আশ্বিনের রাত। পল্লিগ্রামে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। হঠাৎ গুলির আওয়াজে ভেঙে গেল সেই নিস্তব্ধতা। তারপর চারদিক থেকে ভেসে এল ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও ঘণ্টার আওয়াজ। মুহূর্তে জেগে উঠলে গোটা গ্রাম। শুরু হল অষ্টমীর সন্ধিপুজো (Durga Puja)।
গ্রামবাংলার অধিকাংশ মানুষের বাড়িতে ঘড়ি ছিল না। তাই সন্ধিপুজোর নির্দিষ্ট সময় জানান দিতে বন্দুক বা তোপ দাগা হত। জমিদার বা রাজা না হয়েও বঙ্কিচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) পরিবারের দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আয়োজন এতটাই জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। যা সেই সময় কলকাতার বড় বড় রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়ির পুজোকে অনায়াসে টেক্কা দিতে পারত।
কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে শারদোৎসব
দুর্গাপুজো (Durga Puja) উপলক্ষে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) বাড়ি সেজে উঠত। আলোয় মুড়ে ফেলা হত গোটা বাড়ি। পুজোমণ্ডপ, জানালা, কার্নিশ থেকে শুরু করে গোটা বাড়িতে জ্বলত মাটির প্রদীপ। শরতের হিমেল হাওয়ায় কোনও প্রদীপ নিভে গেলে তা আবার জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য ছোটদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো।
গাছপালায় ঘেরা সাদা রঙের দোতলা বাড়ি পুজোর এই ক’টা দিন সকলের নজর কাড়ত। পুজোর (Durga Puja) দালানও প্রদীপের আলোয় ভরে উঠথ। সব মিলিয়ে চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattapadhyay) পরিবারের দুর্গাপুজো (Durga Puja) ছিল একদিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অন্যদিকে গ্রামের মিলনোৎসব।
বঙ্কিমচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) বাবা ছিলেন সরকারি আমলা। নাম যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আর্থিক সচ্ছলতা ছিল। জমিদার না হলেও তাঁদের জীবনযাত্রায় জমিদারি আভিজাত্য ছিল অটুট। কাঁঠালপাড়া প্রাচীন বাসিন্দা ছিল এই চট্টোপাধ্যায় পরিবার। ১৮৫২ সালে যাদবচন্দ্র কাঁঠালপাড়ার বাড়িটি দোতলা প্রাসাদের আদলে তৈরি করেন। বাড়ির উত্তরদিকে তৈরি হয় ঠাকুরদালান। সেখানেই অনুষ্ঠিত হত দুর্গাপুজোর নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। যাদবচন্দ্রের একটি দানপত্র থেকে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ছিল তাঁর তৃতীয় ছেলে বঙ্কিমচন্দ্রের উপর।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: দুর্গার বাহন সিংহ, তার পিঠেই থাকেন মা
চট্টোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর বিপুল আয়োজন
১৮৮৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, সে বছর পুজোয় মোট খরচ হয়েছিল ৪০৯ টাকা ৬ আনা ও আধ পয়সা। প্রতিমার জন্য ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫১ টাকা, পুজোর জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৬২ টাকা এবং নৈবেদ্যের জন্য ২১ টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছিল ভোগপ্রসাদের জন্য। প্রায় ১৭৬ টাকা।
পুজোর সময় চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattapadhyay) বাড়ি ছিল অবারিত দ্বার। গ্রামের সকলে দু’বেলা পাত পেড়ে এখানে খেতেন। দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিন যেন কাঁঠালপাড়ায় উৎসবের মেলা বসত। আত্মীয়স্বজন, গ্রামবাসী, পণ্ডিত থেকে শিল্পী বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সমাগমে বাড়ি গমগম করত।
কমলাকান্তের দপ্তরে বঙ্কিমের দুর্গোৎসব
সেই কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) সাহিত্যে দুর্গোৎসব (Durga Puja) বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল। ১৮৭৪ সালে বাবার আমলে বাড়ির পুজো দেখে তিনি ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ আমার ‘দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধ লেখেন।তাঁর লেখা দেবী দুর্গার সঙ্গে বাংলার মাতৃভূমির সম্পর্ক তৈরি হতে দেখা যায়। দুর্গাজননীর ভাবনা থেকে বঙ্গজননীর ধারণা তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এই রচনায় খুঁজে পাওয়া যায়।
উৎসবের সামাজিক পরিসর
ইংরেজ শাসকরা কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন বনেদি পরিবারের পুজো নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখাতেন। তৎকালীন ইংরেজি সংবাদপত্রে কোন বাড়ির পুজো কত জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে, কী ধরনের আয়োজন করা হয়েছে এইসব নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হতো। ১৮৮৭ সালের একটি চিঠিতে পুজোর খরচের হিসাব পাওয়া যায়। সেই সময় দুর্গাপুজোয় মোট ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। বঙ্কিমচন্দ্র আড়াইশো টাকা এবং তাঁর ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র প্রায় দেড়শো টাকা দিতেন।
বঙ্কিমচন্দ্র (Bankim Chandra Chattapadhyay) সেই সময় মেদিনীপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৮৭০ সালে তাঁর মাসিক বেতন ছিল ৭০০ টাকা। সেই সময় এক টাকায় মিলত ২৪ সের চাল। ফলে তাঁর আয় ও পুজোর ব্যয়ের পরিমাণটি কী পরিমাণ ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ‘সখীবেশ’-এ পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, জানেন কোন সেই পুজো?
সন্ধিপুজোয় বঙ্কিমচন্দ্র
বঙ্কিমচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিকথা থেকে তাঁদের পারিবারিক দুর্গাপুজোর একটি চিত্র পাওয়া যায়। পুজোর (Durga Puja) দালান থেকে উঠোনের সিঁড়ি পর্যন্ত জ্বলত সারি সারি প্রদীপ। ঢাক-ঢোলের শব্দে শুরু হত সন্ধিপুজো (Durga Puja)। বাদ্যযন্ত্র থেমে গেলে ভেসে উঠত পুরোহিত ও তন্ত্রধারীর মন্ত্রোচ্চারণ।
দালানের মাঝখানে সিংহের পিঠে আসীন ছিলেন মৃন্ময়ী দেবী। সামনে স্তূপ হয়ে থাকত বেলপাতা ও নানা ধরনের ফুল। পদ্মফুলের সংখ্যাই বেশি। পাশে বসে থাকতেন পুরোহিত। বাড়ির কর্তা যাদবচন্দ্রও একপাশে চাদর জড়িয়ে বসতেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattapadhyay)।
১৮৯৪ সালে মারা যান বঙ্কিমচন্দ্রর চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মৃ্ত্যুর পরও কিছুদিন চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattapadhyay) পরিবারের দুর্গাপুজো (Durga Puja) চলতে থাকে। তবে ১৯২৪ সালে একটি অঘটন ঘটে। আরতির সময় প্রতিমার চুলে আগুন ধরে যায়। সেই বছর পুজোয় বিঘ্ন ঘটায় পরের বছর থেক ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোটি বন্ধ হয়ে যায়।
পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বিশাল দুর্গামণ্ডপটি (Durga Puja) অবহেলায় জীর্ণ হতে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়তে থাকে। ১৯৬২ সালে বঙ্কিচন্দ্রের (Bankim Chandra Chattapadhyay) বাড়ি সরকারের অধীনে চলে যায়। তবে পুজোমণ্ডপটির পুরনো জৌলুস আর ফিরে আসেনি।
অবশেষে ১৯৯৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্রে (Bankim Chandra Chattapadhyay) বসতবাড়িতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীনে বঙ্কিম (Bankim Chandra Chattapadhyay) ভবন গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় পুরনো দুর্গামণ্ডপের আদল অনুসরণ করে ভাঙা অংশটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। নতুন এই সভাগৃহের নাম রাখা হয় ‘সঞ্জীবচন্দ্র সভাগৃহ’। আজ কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দাঁড়ালে অতীতের সেই জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজোর দিনগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য যেমন বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে তেমনই তাঁর জন্মভিটের দুর্গাপুজোও বাংলার বনেদি পরিবারের পুজোর ইতিহাসে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/QpMtnNwskj4?si=b2S-614NWCpjPxVz” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>