শীতের শেষ লগ্নে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাখি চোরাশিকারীদের দল। বিশেষ করে পরিযায়ী ‘বগারি’ পাখিদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে শিকার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে যেমন ধরপাকড় চালাচ্ছে বন দপ্তর, তেমনই অন্যদিকে গ্রামে গ্রামে সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বীরভূম জেলার তারাপীঠ থানার অধীন কয়েকটি গ্রামে বগারি পাখি সংরক্ষণ নিয়ে বিশেষ সচেতনতা শিবির অনুষ্ঠিত হয়। বন দপ্তর ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে যুক্ত সংগঠনগুলির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দা, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং পুলিশ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বগারি পাখি মূলত ছোট আকারের চড়াই জাতীয় পাখি। এর মধ্যে ‘হিউমস শর্ট টোড লার্ক’ এবং ‘মঙ্গোলিয়ান লার্ক’-সহ একাধিক বিরল প্রজাতি রয়েছে।
Advertisement
বন্যপ্রাণপ্রেমীদের মতে, এই পাখিগুলি মূলত সাইবেরিয়া এবং মঙ্গোলিয়া অঞ্চল থেকে শীতকালে ভারতে আসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের শুকনো কৃষিজমিতে আশ্রয় নেয়। ফসল কাটার পর জমিতে থাকা পোকামাকড়ই তাদের প্রধান খাদ্য। ফলে এই পাখিরা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
Advertisement
তবে অভিযোগ, এই উপকারী পাখিদেরই মাংসের লোভে নির্বিচারে শিকার করছে চোরাশিকারীরা। সন্ধ্যার পর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মাঠে জাল পেতে পরিকল্পিতভাবে বগারি পাখি ধরা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই শিকার করা পাখিগুলি পরে গোপনে বিক্রি করা হয়।
সংরক্ষণ শিবিরে উপস্থিত বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ কর্মী শান্তনু দাস জানান, ‘বগারি পাখিরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা পোকামাকড় খেয়ে কৃষিজমিকে সুরক্ষা দেয়। অথচ মানুষই তাদের নির্বিচারে হত্যা করছে।’ তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে এই পাখি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
সংগঠনের সহ-সম্পাদক সৌম্যদীপ মণ্ডল জানান, প্রতি বছর শীতকালে এই পরিযায়ী পাখিদের আগমন ঘটে এবং শীত শেষে তারা নিজ দেশে ফিরে যায়। কিন্তু ফেরার পথে শিকারিদের ফাঁদে পড়ে বহু পাখির মৃত্যু হচ্ছে। এই পরিস্থিতি রুখতে স্থানীয়দের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।
বন দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই চোরাশিকার রুখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সচেতনতা শিবিরের মাধ্যমে মানুষকে এই বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। কোথাও চোরাশিকারের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে বন দপ্তর।
পরিবেশবিদদের মতে, পরিযায়ী পাখিদের সুরক্ষা শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নয়, কৃষি ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পাখিদের রক্ষা করতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ জরুরি।
Advertisement



