দিল্লি হাই কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায় শুধু একটি কর-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং রাষ্ট্রশক্তির সীমা, নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বার্তা। এনডিটিভি-র প্রতিষ্ঠাতা প্রণয় রায় ও রাধিকা রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে জারি হওয়া আয়কর পুনর্মূল্যায়ন নোটিসকে ‘ইচ্ছামতো’ ও ‘অধিকারবহির্ভূত’ বলে খারিজ করে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, আইনের আড়ালে দাঁড়িয়ে কোনও প্রতিহিংসামূলক বা খামখেয়ালি পদক্ষেপ গ্রহণ করা চলতে পারে না।
বিচারপতি দীনেশ মেহতা ও বিচারপতি বিনোদ কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ শুধু নোটিস বাতিল করেই থামেনি, আয়কর দপ্তরকে প্রতীকী খরচ হিসেবে প্রত্যেক আবেদনকারীকে এক লক্ষ টাকা করে দিতে নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের ভাষায়, ‘কোনও খরচই এই ধরনের মামলার জন্য যথেষ্ট নয়’— এই মন্তব্যের মধ্যেই রয়ে গেছে এই ইঙ্গিত যে, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Advertisement
এই মামলার প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৯-১০ অর্থবর্ষে প্রণয় রায় ও রাধিকা রায় তাঁদের সংস্থা আরআরপিআর হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড থেকে যে সুদবিহীন ঋণ পেয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রথম দফায় ২০১১ সালে পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয় এবং ২০১৩ সালে তার নিষ্পত্তি হয়। অর্থাৎ, আয়কর দফতরের কাছে সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য তখনই ছিল। অথচ ২০১৬ সালে একটি ‘অভিযোগ’-এর ভিত্তিতে ফের একই বিষয়ে নোটিস জারি করা হয়। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, এই তথাকথিত অভিযোগে নতুন কিছুই ছিল না, যা আগে জানা ছিল না।
Advertisement
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, আদালত এই নোটিসকে ভারতের সংবিধানের একাধিক মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে চিহ্নিত করেছে। অনুচ্ছেদ ১৪ (আইনের চোখে সমতা), অনুচ্ছেদ ১৯(১)(গ) (পেশা ও ব্যবসার স্বাধীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ৩০০এ (সম্পত্তির অধিকার)— এই তিনটি সাংবিধানিক সুরক্ষাই লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ, বিষয়টি কেবল কর আইন বা ধারা ১৪৯-এর সীমারেখা ছাড়িয়ে নাগরিক অধিকারের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে।
আদালত আরও বলেছে, ‘বর্ধিত সময়সীমা’ প্রয়োগের জন্য করদাতার তথ্য গোপনের যে যুক্তি আয়কর দপ্তর দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি আইনত টেকসই নয় এবং এখানেই নোটিসের বৈধতা থাকে না। এই মন্তব্য ভবিষ্যতের জন্যও এক দৃষ্টান্ত— পুনর্মূল্যায়নের ক্ষমতা কোনও সর্বময় অস্ত্র নয়, যার মাধ্যমে বারবার একই করদাতাকে হয়রানি করা যাবে।
এই রায়ের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্যও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এনডিটিভি দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচক সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত। সেই প্রেক্ষিতে রায় দম্পতির বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত ও নোটিসকে অনেকেই ‘প্রতিহিংসামূলক রাষ্ট্রনীতি’-র উদাহরণ বলে মনে করেছেন। আদালত সরাসরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা না বললেও ‘আরবিট্রারি’ ও ‘ভিনডিক্টিভ’ শব্দের ব্যবহার যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী।
গণতন্ত্রে কর আদায় রাষ্ট্রের বৈধ অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার যখন নাগরিককে ভীত ও নতজানু করার অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন আদালতের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। দিল্লি হাই কোর্টের এই রায় মনে করিয়ে দেয়—প্রশাসন আইন দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও, সেই ক্ষমতার উপর শেষ নজরদারি সংবিধানের।
সবশেষে বলা যায়, এই রায় কেবল প্রণয় রায় ও রাধিকা রায়ের জন্যই স্বস্তির নয়– এটি সেই সমস্ত নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য এক আশ্বাস, যাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে নিজেদের অসহায় মনে করেন। আইনের শাসন তখনই অর্থবহ, যখন আদালত নির্ভয়ে বলতে পারে— রাষ্ট্রও ভুল করতে পারে এবং সেই ভুল শুধরে দেওয়াই বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।
Advertisement



