• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 4 September, 2026

সিকিমে ৪০ হিমবাহী হ্রদে যে কোনও মুহূর্তে বিপর্যয়: সরকারি সমীক্ষা বলছে, ১৬টি আদতে জলবোমা

সিকিমের নতুন সমীক্ষায় ৪০টি হিমবাহী হ্রদ উচ্চ বিপত্তির তালিকায়, ১৬টি সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে। GLOF আশঙ্কায় ফের প্রমাদ গুনছে তিস্তাপারের বাংলা।

সিকিমে ৪০ হিমবাহী হ্রদে যে কোনও মুহূর্তে বিপর্যয়: সরকারি সমীক্ষা বলছে, ১৬টি আদতে জলবোমা

Survey of the Khangchung Tsho Lake at 18000 ft (Pic- FB/@Sikkimorganic)

নেপালে গত মাসের ভয়াবহ হড়পা বানের রেশ কাটতে না কাটতেই হিমালয়ের বুকে ফের সতর্কবার্তা। সিকিম সরকারের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, রাজ্যের অন্তত চল্লিশটি হিমবাহী হ্রদ (glacial lake) রয়েছে অত্যন্ত বিপজ্জনক তালিকায়। তার মধ্যে ১৬টি হ্রদ রয়েছে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে। এগুলি কোনও মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। ভেঙে যেতে পারে বাঁধ, ভেসে যেতে পারে সিকিম ও লাগোয়া উত্তরবঙ্গের বড় অংশ। নেপালে মৃত্যুমিছিলের জেরে সংবাদ শিরোনামে থাকা হিমবাহী হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ (Glacial Lake Outburst Flood, GLOF) এবার ভিলেন হতে পারে সিকিমেও। রিপোর্ট বলছে, বাস্তবে একটি টাইমবোমার উপর বসে আছে সিকিম ও সংলগ্ন এলাকা। যে কোনও সময় জলবোমা বিস্ফোরণে ধুয়েমুছে যেতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা।

কী বলছে নয়া সমীক্ষা

গ্যাংটকে জলবায়ুজনিত বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে আয়োজিত এক কর্মশালায় সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সন্দীপ তামব্যাং জানিয়েছেন, উপগ্রহ চিত্র ও রিমোট সেন্সিং (remote sensing) প্রযুক্তির সাহায্যে হিমবাহী হ্রদগুলির আকার ও বিস্তার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেখানেই বিপজ্জনিক হেসাবে চিহ্নিত কার হয়েছে চল্লিশটি হ্রদকে। যার মধ্যে ষোলোটি রয়েছে ক্যাটেগরি এ শ্রেণিতে অর্থাৎ চূড়়ান্ত লাল সতর্কতার স্টেজে। দু’টি হ্রদ রয়েছে ক্যাটেগরি বি-তে, ন’টি ক্যাটেগরি সি-তে। বাকি তেরোটি হ্রদের শ্রেণিবিন্যাস এখনও বাকি। বিদ্যুৎ প্রতিরোধ টোমোগ্রাফি (Electrical Resistivity Tomography, ERT), জল নিঃসরণ পরিমাপ ও ডিজিপিএস (DGPS) ভিত্তিক সমীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে ফিল্ড সার্ভেও শুরু হয়ে গিয়েছে। যাতে বিপর্যয় ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়।

ফের আলোচনায় GLOF

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসে পড়ার জেরে হড়পা বানে শয়ে শয়ে প্রাণহানি হয়েছে। যদিও সেই বিপর্যয় সরাসরি GLOF ছিল না, তবু ঘটনাটি গোটা হিমালয় জুড়ে একটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছে। উষ্ণায়নের জেরে হিমবাহ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে দ্রুত গতিতে, আর সেই জায়গায় জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন হ্রদ। পুরনো হ্রদগুলিও ফুলেফেঁপে উঠছে। ২০২৩ সালের ৩ ও ৪ অক্টোবরের রাতে উত্তর সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদ (South Lhonak Lake) ফেটে যে বিধ্বংসী বান নেমে এসেছিল, তাতে অন্তত ৬০ জনের প্রাণ যায়, ভেসে যায় তিস্তা তৃতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ। মঙ্গন, গ্যাংটক, পাকিয়ং, নামচি জেলার পাশাপাশি সেই ধ্বংসলীলার আঁচ পড়েছিল উত্তরবঙ্গের কালিম্পং, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারেও।

তিস্তার সঙ্গে সম্পর্ক

সাউথ লোনাক-সহ সিকিমের অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদই অবস্থিত তিস্তা নদীর অববাহিকায়। অর্থাৎ উৎসস্থলে কোনও হ্রদ ফাটলে তার জলের ঢল নামে সরাসরি উত্তরবঙ্গের বুক চিরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হিমবাহী হ্রদই নয়, উচ্চ হিমালয়ের হিমশীতল ভূমি বা পারমাফ্রস্ট (permafrost) গলেও তৈরি হতে পারে নতুন বিপদ। জলবায়ুবিদ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ দীপায়ন দে-র মতে, এরকম সমীক্ষার পরিধি শুধু সিকিমের হিমবাহী হ্রদে আটকে রাখলে চলবে না, ভুটানের এক হাজারের বেশি পারমাফ্রস্ট হ্রদও নজরে রাখা জরুরি, কারণ সেগুলি গলে গেলে  ভয়াবহ বিপদে পড়তে পারে উত্তরবঙ্গ ও আসাম। উষ্ণায়নের প্রভাবে তিস্তা অববাহিকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও ক্রমশ বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে।

সতর্কতার ব্যবস্থা

২০২৩ সালের বিপর্যয়ের সময়ে সাউথ লোনাক হ্রদে প্রাক-সতর্কতা ব্যবস্থা (early warning system) বসানোর কাজ চলছিল, কিন্তু সেই সিস্টেম বসানোর কাজ শেষ হওয়ার আগেই হ্রদ ফেটে যায়। তারপরই সুইস বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ বা এনডিএমএ (NDMA) দেশের প্রথম GLOF প্রাক-সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছে। সিকিম প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই ছয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক হ্রদের চারপাশে সতর্কতা ব্যবস্থা বসানোর কাজ চলছে বলে জানা গিয়েছে। চলতি বছরই চল্লিশটি হ্রদে এই কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছে। চার রাজ্যের জন্য জাতীয় GLOF ঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচিতে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

উত্তরবঙ্গের জন্য

কালিম্পং জেলার রংপো বনাঞ্চলের বাসিন্দা ফুলমায়া বিশ্বকর্মার মতো বহু মানুষ আজও সেই রাতের স্মৃতি বয়ে বেড়ান, যেদিন তিস্তার জলে ভেসে গিয়েছিল তাঁদের ঘর ও দোকান। প্রায় তিন বছর পরেও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের মত স্পষ্ট, উজানে সিকিমের হ্রদ পর্যবেক্ষণ যতই জোরদার হোক না কেন, তার সুফল তখনই মিলবে যখন সেই তথ্য সরাসরি পৌঁছবে তিস্তাপারের প্রতিটি জনপদে। রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর ও কেন্দ্রীয় সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছনোর পরিকাঠামো তৈরি না হলে, উত্তরবঙ্গের ঝুঁকি কমার সম্ভাবনা কম।