বঙ্গের মনসা দেবী এবং গ্রিক দেবী মেডুসা কি একই? এই দুই দেবীর সংগ্রামের বিষয়ে জানেন?

Image: AI নির্মিত

আজ বাঙালির ঘরে ঘরে পুজিত হচ্ছেন মা মনসা (Manasa Devi)। প্রতি বছর শ্রাবণ সংক্রান্তিতে পুজিত হন মা বিষহরি (Manasa Devi)। বর্ষায় গ্রাম বাংলায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। আর তার হাত থেকে রক্ষা পেতে এই সময় সাধারণ মানুষ সর্পদেবীর আরাধনায় মগ্ন হন। মনসার পুজো করলে সাপের কামড় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে গ্রামবাংলায় প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে । মাটির সরায় দুধ ও কলা দিয়ে দেবীকে আহ্বান জানানো হয়। সারাদিন উপোস করে পুজো শেষে সাবু-দুধ-কলা দিয়ে মনসার পুজো সম্পন্ন করে তবেই উপবাস ভাঙেন মহিলারা। সমাজে কীভাবে মনসার পুজোর চল হল, তার পিছনে রয়েছে পুরাণের এক অনবদ্য কাহিনি।

পুরাণ অনুসারে মনসা হলেন শিবের মানসকন্যা ও জরৎকারুর পত্নী। জরৎকারু মনসাকে (Manasa Devi) প্রত্যাখ্য়ান করেছিলেন। মাতা পার্বতী তাঁকে ঘৃণা করলেও পরবর্তীকালে দেবী চণ্ডী মনসাকে নিজের মেয়েরূপে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবে কোনও কোনও প্রাচীণ গ্রন্থ অনুসারে শিব নয়, ঋষি কাশ্যপ হলে মনসার পিতা। মনসা এমনিতে ভক্তবৎসল হলেও তাঁর পুজো করতে অস্বীকার করলে তিনি বড়ই নির্দয় হয়ে ওঠেন।

আর তার এই নির্দয় হয়ে ওঠা এবং সমাজে স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে রয়েছে এক লোককথা। বণিক চাঁদ সদাগরের সঙ্গে মনসার সংগ্রামের কথা জানে না এই বঙ্গে এমন মানুষ বিরল। কেউ কেউ মনে করেন সমাজে বিশেষ করে উচ্চসমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। বারে বারে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তারপরেও তিনি দমে যাননি। চাঁদ সদাগরের হাতে অপমাণিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে বাধ্য করেছেন পুজো দিতে।
পুজো দিতে চাঁদ সদাগর অস্বীকার করলে একে একে তার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বাণিজ্য, এমনকি ছেলে লক্ষ্মীন্দরকে। কেউ কেউ মনে করেন তার এই নির্দয়তার পিছনে রয়েছে সমাজে তাঁর প্রতি অবহেলা এবং অপমান।


আরও পড়ুন: জ্ঞানেশ কুমারের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ এসআইআর এবার আমেরিকায়? ট্রাম্পের মন্তব্যে জল্পনা

সর্পদেবী হিসেবে মনসা (Manasa Devi) বাঙালি হিন্দুর উচ্চ অভিজাত সমাজে প্রথমে পূজা পাননি। ‘যোষিতামিষ্ট’ দেবতার মতো তিনি প্রথমে নারীদের পূজা পেয়েছেন, পরে অভিজাত পুরুষসামজে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন। উপাস্যা দেবী হিসেবে মনসার এই স্বীকৃতির ইতিহাস ধরা রয়েছে মনসামঙ্গলে। নিম্নবিত্ত রাখাল তথা গোপসমাজে এবং সমাজের প্রায় অন্ত্যেবাসী জেলে-মালোদের দ্বারা বন্দিত হতেন মনসা। অনেক পর উচ্চতর সামজে মনসার অনুপ্রবেশ ঘটে। বণিকরাই ছিল তৎকালীন সমাজের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই মনসা শিব ভক্ত চাঁদ সদাগরের হাতে পুজো পেতে চান।

এই পুজো পাওয়ার জন্য তাঁকে অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। করতে হয়েছিল ষড়যন্ত্রও। দেবী হিসেবে তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী হয়েও আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে চেয়েছেন। প্রথমদিকে চাঁদ সদাগরের কাছে অনুনয় করেছেন, পরে বিরোধের সূত্রে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলতে থেকেছেন। চাঁদ সদাগরের সর্বনাশ করেছেন। মনসার এই রূপ দেখে তাঁকে নির্মম হৃদয় বিদারক, কূটিল চরিত্র মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি ছিলেন উচ্চ সমাজের দ্বারা অত্যাচারিত নিচু সমাজের প্রতিভু।

তাঁর এই চরিত্রের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় গ্রিক দেবী মেডুসার। তাঁকে সাধারণত ডানাবিশিষ্ট সুন্দরী এক নারী সত্তা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যাঁর মাথার চুল সাপ দ্বারা গঠিত। আসলে তিনি দেবী নন দানবীয়। গ্রিক পুরাণে তাঁর ভূমিকা প্রধানত ধ্বংসাত্মক, আধুনিক পণ্ডিতরা মেডুসাকে এক বিয়োগান্তক ও নারীবাদী চরিত্র হিসেবে গণ্য করেন।

আরও পড়ুন: তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরও এক, গ্রেপ্তার হোটেল মালিকের বাবা, তল্লাশি চালছে পুকুরে

মেডুসা (Medusa) ছিল আদিম সমুদ্র দেবতা ফোরকিস এবং কেটোর ঔরসে জন্ম নেওয়া দানবীয় সন্তানের মধ্যে একজন (Medusa)। তার ভাইবোনদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। মেডুসা (Medusa) জন্মগতভাবে কুৎসিত ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন এবং তাঁর (Medusa) চুলের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হতেন। তার এই সৌন্দর্যই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুগ্ধ পোসাইডন তার পিছু নেয় এবং তার আশ্রয় স্থল অ্যাথেনার মন্দিরে তাঁকে (Medusa) ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়।

অ্যাথেনা মন্দিরে মেডুসা পুরোহিত হিসেবে কাজ করতেন( কিছু মতানুসারে, পোসাইডেন মেডুসাকে ধর্ষণ করেনি। বরঞ্চ তা ছিল সম্মতিসূচক।) দেবী অ্যাথেনা ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন মেডুসাকে। যার ফলে একদা সুন্দরী সেই নারীর মাথার চুল বদলে যায় সাপে এবং তাঁর মুখের দিকে তাকালেই সবাই পরিণত হত। মনসাকেও এই যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পার্বতীর সন্দেহের বশে বাঁ চোখ হারাতে হয়েছিল মনসাকে।

মেডুসা কোনও অপরাধ না করা সত্ত্বেও তাঁকে (Medusa) শাস্তি পেতে হয়েছিল। পোসাইডনের জন্য কোনও শাস্তিই বরাদ্দ করা হয়নি। মেডুসা তাঁর বোনেদের মধ্যে একমাত্র মরণশীল ছিলেন। অভিশপ্ত এবং নিঃসঙ্গ জীবন আরও যন্ত্রণাদয়াক হয়ে ওঠে তাঁর। শেষে দেখা যায় গ্রিক বীর পার্সিউস তাঁকে হত্যা করেন এবং তার কাটা মাথাটি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। মনসার মতোই তাঁকে আজীবন সংগ্রাম করে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছিল।

মনসা শেষ পর্যন্ত সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও মেডুসাকে (Medusa) কিন্তু মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। অন্যের পাপের শাস্তি আমৃ্ত্যু বহন করে যেতে হয়েছে তাঁকে। তাই আধুনিক যুগে মেডুসা কোনও ভয়ঙ্কর দানবী নন বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যায় ও বিচারহীনতার শিকার এক চিরন্তন ট্র্যাজেডির প্রতীক। মনসা ট্র্যাজিড চরিত্র হতে হতেও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে লড়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। আর এখানেই কী করে যেন দুই চরিত্র মিলেমিশে একাকার গিয়েছে।

দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/MWCRI_LCbqY?si=erIglHmKIFSJAQ0Q” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>