• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 3 September, 2026

নেশার বিরুদ্ধে যুবসমাজ

মাদকাসক্তি আজ শুধু একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, এটি সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এক গভীর সামাজিক সংকট।

নেশার বিরুদ্ধে যুবসমাজ

PIC-X

মাদকাসক্তি আজ শুধু একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, এটি সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এক গভীর সামাজিক সংকট। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে নেশার বিস্তার একটি পরিবারকে যেমন বিপর্যস্ত করে, তেমনই তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে সমাজের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উপর। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বালুরঘাটে বিপুল পরিমাণ বাজেয়াপ্ত নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ রোড রোলার দিয়ে ধ্বংস করার যে প্রতীকী কর্মসূচিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অংশ নিলেন, তাকে নিছক প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য খাটো করা হবে।
প্রায় দু’লক্ষ নিষিদ্ধ কাশির সিরাপের বোতল বাজেয়াপ্ত হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ, এই ধরনের নেশাদ্রব্যের একটি বড় অংশ তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করেই অবৈধ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তবর্তী দক্ষিণ দিনাজপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এই সমস্যাকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। ফলে সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার রুখতে পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ নেশাদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। এই সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখা গেলে মাদক পাচারের চক্রের উপর আরও কার্যকর চাপ
সৃষ্টি করা সম্ভব।
রোড রোলারের নিচে নিষিদ্ধ কাশির সিরাপের বোতল ধ্বংস করার দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে প্রতীকী। কিন্তু জনমানসে প্রতীকেরও একটি শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। প্রশাসন যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে, বাজেয়াপ্ত মাদক আর কোনোভাবেই অবৈধ বাজারে ফিরে যাবে না এবং মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তখন তার একটি প্রতিরোধমূলক প্রভাব তৈরি হয়। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছনো জরুরি যে, নেশা কোনও নিরীহ বিনোদন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাস্থ্যহানি, অপরাধ, আর্থিক বিপর্যয় এবং ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা।
মুখ্যমন্ত্রীর ‘যুবসমাজকে নেশা থেকে বের করে আনতে হবে’— এই বক্তব্যটি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাদকবিরোধী অভিযানকে কেবল গ্রেপ্তার ও বাজেয়াপ্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহ বন্ধ করার পাশাপাশি নেশার চাহিদাও কমাতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্রীড়াক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। পরিবারকেও এই লড়াইয়ের অংশীদার করতে হবে। যে তরুণ ইতিমধ্যেই নেশার কবলে পড়েছে, তার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। অর্থাৎ ‘নেশামুক্ত বাংলা’র লক্ষ্যকে সফল করতে হলে আইনপ্রয়োগের সঙ্গে মানবিক উদ্যোগেরও সমন্বয় প্রয়োজন।
এই ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার শুধু একটি রাজ্য বা জেলার সমস্যা নয়; এটি আন্তঃরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই গোয়েন্দা তথ্যের আদানপ্রদান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত অভিযান এবং দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা দরকার। কোনও একটি বড় চালান আটক করা সাফল্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে পাচারচক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি— মাদক কারবারে যুক্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হবে— অপরাধীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে সেই কঠোরতা যেন আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটিই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে বাজেয়াপ্ত মাদক ধ্বংসের প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পায়।
বালুরঘাটের এই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই তার প্রতীকী দৃশ্য নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত প্রশাসনিক বার্তা। মাদক পাচার ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সরকার যদি ধারাবাহিক, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালায়, তবে তা নিঃসন্দেহে স্বাগত। আজ রোড রোলারের নিচে ধ্বংস হয়েছে কয়েক লক্ষ নেশার বোতল; আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমাজ তৈরি করা, যেখানে এই বোতলগুলির আর কোনও ক্রেতা থাকবে না।

নেশামুক্ত সমাজ গড়া কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়— এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং নাগরিক সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে সেই সম্মিলিত উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব সরকারেরই। বালুরঘাটের কর্মসূচি সেই নেতৃত্বের একটি দৃশ্যমান ঘোষণা।