শরৎ এল রে: চন্দনগরের ঘোষ পরিবারের পুজো যেন প্রায় আড়াইশো বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে

Image: SNS

চন্দননগরের নাম শুনলে প্রথমেই কীসের কথা মনে পড়ে? উত্তরটা খুব সোজা, জগদ্ধাত্রী পুজো। চন্দনগরের সেরা উৎসব তো এই জগদ্ধাত্রী পুজোই। তাই দুর্গাপুজোয় যখন মাতোয়ারা হয়ে ওঠে সারা বাংলা তথা ভারতও, তখন চন্দননগরে বর্ষসেরা উৎসবের অপেক্ষা শুরু হয়। দুর্গাপুজোয় তেমন গমগম করে না এককালে ফরাসিদের অধীনে থাকা এই শহর। তবে চন্দননগরের বনেদি পরিবারগুলিতে মা দুর্গার পুজো হয় ঘটা করে।

তেমনই এক বনেদি বাড়ির পুজো হয় ফটকগোড়ার ঘোষ নিবাসে। হিসেব করলে দেখা যাবে দুশো বছরেরও বেশি বয়স এই বাড়ির পুজোর। বাড়ির বয়সই তো আড়াইশোর বেশি। কথিত আছে পলাশীর যুদ্ধের সময়ে তৈরি হয়েছিল এই ঘোষ নিবাস। ফটকগোড়ার নন্দ ঘোষ লেনে সেই প্রাচীন অট্টালিকা যেন আজও সেই সময়ের স্মৃতি নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

গত বছরের পুজোর ছবি (Image: Anirban Ghosh)

 চন্দননগর, তুমি কার?


 ইতিহাস বলে, ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশরা ফরাসিদের পরাস্ত করে চন্দননগর দখল করে। আর তখন থেকেই চন্দননগরের অধিকার নিয়ে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যে দ্বৈরথ শুরু হয়, যা চলে ১৮২৫ পর্যন্ত। কয়েক বছর চন্দননগর ব্রিটিশদের, তো টানা কয়েক বছর আবার এই শহর ফরাসিদের অধীনে। ১৮২৫ পর্যন্ত এই দোটানা চলার পর ফরাসিরাই শেষ পর্যন্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে এই শহরে।

বাংলার বাকি অংশে ব্রিটিশদের রাজত্ব চললেও চন্দননগরে আর পা রাখতে পারেনি তারা। তাই স্বাধীনতা আন্দোলনে বহু বিপ্লবী আশ্রয় নিতেন চন্দননগরের নিরাপদ ছত্রছায়ায়। বীর রাসবিহারী বসু,  ঋষি অরবিন্দ ঘোষ থেকে শুরু করে বহু বিপ্লবীই এই শহরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন এবং বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছেন গঙ্গাপাড়ের এই শহরে বসেই। তাই অনেকে চন্দননগরকে বিপ্লবতীর্থও বলেন।

গত বছরের পুজোর ছবি (Image: Anirban Ghosh)

 বেলুড় মঠের মতো বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে হয় এই পুজো

 এসবেরই মধ্যে ১৭৯৬ সালে (১২০২ বঙ্গাব্দ) ঘোষ বংশের অন্যতম পূর্বপুরুষ গোরাচাঁদ ঘোষ বর্তমানে ফটকগোড়ার ঘোষ নিবাসে দুর্গাপুজো শুরু করেন বলে জানিয়েছেন এই বংশেরই বর্তমান সদস্যরা। সেই হিসেব অনুযায়ী ফটকগোড়ার এই ঘোষ পরিবারের দুর্গাপুজোর বয়স এখন ২৩০ বছর।

দুই শতক পেরিয়ে তৃতীয় শতকে এসে পড়লেও এ বাড়ির দুর্গাপুজার ঐতিহ্য আজও অমলীন। এখনও সেই আগের নিয়মেই হয়ে চলেছে মা দুর্গার আরাধনা। সারা বাংলায় অন্য পঞ্জিকার নির্ঘন্ট অনুযায়ী পুজো হলেও পুরনো প্রথা মেনে এ বাড়ির পুজো কিন্তু হয় বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে। অর্থাৎ, বেলুড় মঠে যে মতে তৈরি নির্ঘন্ট অনুযায়ী পুজো হয়, সেই বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতেই হয় ঘোষ বাড়ির পুজো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিবর্তন অবশ্য করতেই হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ নিয়ম সেই দুশো বছর আগের মতোই আছে।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোয় মায়ের সামনে বসে না ঘট, দেওয়া হত সাদা পাঁঠাবলি

 দেবীমূর্তিতে সাবেকিয়ানা, সঙ্গে পুরাণের পটচিত্রও

 এ বাড়ির মৃন্ময়ী দশভুজার প্রতিমার রূপ সাবেকিয়ানায় সমৃদ্ধ। দেবী ডাকের সাজে সজ্জিতা। প্রতিমার পিছনে চালচিত্রে পুরাণের পটচিত্র আঁকা থাকে, যা এই প্রতিমার বিশেষ আকর্ষণ। শোনা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই চালচিত্রে এই পটচিত্র ব্যবহারের চল রয়েছে। মায়ের পিছনে চালচিত্রে থাকে মা জগদ্ধাত্রীর ছবির পটচিত্র। মা লক্ষ্মীর পিছনে মা কালী এবং মা সরস্বতীর পিছনে রাধাকৃষ্ণের পটচিত্র।

পুজোর চার-পাঁচ দিন এই পরিবারে থাকে রীতিমতো উৎসবের পরিবেশ। দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন এ বাড়িতে। পূজো শুরুর কিছুদিন আগে থেকেই বাড়ির মহিলারা নারকেল ও তিলের নাড়ু বানানো শুরু করেন। এ বছরও সেই প্রস্তুতি সারা হয়ে গিয়েছে দেবীপক্ষ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

গত বছরের পুজোর ছবি (Image: Anirban Ghosh)

 ঢাকের আওয়াজে আপত্তি, কেন?

 অতীতে পুজোয় ঢাকঢোলের আওয়াজে রীতিমতো গমগম করত এই বাড়ি। কিন্তু কোনও এক বছরে সম্ভবত পুজোর সময় কোনও এক দুর্ঘটনা ঘটে। তার পর থেকেই এই বাড়িতে বা পরিবারের দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা নাকি বলতেন, এ বাড়িতে পুজোয় ঢাক বাজলেই কিছু না কিছু অনর্থ ঘটে। তাই এই রীতি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবছর সন্ধিপুজোয় দেবী দশভুজাকে ১০৮টি পদ্ম নিবেদন করা হয়। সন্ধিপূজোতে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয় প্রথা মেনেই। এই ১০৮ প্রদীপ জ্বালানোর জন্য এ বাড়ির ঠাকুরদালানে একটি নির্দিষ্ট জায়গাও আছে। লুচি, ভাজা তরকারি, নাড়ু, মিষ্টি দিয়ে দেবীকে পূজোর চারদিনই ভোগ অর্পণ করা হয়।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: কথিত রয়েছে এই আশ্রমে প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল, গড়জঙ্গলের আশ্রম সংরক্ষণের দাবি

পুজোর পাঁচ দিন (ষষ্ঠী থেকে দশমী) সবাই মিলে দু’বেলা জমিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে প্রতিবছরই। পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের কাছে এ এক বাড়তি আকর্ষণ। বিশেষ করে অষ্টমীর দুপুরে এ বাড়ি গমগম করে ওঠে নিমন্ত্রিত আত্মীয়-বন্ধুদের ভীড়ে। পুজোর আনন্দ যেন পরিপূণর্তা লাভ করে ওই দিনই।

 পাঁচদিন ধরে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, হইচই     

 তবে পুজো সম্পুর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরামিষ খাওয়ার রীতিই এ পরিবারের পুজোয় চিরকালীন। অন্যান্য পুজোর মতো মহা নবমীর দিন মাছ বা মংস খাওয়ার রীতি এই পরিবারে প্রচলিত নেই। পূজো উপলক্ষে সদস্যরা সবাই খেতে বসেন একই সঙ্গে, হইহই করে। এই চার দিনের খাওয়া-দাওয়ারও বিশেষ কিছু নিয়ম রয়েছে।

গত বছরের পুজোর ছবি (Image: Anirban Ghosh)

ষষ্ঠী থেকে নবমী— চার দিনই নিরামিষ আহারের ব্যবস্থা থাকে। ষষ্ঠীর দিন লুচি, সপ্তমীতে ভাত, শুক্তো, ডাল, পোস্ত, অষ্টমীতে লুচি বা কচুরী, ধোঁকা, কুমড়োর ছক্কা, সঙ্গে চাটনি, মিষ্টি এবং নবমীর দিন দুপুরে খিচুড়ি বা পোলাও। তবে দশমীতে মাছ ভাত খেয়েই বাড়ির মহিলাদের মাকে বরণ করতে হয়। মায়ের বরণ হয়ে গেলে মাকে নিয়ে নিকটবর্তী গঙ্গার ঘাটে গঙ্গার ঘাটে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা।

 বিসর্জনের পর আরেক উৎসব

 বিসর্জনের পর বাড়ি ফিরে আলতায় বেলপাতার ডগা ডুবিয়ে তা দিয়ে তিনবার কলাপাতায় ‘শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়’ লেখার নিয়মও প্রাচীন কাল থেকে মেনে আসা হচ্ছে। এর পর কোলাকুলি ও প্রণামের পর্ব সেরে বাড়ির বড়রা মিষ্টির বাক্স নিয়ে বসেন ও মিষ্টিমুখের পালা শুরু হয়। সেও এক স্মরণীয় দৃশ্য। নৈশভোজে পোলাও-মাংস প্রতিবারের বিশেষ আকর্ষণ। চার-পাঁচ দিন দিন ধরে যথাসাধ্য নিয়ম নিষ্ঠা-সহকারে দশভুজার আরাধনা। সঙ্গে দারুন হইচই, আনন্দ, যা সারা বছরের জন্য অক্সিজেন জোগায় সবাইকে।

গত বছরের পুজোর ছবি (Image: Anirban Ghosh)

 পুজো শুরুর ইতিহাস

 এ বার ফিরে যাওয়া যাক ইতিহাসে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ঘোষ বংশের অন্যতম পূর্বপুরুষ শ্রী গোরাচাঁদ ঘোষ বৈদ্যবাটি থেকে চন্দননগরে এসে এখানে কর পরিবারের জগন্নাথ করের কন্যা চিন্তামণিকে বিবাহ করেন এবং উপহার হিসেবে এই বাড়িটি পান। তার পর থেকে এই বাড়িতেই গোরাচাঁদ ঘোষ ও তাঁর পরিবার, উত্তরসূরিদের বসবাস।

এই গোরাচাঁদ ঘোষ মহাশয়ই এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা করেন ১২০২ বঙ্গাব্দ বা ১৭৯৬ সালে। অর্থাৎ, এ বছর এই পুজোর বয়স ২৩০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। সেই বছরেই কালীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোও শুরু করেন গোরাচাঁদ। যা এখনও চলে আসছে। এই পরিবারের বংশলতিকা অনুযায়ী গোরাচাঁদ ঘোষ ২২তম পুরুষ। আর সেই বংশতালিকায় উল্লেখ করা রয়েছে যে, প্রথম পুরুষ ছিলেন ‘মহর্ষি সৌকালিন ঋষি গোত্রজ শ্রী মকরন্দ ঘোষ’। এই বংশের একটি শাখায় রয়েছে কিংবদন্তি গিরিশচন্দ্র ঘোষের নামও।

মকরন্দ ঘোষ নবম বা দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে গৌড় রাজসভায় গৌড়েশ্বর (সম্ভবত পাল বংশ) কর্তৃক পুরস্কৃত হন। মকরন্দ ঘোষের পুত্র ‘সুভাষিত’, তৎকালীন গৌড়রাজের নির্দেশে পূর্ব বাংলায় এসে বসবাস করেন এবং এই শাখাটি ‘বঙ্গজ’ নাম প্রাপ্ত হয়। সেই বংশেরই উত্তরসূরিরা এখন প্রতি বছর দুর্গোৎসব পালন করেন ফটকগোড়ার সেই বাড়িতে, যা আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/N6g_XzAG6tA?si=pYVlktiwdG_UYWBS” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>