৈচিত্র্য ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও আরাবল্লীর ভূমিকা অপরিসীম। এই পাহাড় প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে, বৃষ্টির জল ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণ করে। পাহাড় কেটে খনিজ তোলা মানে সেই প্রাকৃতিক স্পঞ্জ ধ্বংস করা। এর ফল ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ ও দক্ষিণ দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায়— ভূগর্ভস্থ জলস্তর ক্রমশ নামছে, গরম বাড়ছে, বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হচ্ছে।
অথচ সরকারের বক্তব্যে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেন প্রকৃতি ধ্বংস করাই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পরিবেশগত মূল্যায়ন, জনশুনানি, স্থানীয় মানুষের মতামত—সবই ক্রমে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় যদি এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করে, তবে তা দেশের পরিবেশগত ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

এখানে প্রশ্ন উঠছে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও। আদালত কি কেবল আইনের সংকীর্ণ পাঠে আবদ্ধ থাকবে, নাকি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের ‘জীবনের অধিকার’-এর বিস্তৃত ব্যাখ্যায় পরিবেশ সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেবে? অতীতে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার পরিবেশ রক্ষায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। আজ সেই ঐতিহ্য কি চাপের মুখে পড়ছে? মনে রাখা দরকার, দেশের জনসাধারণের কাছে বিচার ব্যবস্থা এখনও পরম ভরসা ও আশ্রয়স্থল।

আরাবল্লী ধ্বংস মানে কেবল কয়েকটি পাহাড় হারানো নয়— এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বাসযোগ্য উত্তর ভারতের সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করা। উন্নয়নের নামে যদি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ভেঙে ফেলা হয়, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। রাজধানীকে বালিঝড়ে ঢেকে দেওয়ার ছাড়পত্র কি কোনও সভ্য রাষ্ট্র দিতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালত বা সরকারের কাছ থেকে নয়—সমাজের সামগ্রিক বিবেকের কাছ থেকেও দাবি করে। আরাবল্লীর লড়াই আসলে পরিবেশ বনাম লোভের লড়াই— সেখানে কোন পক্ষ জিতবে, তা ঠিক করবে ভারতের আগামী প্রজন্ম আদৌ বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে কি না।

Advertisement