অতনু রায়
তাঁর মূল পরিচয় এক অসাধারণ অভিনেতা হিসেবে। লুকিয়ে রাখেন ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পীর পরিচয়। অভিনেতার পাশাপাশি একজন প্রযোজকও । অভিভাবক হিসেবেও সফল। এককথায় একজন সফল নারী অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। সনি লিভে আসছে নতুন সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’। সিরিজ মুক্তির আগে প্রযোজক অর্পিতা বললেন অনেক কথা।
Advertisement
প্রশ্ন: প্রযোজক হিসেবে একটা কনটেন্টকে দেখা আর একজন অভিনেতা হিসেবে দেখার মধ্যে কতটা আলাদা?
Advertisement
অর্পিতা: যে কোনও পেশার মানুষই চায় তার একটা পেশাগত উত্তরণ হোক। তেমনভাবে একজন অভিনেতার জীবনে সেই উত্তরণের জায়গাটা হল প্রযোজনা। আমি এটাকে উত্তরণের জায়গা থেকেই দেখছি।
প্রশ্ন: ওটিটি আসার পরে কনটেন্টের ক্ষেত্রে প্যারাডাইম শিফট্ হয়েছে। তুমি কনটেন্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কী মাথায় রাখো?
অর্পিতা: আমি প্রযোজনার ক্ষেত্রে একটাই বিষয় মেনটেইন করার চেষ্টা করেছি এবং আগামীতেও করব, আমি সেই গল্পগুলো বলতে চাই যেগুলো আমার মনে হয় বলা দরকার। গল্পের মধ্যে একটা সত্যির জায়গাও থাকা উচিত। সেটা হিস্টোরিক্যাল, সোশ্যাল বা বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে হতে পারে। দর্শকের জানা উচিত এমন গল্প বলতে চাই। অবশ্যই সেটা এন্টারটেইনিং হতে হবে। তবে একটা ভিজুয়াল কনটেন্টের সমাজের উপরে যথেষ্ট ইম্প্যাক্ট থাকে, যেটাকে সফট্-পাওয়ার বলে। তাই একজন দর্শককে কী কন্টেন্ট দেখাচ্ছি, প্রযোজক হিসেবে সেই দায়িত্ব বোধ থাকা উচিত।
প্রশ্ন: ভালো কনটেন্টের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বাজেট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটা কনটেন্ট যেভাবে দেখতে চাইছ, সব সময় বাজেট সেটাকে সাপোর্ট করে না। এই সমস্যার মোকাবিলা করা কি খুব সহজ?
অর্পিতা: বাজেট অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। যে কোনও প্রজেক্ট লক করার সময় সেটা কনফার্ম করতেই হয়। কিন্তু তুমি যদি বিরিয়ানি বানাতে চাও কিন্তু দেখো যে দশ মিনিট সময় আছে এবং সাতটা উপকরণের মধ্যে পাঁচটা তোমার কাছে নেই, তাহলে আমার মতে দশ মিনিটে বিরিয়ানি না বানিয়ে ওই দুটো উপকরণ দিয়ে যেটা সবচেয়ে ভাল বানানো সম্ভব সেটাই বানানো উচিত। আমার এটাই স্ট্র্যাটেজি। আমি সবসময় সেই গল্পটাই বাছি যেটা আমার বাজেটে ফিট করে। যেটা আমার বাজেটে ফিট করছে না সেরকম কোনও কনটেন্ট আমি জোর করে সেই বাজেটের মধ্যে ফিট করানোর চেষ্টা করব না। আর রাইটিং হচ্ছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা যে বাজেটের কনটেন্টই হোক। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রিসার্চ। মানুষ ভাবে, কোনও পিরিয়ড কনটেন্ট হলে তখনই বোধহয় রিসার্চ লাগে। কিন্তু খুব কনটেম্পোরারি কিছু বানাতেও রিসার্চ ভীষণ দরকার।
প্রশ্ন: ডিটেইলিংয়ের জন্য…
অর্পিতা: হ্যাঁ। আর এই জায়গাটায় আমার মনে হয় শুধুমাত্র বাংলা নয়, ভারতীয় কনটেন্টেই কিছুটা খামতি আছে। কিন্তু পশ্চিমী দেশগুলোর কনটেন্টে আমরা দেখেছি যে রিসার্চের অংশটা খুব ভাল। সেটা আমি ‘জ্যাজ সিটি’র ক্ষেত্রেও করতে চেয়েছি এবং অনেকটা সময় ধরে এই প্রজেক্টের রিসার্চ চলেছে।
প্রশ্ন: আমাদের এখানে বাজেট কমানোর দরকারে প্রথম কোপটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখকের উপরে গিয়েই পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তেমন বাজেট না থাকায় যে পরিচালক লিখতে পারেন না তাকেও হয়তো স্ক্রিপ্ট লিখতে হচ্ছে!
অর্পিতা: আমি ঠিক এই ধারাতে বিশ্বাসী নই। যেটা জানি না আমি সেটা করার পক্ষে নয়। আমি বলব, যে কাজটা যেভাবে করা উচিত যদি সেভাবে করতে পার তাহলেই কর। কিন্তু যদি প্রচণ্ড আপস করে যে গান গাইতে পারছে না তাকে দিয়ে গান গাওয়াতে, যে লিখতে পারছে না তাকে দিয়ে লেখাতে, যে অভিনয় করতে পারছে না তাকে অভিনয় করাতে হয়, আমার মনে হয়, আমি সেরকম ভাবে কোনও দিন কাজ করব। বাজেট অবশ্যই ফ্যাক্টর। আর বাংলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজারটা সেই ভাবে বড় হয়নি বলে বাজেটও খুব বেশি বাড়েনি। তবুও বলব যদি খুব ভাল প্রি-প্রোডাকশন আর প্ল্যানিং হয় এবং খুব কমিটেড একটা টিম থাকে, তাহলে যে কাজ দেখে ১০০ টাকার মনে হচ্ছে, সেটা ৬০ বা ৭০ টাকায় করে ফেলা সম্ভব, আপস না করেই।
প্রশ্ন: এই সিরিজে নতুন প্রজন্মের অনেক বাঙালি অভিনেতার সঙ্গে কাজ করলে। বাংলার অভিনয়ের রিজার্ভ বেঞ্চ কতটা শক্তিশালী মনে হল?
অর্পিতা: খুবই। শুধু অভিনেতা নয়, কলকাতার টেকনিশিয়ান এবং আর্টিস্টরা যে কোনও দিন ন্যাশনাল লেভেলের সঙ্গে একদম পাল্লা দিয়ে চলার মতো তৈরি।
প্রশ্ন: অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় তো প্রথমে একজন অভিনেতা। যে কোনও ভালো অভিনেতার কিন্তু ভালো চরিত্রের প্রতি লোভ থাকে। এই সিরিজে এতগুলো দারুণ চরিত্র রয়েছে। অভিনেতা অর্পিতার লোভ হয়নি?
অর্পিতা: না। সত্যিই হয়নি। কারণ বাকি কাজটা এত বেশি ছিল যে যদি অফার করাও হত, আমাকে না-ই বলতে হত। প্রযোজনা সংস্থা তৈরির সময় থেকেই এটা আমার নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া। প্রযোজনা সংস্থাটা কিন্তু আমার কাজকে লোকের কাছে ডিসপ্লে করার জন্য নয়। দেশের আর দশটা ভালো প্রযোজনা সংস্থা যেভাবে তাদের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে, সেভাবেই একটা প্রযোজনা সংস্থা চলা উচিত বলে আমার মনে হয়। তাই প্রযোজক হিসেবে এখানে আমার কাজটা এতটাই বেশি যে অভিনয়ের বিষয়টা মাথাতেও আসেনি। আর সত্যিই যদি আমাকে সৌমিক কোনও চরিত্রের কথা বলত, আমি না-ই বলতাম। আমার প্রযোজনায় আমি কাজ করব কিনা সেটা আমাকে এখন জিজ্ঞাসা করলেও আমি হয়ত না বলব। কারণ, আমার মনে হয় না যে দুটো দায়িত্ব আমি একসঙ্গে পালন করতে পারব। তখন কোনও কাজকেই আমি একশ শতাংশ দিতে পারব না। সেটা আমার কাছে খুব কষ্টের হবে।
প্রশ্ন: এই সিরিজে ২১ টা গান। আমি সেই অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করছি যাঁকে আমি পণ্ডিত অরুণ ভাদুড়ীর স্মরণ অনুষ্ঠানে স্টেজে বসে গান গাইতে দেখেছি। এই সিরিজে এমন কোনও গান ছিল যেটা মনে হয়েছে তুমি গাইতে পারতে?
অর্পিতা: না, না। এখানে অনেকগুলো জ্যাজ আছে। এছাড়া ইংরাজি, হিন্দি, বাংলা, উর্দু গান আছে। আমার তো মনে হয়, আমি পারতাম না।
প্রশ্ন: মঞ্চে তোমাকে ‘মাই নেম ইজ জান’ করতে দেখেছি। কত গান কী অনবদ্যভাবে গেয়েছো! কখনও গানগুলোকে একত্রিত করে অ্যালবাম হিসেবে আনার ইচ্ছে হয়নি? বা চেষ্টা করেছ?
অর্পিতা: এটা আমাকে অনেকেই বলেছেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেরকম কোনও পরিকল্পনা আমাদের নেওয়া হয়নি। একটা কারণ, শো’টা এখনও চলছে তাই সেটার উপর একটা ফোকাস রয়েছে। তার উপর আমার প্রযোজনা সংস্থা। সব মিলিয়ে নতুন কিছুর পরিকল্পনা করার সময়ের অভাবেই হয়ে উঠছে না। তাছাড়া ওই গানগুলোকে একটা সিঙ্গিং প্রপোজিশন হিসেবে আমার করাটা উচিত হবে কিনা তাও আমি জানি না।
প্রশ্ন: তুমি কিন্তু অসামান্য গেয়েছো!
অর্পিতা: একটা শোয়ের মধ্যে অভিনয়ে আছে এবং আরও অনেক এলিমেন্ট আছে। কিন্তু যখন শুধুমাত্র একটা গান হিসেবে শুনছো তার যে লেভেলের পারফেকশন হওয়া উচিত আমি জানি না যে আমার মধ্যে সেই যোগ্যতা আছে কিনা। তাছাড়া শুধু অ্যালবাম হিসেবে গানগুলো রিলিজ করতে গেলে যে পরিমাণ রেওয়াজ করতে হবে বা সময় দিতে হবে, আমার মনে হয় না আমি এই মুহূর্তে তা দিতে পারব। তবে, মাথায় রাখব, দেখা যাক।
প্রশ্ন: শোয়ের জন্য গানের রেওয়াজটা নিশ্চয়ই চালিয়ে যেতে হয়?
অর্পিতা: করতেই হয়। সে আমি কলকাতায় থাকি, দিল্লিতে হোক, মুম্বইতে হোক বা কোথাও বেড়াতেও গেলাম; আমার ইলেকট্রনিক তানপুরা সারাক্ষণ আমার সঙ্গে ঘোরে এবং আমাকে রেওয়াজ করতে হয়। কারণ আমার যদি ওই গানগুলোর চর্চা না থাকে, আমি স্টেজে ডেলিভার করতে পারব না। তাই রেওয়াজটা আমাকে করতেই হয়।
প্রশ্ন: প্রযোজক অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়কে যদি জিজ্ঞাসা করি ‘জ্যাজ সিটি’র তিনটে ইউএসপি কী?
অর্পিতা: আমার মনে হয়, এটা দর্শকরাই বলতে পারবেন। আমার সন্তান, আমি ওইভাবে ইউএসপি বলতে পারব না। আমার কাছে এটা খুব কাছের আর অমূল্য। তাই আমি তিনটে আলাদা করে বলতে পারব না। আমি শুধু বলব, সিনেমা হোক, সিরিজ হোক বা যেকোনো কনটেন্ট, দেখো। আর ওটিটিতে তো খুব সুবিধা, যখন সময় পাবে সুবিধামতো দেখে নাও। দেখে হয় ভালো লাগবে, নাহলে ভালো লাগবে না। কিন্তু দেখাটা খুব জরুরি।
Advertisement



