• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 6 August, 2026

সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীন দুই শহরে

অত্যাধুনিক জল ব্যবস্থাপনা ছিল এখানে। বৃষ্টিহীন মরু অঞ্চলে বিশুদ্ধ জলের অভাব মেটাতে এখানে বিশাল জলাধার ও বৃষ্টির জল সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে যা গুজরাতকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মানচিত্রে আবারও উজ্জ্বল হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীন দুই শহরে

Photo: Statesman

আমরা জানি সিন্ধু সভ্যতা হল দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম ও বিশ্বের অন্যতম প্রধান ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতা। আনুমানিক ৩৩০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে (বিশেষ করে ২৬০০-১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সিন্ধু নদীর অববাহিকায় বর্তমান পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও আফগানিস্তানে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে।

শহরগুলো গ্রিড পদ্ধতিতে সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হত। চমৎকার পয়ঃনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বহুতল পাকা বাড়ি এবং বাতাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো ছিল এই সভ্যতার প্রধান ও বৃহত্তম দুটি শহর। হরপ্পায় প্রথম খননকাজ শুরু হওয়ায় একে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়।

কৃষিভিত্তিক এই সভ্যতার মানুষ গম, বার্লি, তুলার চাষ করত। তাদের সঙ্গে মেসোপটেমিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থা ছিল। লোথাল নামক স্থানে একটি প্রাচীন বন্দরও আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার পতন ঘটে। অবশেষে এই সভ্যতা তার দুটি মহান শহর মহেঞ্জোদাড়ো এবং হরপ্পার সাথে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

পণ্ডিতদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই হরপ্পা সমাজের পতন ঘটেছিল। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, প্রায় ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হওয়া সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়াই ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ, আবার অন্যরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ওই অঞ্চলে একটি ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছিল। ভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে গুজরাত, হরিয়ানা, রাজস্থান, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র প্রধান। হরিয়ানার হিসার জেলায় অবস্থিত রাখিগাড়ি এই সভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম ও প্রাচীনতম শহর। এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম হরপ্পান ক্ষেত্র।

গুজরাতে সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে বেশি (৫০০টিরও বেশি) নিদর্শন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধোলাভিরা এবং প্রাচীন বন্দর শহর লোথাল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ধোলাভিরা কোনও আলাদা সভ্যতা ছিল না, এটি প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা (বা হরপ্পা সভ্যতার) অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম একটি শহর। ভারতের গুজরাতের কচ্ছ জেলায় অবস্থিত এই শহরটি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে বিকাশ লাভ করেছিল এবং উন্নত নগর পরিকল্পনা ও জল সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য ধোলাভিরা বিখ্যাত। শহরটি প্রধানত তিনটি অংশে (দুর্গ, মধ্যম নগর ও নিম্ন নগর) বিভক্ত ছিল। এর বাড়িগুলো পাথর ও পোড়া ইট দিয়ে খুব নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। অত্যাধুনিক জল ব্যবস্থাপনা ছিল এখানে। বৃষ্টিহীন মরু অঞ্চলে বিশুদ্ধ জলের অভাব মেটাতে এখানে বিশাল জলাধার ও বৃষ্টির জল সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে যা গুজরাতকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মানচিত্রে আবারও উজ্জ্বল হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

আমরা আহমেদাবাদ থেকে বাসে করে গিয়েছিলাম। পৌঁছে খনন স্থল ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ছেলেবেলায় পড়া হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো যেন চোখের সামনে দেখছি। বিশাল এলাকা জুড়ে পড়ে রয়েছে ধ্বংসবশেষ। ঘন্টা খানিক ঘুরে ফিরে এসে গেলাম ধোলাভিরা আর্কিওলজি মিউজিয়ামে। এটি ধোলাভিরা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের কাছেই অবস্থিত। এই মিউজিয়ামে ধোলাভিরায় প্রাপ্ত ৫,০০০ বছরের পুরনো হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন রাখা আছে। অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার যুগের নানা পুরাকীর্তি যেমন—সিলমোহর, মৃৎপাত্র, পুঁতি, গয়না এবং খেলনা সংরক্ষিত আছে ।

এবার লোথালের কথা। লোথাল হল প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার (বা হরপ্পা সভ্যতার) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দক্ষিণতম বন্দর-শহর। এটি গুজরাতের আহমেদাবাদ জেলার ধোলকা তালুকে সবরমতী ও ভোগাভো নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত। আহমেদাবাদ থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ৮৫ কিলোমিটার রাস্তা। ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সমৃদ্ধ হওয়া এই শহরটি তার উন্নত ডকইয়ার্ড, নগর পরিকল্পনা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। লোথালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর বিশাল ইটের তৈরি ডকইয়ার্ড।

এটি তৎকালীন সময়ে সমুদ্রগামী জাহাজগুলির ওঠানামা এবং মেসোপটেমিয়া, মিশর ও পারস্যের সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যবহৃত হত। অন্যান্য হরপ্পা শহরের মতো লোথালও অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল। শহরটি উঁচু দুর্গ ও নিম্ন শহর— এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। পাকা রাস্তা, গ্রিড প্যাটার্ন এবং উন্নত ড্রেনেজ বা জল নিকাশি ব্যবস্থা ছিল। লোথালে একটি পুঁতি তৈরির কারখানা, গুদামঘর এবং ধাতব কর্মশালার নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানকার কারিগরদের তৈরি রত্ন ও কার্নেলিয়ান পাথরের পুঁতি বিদেশে অত্যন্ত সমাদৃত ছিল। ১৯৫৪ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) লোথালের ভগ্নাবশেষ আবিষ্কার করে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে লোথালে খননকার্য চালানো হয়, যার পরে পর্যটকদের জন্য প্রত্নস্থলটি এবং প্রত্নস্থল জাদুঘর স্থাপন করা হয়।

এএসআই সংরক্ষিত এলাকাটি ঘুরে দেখা গেল মাঝারি আকারের বসতিটি নকশায় মোটামুটি আয়তাকার ছিল এবং এটি একটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বসতিটির উত্তর-পশ্চিম অংশে, বেষ্টনী প্রাচীরের বাইরে একটি সমাধিক্ষেত্র ছিল। মূল দুর্গটিতে একটি উঁচু এলাকা ছিল, যেখানে এখন আবাসিক ভবন, রাস্তা, গলি, স্নানের ফুটপাত এবং নর্দমার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।

লোথালে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, জাহাজ চলাচলের জন্য একটি জেটি-সহ একটি সুপরিকল্পিত জনপদ নির্মিত হয়েছিল। এখন এর একটি ছোট অংশই দেখা যায়। দেখে বোঝা যায়, রাস্তাগুলো মাটির ইট দিয়ে বাঁধানো ছিল, যার উপরে নুড়ি পাথরের একটি স্তর ছিল। ঘন্টা দুই ঘুরলেই সব দেখা হয়ে যায়। গবেষকরা সময় নিয়ে আসেন। থেকে যান প্রত্নতাত্বিক ইউ শহরে।

ভ্রমণের সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ।
স্থান: পূর্ব গুজরাতের সবরমতি নদীর মোহনার কাছে।
বিমান : নিকটতম বিমানবন্দর: আহমেদাবাদ।
রেল: নিকটতম রেল স্টেশন: আহমেদাবাদ।