পাটকিলে, বাদামী, সাদা সাদা, রোগা রোগা, নোংরা নোংরা। বেশ কয়েকটা গরু ছিল আমাদের প্রবীণ মাস্টারমশায়ের। তাঁর বাড়ির গলি আর আমাদের বাড়ির মাঝখানে যে ন্যাড়া মাঠটুকু, ঘুরে ফিরে চরে বেড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে সেখানেই তারা বসে থাকতো। তো, এক ঘোর বৃষ্টির দিন সন্ধেবেলা
ঢ্যা-ঢ্যাণ, ঢ্যাং ঢ্যাং ঢ্যাং করে দমকলের লাল গাড়ি ঢুকল আমাদের পাড়াতে। এই বৃষ্টিতে আবার আগুন লাগলো কোথায়? কীভাবে? ও হরি… জানা গেল, মাস্টারমশায়ের একটা গরু নাকি কুয়োয় পড়ে গিয়েছে।
ব্যাপারটা হরিবল কিছু না হলেও, সংকটজনক তো বটেই! তবু, যারা শুনছিল, প্রায় সকলের মুখেই কেন যে হাসি ফুসকে উঠলো, কে জানে! কথকের বলার ভঙ্গিতেই হয়তো। তপুদা তাও গম্ভীরভাবে বললেন, তোদের মাস্টারমশায়ের ক’জন গরু ছিল রে? মানে তোরা দু-ভাই ছাড়াও আরও কিছু ছেলেপুলে, ছাত্র-টাত্র, ছিল?
তপুদার কথাতে ততো গুরুত্ব না দিয়ে সুরো বলল, দমকলের লোকজন মাস্টারমশায়কে বেশ অপমান করেছিল কিন্তু। খেতে টেতে দেন? এমন হাড্ডিসার চেহারা কেন? এসব বলেছিল। বলতে বলতেই, আরেকদিনের আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল বলে বেজায় হাসি পেয়ে গেল ওরও।
সুরজিত-সুকল্যাণের বাবা সেই সময়ে সপ্তাহের শেষে বাড়ি আসতেন। শুক্র কী শনিবারের সন্ধ্যায়। বড়ো ভাই সুরো সদাই আনমনা, অঙ্কে ফঙ্কে আরওই মন বসে না। শুক্র-শনিতে উদগ্রীব হয়ে থাকে আরও, কারণ বাবা আসা মানেই ব্যাগের ভেতর থেকে একগাদা খেলার ম্যাগাজিন আসা, নানান পত্রপত্রিকার সঙ্গে। তো, যথাসময়ে ক্যাঁচ করে আওয়াজ হল একটু দূরের মেন গেটে। তারপরই মন্থর পদক্ষেপ: গ্রেটার ম্যাটার গ্রেটার ম্যাটার… গঠন মূলক, গঠন মূলক…। বারান্দা দিয়ে উঠে এসে, যথারীতি, পাশের ঘরে, মা যেখানে বসে, শব্দটা সেখানে থামল।
মায়ের আচরণ কিন্তু কিছুটা অন্যরকম। যেন অস্ফুট বিস্ময়, ওম্মা, এ কী এ কী… এই, এই, হেই, হেই! হ্যাট হ্যাট… যাহ্! সেই মুহূর্তে পেটের মধ্যে ভশভশিয়ে ওঠা হাসিটা আজও সুরো অনুভব করে নিজের শরীরে। ছোটভাই সুকি লেখাপড়ায় মনোযোগী, বাইরের আওয়াজে কান দেয় না তেমন। চারপেয়ে গৃহপালিতদের মধ্যে কেউ একজন খুঁজতে এসেছিল তাদের প্রভুকে, গৃহশিক্ষক হিসেবে তিনি কীভাবে ট্যাকল করেন দু’পেয়েদের, দেখতে, অথবা পাশে বসতে— ব্যাপারটা অনেকের মধ্যে জানাজানি হলে পর যে হাসির হুল্লোড়, ছোটভাইয়ের তা কিছুই মনে নেই। আসলে, সে তখন এতটাই ছোট যে ওই ঘটনার গভীর তাৎপর্য বোঝার অবস্থায় ছিল না!
২
ছোটভাই ভালো ছাত্র। কাজেই কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরি করবে, স্বাভাবিক। বড়ভাই একটু এলোমেলো। একের পর এক কাজকম্ম ধরে আর ছাড়ে, তারপর আবার পেয়েও যায় কিছু না কিছু। মা-বাবার বন্ধুরা বোঝালেন, বিয়ে দিয়ে দিন, সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘটনাক্রমে দুই ভাই-ই থিতু হল এমন দুটি দপ্তরে, যেখানে রাজস্ব আহরণের কাজ করতে হয়। বেশ গরম গরম ব্যাপার, আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশীর ভাবনায়। বাবাদের এক সহচর হিংসুটে উল্লাসে বলেই ফেলেছিলেন, আঃ! দুইখান পোলা কী নামাইসে, ক’দেখি!
দুইখান পোলাই আবার অনেকের মতে, সংসার জীবনে অসুখী। দু’জনেই নাকি নিজেদের বউকে খুব ভয় পায়। সেখানে কথা ওঠে, ওদের মা প্রবল নারিবাদিনী দাপুটে রমণী ছিলেন। কর্তাসহ পুত্রদের দুরমুশ করতেন সবসময়ে। বউকে ভয় পাওয়া তারই ফলাফল। এই যে দমকল প্রসঙ্গ এলো, এই সূত্রেই তো; গাঁজাখুরি গসিপের ঝাঁপি খুলে গেল চারিদিকে… আহা, ভোরবেলা দমকল, আজকাল পিঁ উউউউ পিঁ উউউ শব্দ করে আসে, কত যে গল্প তার জন্যে ভাসে! ছোটভাই ছাদের ঘরে আটকা পড়েছিল? ধুস! মাত্র এইটুকু? কিছু একটা লুকনো ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে, দ্যাখো গিয়ে— বলাবলি করে এ ও সে।
ঘটনাটা আসলে খুবই ছোট। সুকির স্ত্রী ও কন্যা ভিন্রাজ্যে বেড়াতে গিয়েছে, মহিলা পরিচালিত, মানে লেডিজ ওনলি ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে। সেই অবকাশে, তেতলার ছাদে সুকির যে আরাম করার ঠান্ডা ঘরটা, সেখানে ঘুমোবার ইচ্ছে হল। এমন সে মাঝেমাঝেই করে, গরমকাল এলে শুধু নয়, দাম্পত্যকলহ সংঘাতে রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনাতেও। তা, সে ঘরে ঢুকে টিপতালাটি বন্ধ করেছে, ওদিকে তার চাবি রয়ে গিয়েছে নিচে। বোঝো ঠ্যালা!
ঘুম থেকে উঠে, সমস্যাটা অনুধাবন করেই সে দাদা-সহ একে ওকে তাকে ফোন করতে শুরু করলো। হ্যাঁ, আরও অনেকের মতন ঘুমোবার আগে ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করার অভ্যেস তার। দাদা সুরো, ঘুমের ঘোর পুরোপুরি দূরীভূত না হওয়া চেতনায় প্রথমে বুঝতেই পারছিল না, সমস্যাটা ঠিক কোথায়। প্রতিবেশী একজন বললেন, তালা ভাঙতে হবে… তবে সে লোককে বেলা এগারোটার আগে পাওয়া যাবে না। তখন, এর ওর তার সঙ্গে আবার ফোনাফুনি করে, সুকি দমকল দপ্তরের পরিচিত তিন ডিজিট নম্বরে ফোন লাগাল। তারা আবার দিল সবচেয়ে কাছের এলাকার ফায়ার স্টেশনের নম্বর। আজকাল দমকল নয়, বলা হয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট। তাঁরা আধঘণ্টার মধ্যে এসে পড়লেন। করজোড়ে ছাদ থেকে সুকি তাঁদের আপ্যায়ন করল করুণ মুখে— আপনাদের বিব্রত করার জন্য লজ্জিত…
আহা, দেখেছ, যেন বিনয়ের অবতার… আড়ালে বলছিল কেউ। ওই যারা স্থির জানে, কিছু একটা ঘাপলা নিশ্চয়ই আছে। সংকটমোচন কর্মীরা, ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে, হ্যাসেল, না কী যেন বলে, সেটা বিশাল মোটা একটা দড়িতে বেঁধে ছাদে তোলার ব্যবস্থা করলেন। রূপকথার বইয়ের ছবিতে রাক্ষস খোক্কস যেমন অস্ত্রে রাজাগজার মুণ্ডু কাটে, তেমনই বিরাট কাঁচি লাগে লোহা কাটতে। যাইহোক, আর তো টেনশনের কিছু নেই, কাজেই রাস্তায় আরও অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সুরোর ওই মোটা দড়ি দেখে গরুর দড়ির কথা মনে এলো। অনেকেরই মনে হল, কুকুর বেড়াল ছাদের কার্নিশে বা অমনই দুরূহ কোথাও আটকা পড়লে এইভাবে উদ্ধার করা হয়। গ্রামেগঞ্জে গরুপতন তো কমন ঘটনা, অনেকেই শৈশব কৈশোর স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছিলেন। হাওড়া ব্রিজ বা অমনই কোনও উঁচু জায়গা থেকে মানুষ নামিয়ে আনা একরকম, আবার কুয়ো থেকে কোনও প্রাণী তুলে আনা আরেকরকম কায়দার। তপুদা যেভাবে হাত নেড়ে উঁচু ও নিচু বোঝালেন, তাতে হাসির হিল্লোল উঠলো আবার…
হাওড়া ব্রিজের মাথায় পাগল মানুষ উঠে পড়ার বিষয়টা, সুরোর মনে ভিন্ন এক ভাবতরঙ্গের দোলা দেয়। আচ্ছা, সমস্ত উন্মাদ কেন শুধু অমন উঁচু উচু বিখ্যাত জায়গায় ওঠে? উচ্চাকাঙ্ক্ষা? জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের ইচ্ছে? বেশ কয়েকবছর আগে কাজের সূত্রে যখন তাকে হাওড়া যাতায়াত করতে হতো, তখন নানারকম সহকর্মীদের সামনে কথায় কথায় বলে উঠেছিল, পাহারা না থাকলে, হাওড়ার দিক থেকে ওই ওপরে বেয়ে বেয়ে ওঠা কিন্তু খুব কঠিন না… লক্ষ্য করে দেখেছি, আমিও পারবো, মানে এখনও আমার যা বডি ফিটনেস… কারও কারও চোখ যেন কেমন কেমন হয়ে যাচ্ছিল, খেয়াল করেছে সে। এক দাদা-বন্ধু যেন ধমকে উঠেছিল, না না, ওসব করতে যাবেন না…
পাড়াতেও এক দাদা-বন্ধু ততক্ষণে দারুণ এক রোমাঞ্চকর গপ্পো ফেঁদেছেন। রাস্তায় পথচারী, সাইকেলধারী, নানান কাজে চলাচল করা নানারকম মানুষ, দমকলকর্মীদের দড়ি গুটিয়ে তোলা থেকে নানান কর্মকাণ্ড দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে কিছুক্ষণ। কেউ বা ভাবছে, পুলিশ। কী হয়েছে? কীভাবে? সব্বার চোখেমুখে জিজ্ঞাসা। অমনই থমকে যাওয়া কারও কথায় যেন উঠে এলো এলাকার কোনও পুরনো বাড়ি ভেঙে প্রোমোটারের ফ্ল্যাট বানাবার প্রচেষ্টায় ভৌতিক ব্যাঘাত প্রসঙ্গ। সে বাড়ির বাগানের কোণেও নাকি কুয়ো ছিল, বুজে গিয়েছিল নানান আবর্জনাতে। প্রতিবেশীরা বলতো, ওখানে নাকি গুপ্তধন থাকার সম্ভাবনা। জঞ্জাল অপসারণ করতে গিয়ে অবশ্য একটা বেড়ালের কঙ্কাল ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু মেলেনি। লোকজন তবু বলতে ছাড়েনি, ওই তো… যক্ষ, যক্ষ… পাহারা দিচ্ছে, বুঝলে না?
৩
‘কী লোক মাইরি, বউকে এত্ত ভয় যে ছাদে গিয়ে তালা লাগিয়ে ঘুমোতে হয়? বউ যখন বেড়াতে গেছে হাজার মাইল দূরে?’
‘আরে না না, আসল কথা হচ্ছে, গুপ্তধন, সেই গুপ্তধন। এসব লোকের বাড়ির দেওয়াল ভেঙে দ্যাখো, লাখ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। নিজের ছায়াকেও ভয় পায় এরা। চাঁদনি রাতে কলাগাছে ভূত দ্যাখে… তাই তালা চাবি দিয়ে সিকিউরিটি খোঁজার চেষ্টা…’
‘আগেও এমন হয়েছে কিন্তু! বাইকের চাবি হারিয়েছে… দরজার তালা বন্ধ করে চাবি কোথায় রাখল, মনে থাকে না…’
‘কেউ কেউ আবার দরজার তালা কিংবা ছিটকিনি, ঠিকঠাক লাগানো হয়েছে কিনা সন্দেহ থাকে বলে, বিছানায় শুয়ে পড়েও আবার উঠে, দ্যাখে…’
কথাবার্তা ক্রমে ঘুরে যায়, ভীতু পুরুষরা পত্নীকে পেত্নী মনে করে কীনা, সেদিকে। কেউ বা এক্সপার্টস ওপিনিওন দেন, পেত্নী শাঁখচুন্নি কী সুগৃহিণী যাইই হোন, মেয়েরাই দুর্নীতিযজ্ঞে প্রধান পুরোহিত। মানি মাইন্ডেড, ম্যানিপুলেটিভ মেয়েরাই পুরুষকে প্ররোচিত করে টাকাকড়ি সম্পদ বাড়াতে।
সুরো, তার স্বভাব অনুযায়ী ভাবনায় সামগ্রিক দেশ-দুনিয়ার কথা ভাবে। উত্তর ভারতে পণপ্রথা আজও বেশ ভয়ংকর, পণের জন্য বধূহত্যা প্রায়ই খবরে আসে। ওদিকে দক্ষিণ ভারতে বেশি শোনা যায় কৃষকের আত্মহত্যা। নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে সেখানে প্রচলিত; সম্পদের ক্ষয়ের জন্য বউকে দায়ী করার প্রচলন নেই। আবার অনুলোম প্রতিলোম ব্যাপারটা উত্তর ভারতে অধিক মান্যতা পায়, তাই কি মেয়েদের নিচু চোখে দেখার নিয়ম? সামাজিক বিচারের মাত্রা নানারকম… সে লাইনে কিছু ভাবনায় ডুব দেবার আগেই সুরো শুনতে পায়, জনগণের আলোচনা বেশ সরস দিকে বেঁকে গিয়েছে।
‘আরে, বেশি বেশি মায়ের খোকা যারা, বিয়ের পর তারাই সব্বার আগে গিয়ে ঢোকে বউয়ের আঁচলের তলায়… চেয়ে দেখুন চারিদিকে, আমার কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন।’
মুখে একটা আলগা হাসি ঝুলিয়ে রাখলেও, সুরোর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে। তাদের দু-ভাইয়েরই অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। মায়ের দাপটেই যেন প্রেম-ফ্রেম প্রশ্রয় পায়নি ঠিক কোনোদিনই। তবু, বড়ো ছেলের বিয়ের ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ ছিল খুব। বসন্তের এক ছুটির দিন, অফিসের ইয়ার এন্ডের ঝামেলা সামলে বিধ্বস্ত সুরো যখন দিবানিদ্রার আয়োজন করছে, মা তখন বেশ আহ্লাদের সঙ্গে প্রসঙ্গটা পাড়লেন, তোর পছন্দের কেউ থাকলে বল, আয়োজন করি!
পছন্দ তো সেই সময়ে অনেককেই সে করতো, কিন্তু বউ হিসেবে ভাবা চলে কাকে? অফিসের কিছু কিছু প্রবীণ কলিগদের পাগল পাগল হাবভাব মনে এলো। তাঁরা যত বুড়ো হচ্ছেন, ততই যেন যাহোক তাহোক করে রোজগারের খাঁই বাড়ছে। নির্বিচারে দুর্ব্যবহার করছেন কাজ নিয়ে দপ্তরে আসা লোকজনের সঙ্গে। বাবারে, আমিও বুড়ো বয়সে এখানে থাকলে অমন হয়ে যাবো? বরং যে কোনও একরকম পাকা চাকরি করা কোনও মেয়ে যদি তাকে বর হিসেবে পছন্দ করে, সে দিব্যি হাউজ হাজব্যান্ড হিসেবে তার পোষ মেনে নিতে পারে। কিন্তু একটা দামড়া ছোঁড়াকে পুষবে কে?
বিয়ে করে পাওয়া বউকে সরলচিত্তে এসব কথা বলতে গেলে, বউ তাকে এস্কেপিস্ট বলে গালি দিয়েছে। প্রেমপ্রচেষ্টাগুলো কীভাবে বারংবার ভেস্তে গিয়েছে, বলার সাহস পায়নি। একটি শান্তশিষ্ট মেয়ের সঙ্গে তার বেশ কিছুদূর অবধি ভাব বিনিময় হয়েছিল কী কী ব্যাপারস্যাপার ভালোবাসে, রুচির সাদৃশ্য কতখানি, তা আন্দাজ করতে। ছোটবেলাটা কীভাবে কোথায় কেটেছে, এই প্রসঙ্গেই তাল কাটল প্রথম। মেয়েটির বাবা কোল বেল্টে কাজ করতেন, ওরা থাকতো বরাকর। সুরো শুনল, বলাগড়। তুচ্ছ ব্যাপার, কিন্তু মেয়েটি ক্ষেপে গেল তো গেলই। কানে কালা ভেবেছে? অথবা তার নিজেরই চেহারা বা উচ্চারণ নিয়ে কমপ্লেক্স ছিল কোনও?
এসব কথা কি বন্ধু কলিগ অথবা ভ্রাতৃপ্রতিম কাউকে কখনও বলা যায়? অফিসে কর্তাব্যক্তিরা তাকে সিরিয়াসলি কখনোই নেননি। এলেবেলে কাজ, কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রির কাজই তাকে দেওয়া হতো বেশিরভাগ সময়ে। প্রথম জীবনে কলিগ কেউ কেউ বলেছেন, এসব চাকরিবাকরি আপনার দ্বারা হবে না। স্কুল মাস্টারি ফাস্টারি দেখে নিন। সে কাজটাও কি সোজা? ছাত্ররা তাকে মানবে কেন? ঘষে ঘষে বুড়োবয়সে এসে অবধি বোঝা হল না, চাকরি করতে করতে কীভাবে বড়োলোক হওয়া যায়!
জনগণের কথাবার্তা এবার সিরিয়াস দিকে ঘুরেছে। ‘ওইভাবে ছেঁড়া গেঞ্জি পরে থাকে গরিবিয়ানা দেখাতে… যাতে চাঁদা-ফাঁদা বেশি দিতে না হয়। এরা বেশিরভাগই এইরকম, মুখ শুকিয়ে ঘোরা পাবলিক। পাবলিক মানি নিয়ে কাজ করতে করতে…’
দমকলের গাড়ি পাড়া ছেড়ে চলে যেতে, বিনোদনে ঘাটতি হল। জনসাধারণকে এবার যার যার নিজস্ব কোটরে ঢুকে পড়তে হবে। আরেকটু বড়োলোক হবার চেষ্টায়, আরও কিছুটা নিজেদের গুছিয়ে নেবার জন্যে দিনাতিপাত, এই তো পাড়াপ্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের জীবন! গ্রেটার ম্যাটার কিছুই নেই তার বাইরে।
জীবনে কিছুই করে উঠতে না পারা, মানে করতে পারেনি বলে ধরে নেওয়া বউয়েরা ঠিক কীভাবে তাদের বরদের গাল পাড়ে, সেই বর্বরতার মহিমা মনে করে, সুরোর মুখে আবার অল্প অল্প হাসি ফোটে। ক্রাইসিস তো কেটে গিয়েছে আপাতত! সুকি নিচে নামতেই, প্রতিবেশী একজন কাকু সোল্লাসে বলে উঠলেন, মরাল অফ দ্য স্টোরি কী হল তাহলে? ফ্যামিলি নিয়ে সবাই একসঙ্গে ঘুরতে হয়, আলাদা আলাদা নয়,
তাই তো?
সুকির সে সুযোগ এখনও আছে হয়তো। কিন্তু সুরোর এবার নিজেকে সত্যিই বুড়োমানুষ মনে হচ্ছে। খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার, এইটুকুই তার পৃথিবী। সেই কতদিন ধরে যে বউয়ের কাছে নিরন্তর গালাগালি শুনে আসছে, মায়ের খোকা। মাস্টারমশায়ের গরু…




