অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়
এ এক লড়াইয়ের গল্প। তাঁর জীবনী যারা পড়েছেন তারা জানেন তাঁর লড়াইয়ের কথা। তিনি গহরজান। যাঁর গান শোনার জন্য অপেক্ষা করত তামাম দুনিয়া, এতগুলো ভাষায় যাঁর কন্ঠ রেকর্ডেড… সেই গহরজানকে মঞ্চে উপস্থাপন করছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। আর নিজেকে ভেঙেচুরে গহরজান করে তুলতে এক অন্য লড়াই করতে হয়েছে অর্পিতাকেও।
Advertisement
তাঁর কথায়, কৌশিক সেনের স্বপ্নসন্ধানীর হাত ধরে নটীরপূজো নাটক দিয়েই আমার প্রথম নাট্যজীবন শুরু হয়। তখন থেকেই নাটকের প্রতি আমার একটা আলাদা ভালোবাসা জন্মায়। এরপর অবন্তির নির্দেশনায় গহরজান মঞ্চে আমার দ্বিতীয় নাটক। অনেকদিন ধরেই অবন্তির সঙ্গে কাজ করার কথা হচ্ছিল। কিন্তু বিষয়টা মনের মতো হচ্ছিল না। তারপর ও আমাকে একদিন গহরজানের গল্প বলে। শুরু হল আমাদের my name is Jaan-এর জার্নি।
Advertisement
তখন কোভিডের সেকেন্ড ওয়েভ চলছে। গহরজানের জীবনের গল্প শুনে আমার মনে হয়েছিল। সময় বদলেছে যুগ বদলেছে। আমাদের অভিনেত্রীদের জীবন আজও বদলায়নি। মঞ্চ নাটক আমার জীবনকে ভীষণ নাড়া দেয়। এই মাধ্যমটা আমার কাছে ভীষণ ইন্টারেস্টিং। আমি আমার দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কানেক্ট করছি। এর থেকে ভালো আর কিছুই হতে পারে না। নাটক করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি অভিনয় শিক্ষা এবং চর্চার প্রকৃত মাধ্যম থিয়েটার। প্রতিনিয়ত চর্চার মধ্যে দিয়ে অভিনয়ের দক্ষতা বাড়ানো যায়। ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি।
গহরজানকে মঞ্চে রূপ দেওয়ার জন্য আমি অনেক ওয়ার্কশপ করি। ভয়েস ট্রেনিং থেকে শুরু করে, আলাদা করে নাচের এবং গানের তালিম নেওয়া। এই চরিত্রকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমিও অবন্তির সঙ্গে অনেক রিসার্চ করেছি।
তবে এর সঙ্গে আমার বাস্তব জীবনের বহু অভিজ্ঞতাও কাজে লাগিয়েছি। বাঙালি বা বিদেশিরা কিভাবে বাংলা কথা বলবে তাদের উচ্চারণের ডায়ালেক্ট কী হবে। নাটকের সুবিধা হল, অনেক রিহার্সাল আর ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে নিজেকে তৈরি করা যায়। প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পরেও ভুলভ্রান্তি শুধরে নেওয়া যায়। কলকাতা ছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে গহরজান মঞ্চস্থ হয়েছে। কয়েক বছরে ২২টা শো হয়েছে। যতদিন দর্শকরা চাইবেন, ততদিন আমি গহরজান মঞ্চস্থ করবো। (শো যতদিন হাউসফুল হবে) ভবিষ্যতে আমি চেষ্টা করব আরো ভালো কাজ দর্শকদের উপহার দিতে। গহরজনের গল্প আমারও গল্প।
অবন্তী চক্রবর্তী
নাটকের প্রতি আমার ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকে। তবে নিজে কখনো নাট্য নির্দেশক হব এটা কিন্তু ভাবিনি। হায়দ্রাবাদে পড়ার সময় ওখানকার থিয়েটার বিভাগের সঙ্গে প্রথম নাটক করার সুযোগ আসে। গিরিশকরণাডের নাগামণ্ডল। তারপর এমএ পাশ করার পর আমি ছোটদের নিয়ে একটি নাটক করি মিটসামার ড্রিমস। সেটা কলকাতার নান্দিকার নাট্য ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয়। তারপর এই নাটকটিও সারা ভারতবর্ষে দেখানো হয়। এইভাবেই নাটকের সঙ্গেই আমার জীবন জুড়ে গেল।
প্রায় ২৩ বছরে আমি কুড়িটা নতুন নাটক পরিচালনা করেছি। বিভিন্ন দলে আমন্ত্রিত হয়ে কাজ করি। আমার নিজের কোনও দল নেই। বহু অভিনেতা অভিনেত্রী আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। ‘বিনোদিনী অপেরা’ দর্শক মহলে আমাকে অন্য পরিচিতি দিয়েছে।
দর্শক এখন নাটক দেখতে আসছেন। ইয়ং জেনারেশনও নাটকের প্রতি একটা আলাদা আস্থা রাখছে। দিন যত এগোবে মানুষ লাইভ পারফর্ম্যান্সের প্রতি আরো আকৃষ্ট হবে, মুঠোফোনে বন্দী জীবন থেকে বেরোতে চাইবে। হিউম্যান কানেকশন অর্থাৎ দর্শকদের সামনে তুমি যখন একটা কিছু পারফর্ম করছ, সেটা কিন্তু আগামী দিনে আরও বেশি এক্সক্লুসিভ আকার ধারণ করবে। বাকি কোনও কিছুর কথা জানি না, কিন্তু থিয়েটারের লাইভ ফরম্যাট জীবিত থাকবে। যে কারণে ‘মাই নেম ইজ জান’ এবং ‘বিনোদিনী অপেরা’ এত হিট। মানুষ টোটাল একটা পারফরম্যান্স দেখতে আসে। নাটক কিন্তু আজও হিট করছে। এই নাটকগুলো পপুলারিটি পেয়েছে।
আমি মহিলাদের চরিত্রেই বেশি কাজ করেছি। কিছু তো কানেক্ট করাই যায়। আর মহিলাদের বেশি সুন্দর করে লিখেছেন পুরুষরাই। তবুও মেয়ে হিসেবে আমি কানেক্ট করেছি। নারী আর রাজনীতি। আর এই দুটোই তো রিয়েল স্টোরি।
আর আমাদের প্রচুর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। মেয়েদের তো পদেপদে সমস্যা। সুদীপ্তা অনবদ্য। ও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। সুদীপ্তা ও অর্পিতা এই কাজ করার সময় আর কিছু করেনি। সুদীপ্তা হয়তো নিজের ক্লাস করেছে। কিন্তু দু’জনেই ওই ক্যারেকটারে যাপন করেছে।
অর্পিতাকে বাছার কথা মাথায় এসেছিল কারণ, আমাদের একটা কাজ করার কথা। আর ওর গান জানা। শেষে ‘গওহরজান’ করব বলে ঠিক হয়। আর সুদীপ্তাকে বলার পর ও বলেছিল, আমাকে মানাবে না। আমি বলেছিলাম, তুমি বিনোদিনী হিসেবে মঞ্চে এলে তোমার থেকে বেশি কেউ করতে পারবে না। আমরা ৬ মাস ধরে স্ক্রিপ্ট লিখেছি। অর্পিতার জন্য দিল্লি যেতাম। এক বছর রিহার্সাল করেছি। দেড় বছর ধরে কাজ করেছি।
আমার অনেক কিছু করার প্ল্যান আছে। এখন একটা বিষয় নিয়ে কাজ চলছে, ট্রয়ের মেয়েদের নিয়ে।
আরও মাথায় অনেক প্ল্যান। সেগুলো পরিপক্ক হোক, এই আশা।
সুদীপ্তা চক্রবর্তী
২০২৩ সালের ৮ মার্চ প্রথম বিনোদিনী অপেরা মঞ্চস্থ হয়। সেই থেকেই আমার বিনোদিনীর সঙ্গে যাত্রা শুরু। ৪৫টা শো হয়ে গেছে, আগামীতে আরো শো হবে। এই জার্নিটা আসলে আমার কাছে খুবই সুন্দর। থিয়েটার থেকে বেশ কিছুদিন অফ ছিলাম। আমি কখনো ভাবিনি আমাকে কেউ কখনো নটী বিনোদিনীর চরিত্র অফার করবে। নাট্যনির্দেশক অবন্তির কাছ থেকে এই অফারটা পেয়ে আমি লুফে নিয়েছিলাম চরিত্রটা।
বাবা বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী। তাই পারিবারিক সূত্র ধরেই নাটকের পরিবারে আমার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই নাটকের মাধ্যমে আমার অভিনয়ে হাতেখড়ি। ‘কাচের দেওয়াল’, ‘বিকেলে ভোরের ফুল’, সহ বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয়ের পরে বিনোদিনী অপেরার বিনোদিনী চরিত্রটি নাট্যজগতে আমাকে অন্য রূপ দেয়। বিনোদিনী অপেরার পুরো ওয়ালটাই তৈরি করা হয়েছে বিনোদিনীকে কেন্দ্র করে।
বিনোদিনীর রিয়েল লাইফ। বিনোদিনী অভিনীত চরিত্র। একটা নাটকের মধ্যে আমি কতগুলো চরিত্র করার সুযোগ পাচ্ছি। তার মধ্যে গান, নাচ সবকিছু করতে পারছি। নাটকটা করার জন্য আমাকে গান নাচের বিশেষ তালিম নিতে হয়েছে। আমি মনে করি, একজন অভিনেতার কাছে এটা একটা স্বপ্নের চরিত্র। বিনোদিনীকে নিয়ে যাত্রা, নাটক, সিনেমা সবই হয়েছে। কিন্তু বিনোদিনী অপেরার সফলতার অন্যতম কারণ হচ্ছে নাট্যনির্দেশক মহিলা বলে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এটা ভাবা হয়েছে।
বিনোদিনীর মূল জার্নিটা আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়েছে। তিনি সেই সময় এমন একটা পেশা এবং পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, যাঁদের সাধারণ সমাজে কোনও জায়গা নেই। এখান থেকে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর কাজ এবং পপুলারিটি দিয়ে সমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। ওই সময় দাঁড়িয়ে তাঁর লড়াইটাকে কুর্নিশ জানাতে হয়। তাই প্রতিদিন শো করার সময় চোখের পাতা ভিজে যায়।
তবে আমি যখনই যে চরিত্র করেছি সেটার জীবন্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি— সিনেমা, ছোট পর্দা বা নাটকে। সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে, অভিনেত্রীদের জীবনযাত্রা একই আছে। অনেক পরিচালক নির্দেশকের সঙ্গে কাজ করলেও অবন্তির কাজের মধ্যে একটা পাগলামো আছে যেটা আমার দারুন লাগে।
Advertisement



