• facebook
  • twitter
Monday, 2 March, 2026

দিলওয়ালোঁ কা বইমেলা

বই তো শুধু বই নয়, সাহিত্য জীবনের প্রতিফলন। জীবন থেকে উঠে আসা গল্পগুলি যদি সাহিত্যের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে উদাহরণ হয়ে প্রতিফলিত না হয়, তা হলে এতো বই, এতো মেলার আয়োজন সবই বৃথা হয়। বই বিক্রি বা হাতবদল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে জ্ঞানের আদানপ্রদান হয়, মতামতের হয় লেনদেন। এই লেনদেনের মাধ্যমেই সাহিত্য বেঁচে থাকে। বৃত্তের বাইরের বাঙালির ক্ষেত্রে তাই সংখ্যা নয়, সুযোগটিও একটি বড় কথা। এটা শুধু দিল্লি নয়, বৃত্তের বাইরে থাকা সকল বাঙালির কথা, যা হয়তো ভরকেন্দ্রে পৌঁছয় না।

কাল্পনিক চিত্র

সৌরাংশু

‘দিল্লির বইমেলার তুলনায় কলকাতার বইমেলা কেমন লাগছে?’ একটা হঠাৎ বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে আমার আর অরূপদার উপস্থিতি। অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী। বর্তমানে অবসরের পর নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করছেন এবং জনপ্রিয়ও। দিল্লির কোনও এক লেখিকার বই আনুষ্ঠানিক প্রকাশিত হবে স্টলের সামনে। আমাদের দু’জনেরই ডাক পড়েছে। তা সেখানেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হতে তিনি উভয়কেই জিজ্ঞাসা করলেন উপরোক্ত প্রশ্ন।

Advertisement

অরূপদা ভদ্রলোক, বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, ‘দুটো সম্পূর্ণ আলাদা! আর এটা তো আমাদের প্রথমবার নয়!’ কথাটা বোধহয় কোথাও আমাদের বুকে লেগেছিল।

Advertisement

বহুবছর আগে, গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শেষে দিল্লির বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত প্রথম বাংলা বইমেলা উদ্বোধন করতে এসে বরেণ্য সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন বোধহয়, কলকাতায় না লিখলে বাংলা সাহিত্যের সংস্পর্শ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আমি ভুল হতে পারি, হয়তো কথাটা ঠিক এটা নয়, তবে শুনেছিলাম যে খুব বিতর্ক হয়েছিল এই নিয়ে।

গত শতাব্দীর শেষদিকেই ভারতে আন্তর্জাল চলে এসেছে। আর এই শতাব্দীতে তো অফিসের কিউবিকল পেরিয়ে মানুষের ড্রয়িংরুম উপচে শয়নকক্ষে প্রবেশ করেছে। এখন কি অবস্থাটা পাল্টেছে?

বস্তুত বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে নিয়ে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং অন্যান্য বঙ্গভাষী অঞ্চলের এই দ্বন্দ্ব তো নতুন নয়। এর আগেও ঢাকা-কক্সবাজারের সঙ্গে অবিভক্ত বঙ্গে এই দ্বন্দ্ব হয়েছে। কলকাতা তার সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে বাংলা সংস্কৃতি-সাহিত্যের ভরকেন্দ্র হয়ে বসে আছে। অথচ শরদিন্দু, সতীনাথরা সেই ভরকেন্দ্রে না অধিষ্ঠান করেই যুগান্তকারী হয়েছেন। এমনকি শরৎচন্দ্র, অতুলপ্রসাদ সেনও।

তাহলে? তর্কাতীতভাবে কলকাতায় বাংলা বই কেনার লোক বেশি, কারণ কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বাংলাভাষী সাহিত্যপ্রেমীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু তা বলে কি কলকাতার বাইরে বাংলা বইয়ের বাজার নেই? না, প্রশ্নটা ভুল হল। বাজার হলেই সমস্ত কিছু সংখ্যা দিয়ে দেখার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। বরং কথাটা এভাবে বলা যাক, কলকাতার বাইরে কি বাংলা বইয়ের পাঠক নেই? বা উপস্থিতি নেই?

আসলে পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এবং উনপঞ্চাশটি বইমেলার পর কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার বাণিজ্যিক দিকটা এমনই প্রবল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সমস্ত কিছুকে সংখ্যার নিক্তিতে মাপা হয়। প্রকাশকরাও তাই। অবশ্য একদিক থেকে দেখলে তাতে দোষের কিছু নেই। যদি উপার্জনই না হয় তা হলে বই ছাপা হবে কীকরে, আর বই ছাপা না হলে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হবেই বা কীকরে! অর্থাৎ বাণিজ্যই তো শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে বা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে! লক্ষ্মীই তো সরস্বতীকে ধরে রাখে!

কিন্তু, দু’ফুট কাস্তের হাতলই যদি দেড় ফুটের হয় তাহলে? ফসল কাটার সময় তা কি কার্যকরী হবে? অর্থাৎ বাণিজ্য ও শিল্পে, সরস্বতী ও লক্ষ্মীর মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। কতটা বাণিজ্যমুখী হলে শিল্পগুণ বজায় থাকবে, বা গুণমানে আপস করতে হবে না!

এইখানেই মনে হয় কিছুটা সচেতনতা বা সংবেদনশীলতার প্রয়োজন আছে। কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে কোনও জেলা বইমেলার তুলনা হবে না— ধারে এবং ভারে! কলকাতা বা আগরতলা বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বইমেলা তো দূরঅস্ত! তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার বাইরে, বাঙালি যেখানে সংখ্যালঘু, সেখানকার বাঙালিরা বাংলা বই পড়বে না?

এই বিষয়টা নিয়েই অধিকাংশ প্রকাশক, বইবিক্রেতা ভাবনাচিন্তা করেন না, করেননি। কারণ, বৃহত্তর পাঠক সমাজ বা বলা ভালো বাংলা ভাষার ভরকেন্দ্রের বাইরের পাঠক সমাজের কাছে তাঁদের দায়বদ্ধতা নেই। বৃহত্তর বাংলার পাঠক বই সংগ্রহ করবে শুধুমাত্র কলেজ স্ট্রিট থেকে এবং বর্তমানে হয় তো অনলাইন থেকে।
তাদের কাছে বিশাল এক রাজসূয় যজ্ঞের অঙ্গ হিসাবে, মাইলখানেক পথ হেঁটে বইয়ের গন্ধ শোঁকা, নতুন বই উল্টেপাল্টে দেখা, ফ্রাই-চপ-বিরিয়ানির আবহে তা সংগ্রহ করার (নতুন বই, বিরিয়ানির কথা বলিনি) অস্পৃশ্য থেকে যাবে।

এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে দিল্লিতে বাংলা বইমেলা হয়। বছর বছর হয়। এখন তো আবার তিন তিনখানা বইমেলা হয়। সর্বত্র সমসংখ্যক বই বিক্রি হয় এমন অপবাদ ঘোরতর বিশ্বাসীও দিতে পারবে না। তবু হয়।

আর যে বাকি দু’টি স্থানে বইমেলা হয়, দক্ষিণ দিল্লি এবং চিত্তরঞ্জন পার্কের চিত্তরঞ্জন ভবন, সেখানে স্থায়ী মেলা প্রাঙ্গণ থাকার সুবিধা এবং অসুবিধা দুই-ই আছে। সুবিধা বলতে মানুষ জানে যে, অমুক সময়ে অমুক জায়গায় বইমেলা হবে, বাংলা বইমেলা। আর অসুবিধা বলতে, স্থানাভাবের কারণে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক স্টলই হবে।
প্রথম মেলাটির প্রথম দু’টি পর্বে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে আয়োজন করেছিল, পরবর্তীকালে দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ি এককভাবেই কাজটি করছে। দ্বিতীয় মেলাটির ক্ষেত্রে সপ্তর্ষি বলে একটি সংস্থা শুরু করেছিল। এই দুই বইমেলা কিন্তু স্থানিকতার কারণে কমবেশি সফল।

তা হলে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আবার একটি মেলা করে কেন? সপ্রু হাউসে শুরু করে, প্রগতি ময়দান ছুঁয়ে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের মেলা বেশ কিছুদিন হয়েছিল নিউদিল্লি কালীবাড়ির প্রাঙ্গণে। কিন্তু সেখানেও একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার পর স্টল সংখ্যা বাড়তে পারে না। ফলস্বরূপ ২০১৯-এ এই মেলাটি আয়োজিত হয় পেশোয়া রোডের গৃহকল্যাণ কেন্দ্রে। সার্বিকভাবে সফল সেই মেলাটিতে বাংলাদেশ থেকে ১৩ জন প্রকাশক অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু কোভিড পরবর্তী সময়ে সেই প্রাঙ্গণের অবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একেবারে ভেঙে পড়ে এবং বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনও বেশ কয়েকবার এদিক ওদিক করে শেষমেশ এই বছর মার্চের ১৯-২২ তারিখ ঐতিহ্যমণ্ডিত শতাব্দীপ্রাচীন রাইসিনা বেঙ্গলি স্কুল, মন্দির মার্গের ফুটবল মাঠে আয়োজন করছে।

গত বছর যেখানে আয়োজিত হয়েছিল, সেই ৫, অশোকা রোডের মেলাটি সর্বাঙ্গীনসুন্দর এবং বাণিজ্যসফলও ছিল। কিন্তু ২০২৬ থেকে কিছু আয়োজনগত অসুবিধার কারণে সেখানে এবার আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আসলে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্য দিল্লিতে মেলাপ্রাঙ্গণ বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব সংবিধান। দিল্লি, গাজিয়াবাদ, নয়ডা, গ্রেটার নয়ডা, ফরিদাবাদ, গুড়গাঁওয়ের বিস্তৃত এলাকায় যে বিপুল সংখ্যক বাঙালি বাস করে তাদের প্রতিনিধিত্ব করে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন। সেই হিসাবে এই সমস্ত বাঙালির প্রতিই তাদের দায়বদ্ধতা। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সঠিক স্থান খুঁজে সেখানে মেলা করাটা বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের অবশ্য কর্তব্য। আশা করা যাচ্ছে যে, এই স্থানেই বেশ কিছুদিন এই বইমেলাটি হবে।

কিন্তু তার আগে যেটা লাখ টাকার প্রশ্ন তার উত্তর তো খুঁজতে হবে! বইমেলা করতেই বা হবে কেন, বিশেষত বাংলা বইমেলা? মানে যেখানে অধিকাংশ বঙ্গসন্তানের পরবর্তী প্রজন্ম বাংলা পড়তে শিখছে না, বাংলা স্কুলগুলিতে ভর্তি হচ্ছে না, যেখানে তাদের পূর্ব প্রজন্ম পড়াশুনো করেছেন। আসল সমস্যাটা একটু সুদূরপ্রসারী। যাঁরা কলকাতায় একসময় সরকারি স্কুলে পড়াশুনো করেছেন, তাঁরা কি নিজের সন্তানকে সরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন? সমস্যাটা সার্বিকভাবে শিক্ষার মানের সমস্যা, বা বলা ভালো শিক্ষা প্রদানের মান।
আমাদের সময়ও যে এই সমস্যা ছিল না, তা নয়। যে কোনও বিষয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না রেখে, মুখস্থ করে স্বচ্ছন্দে পাস করে একটি চাকরি বাগিয়ে দিন গুজরান হত। বর্তমানে আর সেটা হচ্ছে না, কারণ এখন পড়াশুনো অনেক বেশি উদ্দেশ্যমূলক হয়ে গিয়েছে, বাস্তবোচিত। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্টেটাস এবং ইত্যাদি ও প্রভৃতি। আপনিই বলুন, সরকারি স্কুলে কি সেই স্টেটাস আছে? শিক্ষার মান উন্নত করাটা একটা দীর্ঘকালীন পদ্ধতি। সেটা সদিচ্ছা থাকলে তবেই সম্ভব।

সুখের কথা এই যে, দিল্লির বর্তমান বাংলা স্কুলগুলির ম্যানেজমেন্টের অনেকেই স্কুলের মান বৃদ্ধি করার কথা ভাবছেন। ফলে বইমেলার জন্য তাঁদেরও উৎসাহ রয়েছে। এইখান থেকেই শুরু হচ্ছে গল্প।

বঙ্গভাষীদের পরবর্তী একটা গোটা প্রজন্ম বাংলাকে ধারণ না করে, এমন কী স্পর্শ না করেও স্বচ্ছন্দে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু যদি বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহ জাগানো হয়— সরাসরি আগ্রহ তো ওভাবে হয় না— সেখানে পূর্ববর্তী প্রজন্মের দায়িত্ব অনেক বেশি। বিশেষত, যাঁরা নিজেরা বাংলা ভাষায় শিক্ষালাভ করেছেন এবং বাংলা পড়তে, লিখতে পারেন। তাঁরা নিজেরা বই পড়লে তবেই তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে উদাহরণ রাখতে সক্ষম হবেন।

এই ব্যাপারটা বোধহয় স্থান, কাল, পাত্র নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রযোজ্য। আসলে একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জালের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তথ্য এবং মনোরঞ্জনের সামগ্রীর শেষ নেই। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা বা চিন্তা করার ক্ষমতা তাতে কতটা লাভবান হচ্ছে সেটা প্রশ্নার্হ।

এইখানেই বইয়ের গুরুত্ব। অর্থাৎ, ডিজিট্যালেই পঠনপাঠন সম্ভব, কিন্তু স্ক্রিনের নীল আলো মস্তিষ্কের কোষকে এমনভাবে উত্তেজিত করে যে, অধিক সম্পাত ক্ষতি করতে পারে। পরিবেশের কথা চিন্তা করেও যদি দেখি, তা হলে ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার তুলনায় কাগজের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা অনেক বেশি এবং পরিবেশের জন্য সুবিধাজনকও।

বইপড়ার অভ্যাস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নিরপেক্ষ ভাবনাচিন্তা বা মতপ্রকাশের অভ্যাসও বৃদ্ধি পায়। কোনও একটি জাতির গঠন বা ব্যক্তিগতভাবে কোনও মানুষের মনন ও চিন্তন গঠনের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র কিতাবী জ্ঞান তো নয়, বাস্তব জ্ঞান, ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং অতি অবশ্যই বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে বই।

আর এইখানেই প্রথম বিন্দুতে ফিরে যেতে হয়। দিল্লিতে বইমেলার আয়োজন করে, ঠিক কাদের কাছে বই বিক্রি করা হবে। বিশেষত বাংলা বই!

জনসংখ্যার হিসাবে যদি দেখা যায়, তা হলে বাংলাভাষা যে সমস্ত স্থানে সংখ্যালঘু, তার মধ্যে দিল্লি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বাংলার একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বিশেষত, যখন ১৯১১-য় ভারতের রাজধানী স্থানান্তরিত হল দিল্লিতে। তার আগে থেকেই অবশ্য কাশ্মীরি গেটের আশেপাশে এবং দিল্লির গোলমার্কেট অঞ্চলে সরকারি কর্মচারীরা বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। এদেরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে কাশ্মীরি গেটের পুজো, নিউদিল্লি কালীবাড়ি ইত্যাদি। স্বাধীনতা এসেছে, তারপর বাঙালি সরকারি অফিসারের সংখ্যা বেড়েছে। ছয়ের দশকের শেষাশেষি পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায় দিল্লিতে বাঙালি সরকারি অফিসারদের একটি সান্ধ্যআড্ডার জায়গা হিসাবে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন গঠন করালেন, হেইলি রোডস্থিত বঙ্গভবনের একটি গ্যারাজে। তারপর বঙ্গভবনের বেসমেন্ট হয়ে নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে ট্রাস্ট গঠন করে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের জায়গা হল গোলমার্কেটের কাছে বঙ্গ সংস্কৃতি ভবনে। দিল্লি শুধু নয়, আশেপাশের বিভিন্ন, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং যে আটটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসাবে তারাও অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এরপরেই আসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের কথা এবং বর্তমান মোবাইল যুগে তার পদ্ধতি। প্রথমেই মনে রাখতে হবে ভাষাটা সংখ্যালঘু, যে অসুবিধা পশ্চিমবঙ্গে বা ত্রিপুরায় যাঁরা বইমেলা করেন বা তার সাফল্য ব্যর্থতার হিসাব টাকার অঙ্কেই শুধুমাত্র করেন, তাঁদের মুখোমুখি হতে হয় না।

দিল্লির মতো জায়গায় একান্তে বা নিভৃতে একটা প্রান্তিক ভাষাকে বাঁচানো বেশ কঠিন। তাতে কিছু আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিমাত্র সংস্কৃতির পরশ পেতে পারে, তার অধিক নয়। সেক্ষেত্রে অন্য ভাষা বা সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে হবে বলে বর্তমান বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন মনে করে। তখন আশা করা যায় যে, অন্যরাও বাংলাকে আপন করে নেবে। যেটা গতবার থেকেই দেখা গিয়েছে।

দিল্লি বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন ভারত লোকোৎসবও আয়োজন করেছিল। যেখানে মৈথিলী, রাজস্থানী, অসমীয়া বা তামিল সংস্কৃতিও হাতে হাত ধরে ছিল। মৈথিলীরা তো নিজেদের একটি স্টলও নিয়ে এসেছিলেন এবং এবারেও ইচ্ছা পোষণ করেছেন একত্রে কাজ করার।

এবারে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলির সঙ্গে কাজ করার চেষ্টাও করেছে। রাশিয়ান ও ফ্রেঞ্চ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইতোমধ্যেই অংশ নিতে রাজি হয়েছে। ষাটটির উপরে বইয়ের স্টল ছাড়াও থাকছে সোনাঝুরির হাট, ঐতিহ্যবাহী গহনার প্রদর্শনী এবং বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের উপস্থিতি।

বাঙালি যে ব্যবসাবিমুখ নয়, তা বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের সদস্যরা সকলের সামনে পরিবেশন করছেন এবং দিল্লিতেও তাঁদের উপস্থিতি থাকছে। বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে স্কুল এবং কলেজ ছাত্রছাত্রীদের উপর।

অবশ্যই ছাত্রছাত্রীদের জন্য বইয়ের কুপন দেওয়া হবে, যাতে বই কেনার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। তার সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবেও বেশ কিছু অন্যধরনের কাজ করার কথা ভাবা হচ্ছে, যা গতানুগতিকতার বাইরে। সমগ্র দিল্লির সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে একটি সমবেত সঙ্গীতের অনুষ্ঠান, কলকাতা থেকে একটি স্ট্রিট ব্যান্ড, যাঁরা ফেলে দেওয়া সামগ্রী দিয়ে তাঁদের সাংগীতিক যন্ত্র তৈরি করেছেন। এছাড়াও থাকছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলির নাটকের ও সমবেত সঙ্গীতের দল।

সব মিলিয়ে বইমেলাটিকে সার্বিক মেলা বলা হলে, তা ভুল হবে না। বই তো শুধু বই নয়, সাহিত্য জীবনের প্রতিফলন। জীবন থেকে উঠে আসা গল্পগুলি যদি সাহিত্যের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে উদাহরণ হয়ে প্রতিফলিত না হয়, তা হলে এতো বই, এতো মেলার আয়োজন, সবই বৃথা হয়। বই বিক্রি বা হাতবদল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে জ্ঞানের আদানপ্রদান হয়, মতামতের হয় লেনদেন। এই লেনদেনের মাধ্যমেই সাহিত্য বেঁচে থাকে। বৃত্তের বাইরের বাঙালির ক্ষেত্রে তাই সংখ্যা নয়, সুযোগটিও একটি বড় কথা। এটা শুধু দিল্লি নয়, বৃত্তের বাইরে থাকা সকল বাঙালির কথা, যা হয়তো ভরকেন্দ্রে পৌঁছয় না।

বাংলার বাইরের মূলত বাংলা বইমেলায় যে সমস্ত বাংলা প্রকাশকরা আসছেন, তাঁরা উৎসাহের সঙ্গে আসছেন ঠিক এই চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে। এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় কলকাতা ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কথা। যারা এই মহাযজ্ঞে কলকাতা থেকে প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, বই নিয়ে আসা ইত্যাদির কাজ করছে। উল্লেখ করতে হয় রাইসিনা বেঙ্গলি স্কুলের পরিচালন সমিতির কথা, যারা একবাক্যেই স্কুলের মাঠ দিয়ে দিয়েছে এমন একটি বিপুল কর্মযজ্ঞের জন্য।

ব্যবসা একটি অবশ্যই গুরুতপূর্ণ দিক, কিন্তু সেটাই সবকিছু নয়। যে সমস্ত প্রকাশক আসছেন, হালফিলের লেখক লেখিকা বা কবিদের বই থেকে ক্ল্যাসিক সাহিত্য, সব কিছুই নিয়ে আসছেন তাঁরা আগামী ১৯ থেকে ২২ মার্চ, ২০২৬ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত দিল্লি বইমেলায়।

ভরকেন্দ্র থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ কিলোমিটার দূরে, মূলত বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে ঘিরে আবার দিল্লি শহর জেগে উঠবে। আর মাত্র ক’টা দিন। দিল্লি এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বঙ্গভাষী মানুষদের সঙ্গে আমাদেরও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রান্তিক ভাষা শুধুমাত্র প্রান্তেই বিকশিত হয় না, তাকে ছড়িয়ে পড়তে হয়, অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান দিলেই পাওয়া যায় নিজের সম্মান। প্রসারের আর অন্য কোনও শর্টকাট পন্থা নেই। সংস্কৃতির হাতিয়ার বই, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে বঙ্গপ্রেমী সকলে যদি থাকেন, তাহলেই একমাত্র সার্বিক উন্নতি সম্ভব।

Advertisement