চড়ক-গাজন: গম্ভীরা

চড়কের মেলা (ছবি-Getty Images)

ধর্মের জন্য আগে নরবলি হত। দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য ছিল দৈহিক নির্যাতনের প্রথাও। চড়ক-গাজন লোকউৎসব।এই উৎসবের  মূল কথা ভোগ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে।গবেষকদের মতে, গাজন গ্রামের সাধারণ উৎসব। ‘গ্রামজন’-গ্রামের মানুষ। এ ‘গ্রামজন’ থেকে ‘গাজন’ হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, চড়ক-গাজন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র শিবঠাকুর। শিবভক্ত সন্ন্যাসীদের আনন্দ-উল্লাসের শব্দ গর্জনের মতো শোনায়। এই গর্জন থেকে গাজন হয়েছে। পুরাণ মতে, শিবভক্ত রাজা বাণ চৈত্রমাসের সংক্রান্তির দিন ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে শিবপুজো করতেন। উত্তরবঙ্গের এই রাজা এইদিন শিবকে তুষ্ট করার জন্য রক্তদান করেছিলেন নিজের বুক থেকে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের রানি রঞ্জাবতী গাজন পালন করতেন। পাল ও সেন বংশের রাজত্বকালে বাংলায় এই উৎসব হত।

সাধারণত নিম্নবর্ণের মানুষ, এতে অংশগ্রহণ করত। শিবভক্তকে ‘ভক্ত্যা’ বা সন্ন্যাসী বলে। চৈত্রমাসের প্রথম দিন থেকে শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা ফলমূল আর নিরামিষ আহার করে।নিত্য গঙ্গাস্নান করে।যেখানে গঙ্গা নেই, সেখানে নদী বা পুকুরে স্নান করে।এই উৎসবে তিনটি উৎসব একাত্ম হয়ে আছে- ঘাট সন্ন্যাস, নীলব্রত ও চড়ক। গবেষকদের মতে, এই উৎসবের দেবতা কেবল শিব নন, ধর্মমঙ্গলের ধর্মঠাকুরও। কোনও কোনও অঞ্চলে নৈবেদ্যর মাঝখানে দাগ কেটে দেওয়া হ্য।এর অর্থ এক ভাগ শিবের, অন্য ভাগ ধর্মঠাকুরের। উভয় গাজনেই সন্ন্যাস করতে হয়, দৈহিক নির্যাতন সহ্য করা হয়।

গাজনের সঙ্গে চড়কের সম্পর্ক নিবিড়। চৈত্র মাসের শেষভাগে একটি শালের খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার মাথায় একটা বাঁশ বাঁধা হয়। সন্ন্যাসী পিঠে বঁড়শি বিদ্ধ অবস্থায় ওই বাঁশ থেকে ঘোরে। এই শাল খুঁটির নাম চড়ক গাছ বা চড়ক দন্ড। এর অন্য নাম ‘গজারি’।’গজারি’ শিবেরও একটি নাম। চড়ক-গাজনে সন্ন্যাসীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।


সন্ন্যাসীরা শিবলিঙ্গ মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি যায়।শিবলিঙ্গ শিবের প্রতীক,প্রজননেরও প্রতীক। পিঠ ও জিভ বাণবিদ্ধ করা, বঁটি-দা বা বৈঁচি কাঁটার ওপরে ঝাঁপ, পিঠ বঁড়শি বিদ্ধ করে চক্রদন্ডে ঘোরা,জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটা,কোথাও নরমুন্ড হাতে নিয়ে নাচা-এসব চড়ক পুজোর বিশেষ অঙ্গ। চড়কের শিব নীলশিব।সমুদ্র মন্থনের বিষ ভক্ষণের জন্য শিব নীলকন্ঠ। তাই শিব নীল।

প্রসঙ্গত স্মরণীয়, নীলশিবের মতো নীলদুর্গা, নীলসরস্বতীও আছে।এই শিবপুজো হয় সূর্যপুজোর রীতি মেনে। শিবের অন্য নাম নীলার্ক।অর্ক-সূর্য। তাই চড়ক-গাজন শিবের সঙ্গে সূর্যেরও পুজো। উত্তরবঙ্গে গাজন ‘গম্ভীরা’ নামে খ্যাত। গম্ভীরা শিবেরই একটি নাম। মন্দিরের ভিতরে একটি কুয়ো থাকে। এই কুয়োতেই শিবের অধিষ্ঠান। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বাংলায় ধর্মঠাকুরের পুজো হয়। এই ধর্মঠাকুরের আসন তৈরি হয় গামারি কাঠ দিয়ে। এই গামারি কাঠেরও নাম ‘গম্ভীরা’।

ওড়িয়া ভাষায় ‘গম্ভীরা’ হল নির্জন কক্ষ । তাই ‘গম্ভীরা’ বলতে শিবের মন্দিরও বোঝায়। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, চৈত্র মাসে বাংলার মালদায় গাজন হ্য়।তার নাম ‘গম্ভীরা’।