ভোট পরবর্তী অশান্তি রুখতে এবং ঘরছাড়াদের নিরাপদে বাড়ি ফেরাতে কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত এক মামলার শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয় প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত স্পষ্ট জানায়, যাঁদের বাড়ি বা দোকানে হামলা, ভাঙচুর হয়েছে কিংবা যাঁরা অশান্তির জেরে ঘরছাড়া হয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত বাড়ি ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হবে পুলিশকেই।
তৃণমূল কংগ্রেসের দায়ের করা এই মামলায় আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে পুলিশকে। একইসঙ্গে ওই সময়ের মধ্যেই রাজ্য সরকারকে হলফনামা দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে।
Advertisement
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যে অশান্তির অভিযোগ উঠছিল, এই মামলার মাধ্যমে তাকেই আইনি মান্যতা দিয়ে প্রশাসনের উপর চাপ বাড়াতে চাইছে বিরোধী শিবির এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব, আর সেই কর্তব্য পালনে পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
Advertisement
গত ২ মে তৃণমূলের তরফে আইনজীবী শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানিতে আইনজীবীর পোশাকে হাজির হয়ে সওয়াল করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালো গাউন পরে আদালতে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও আইন মহলে চর্চা শুরু হয়।
আদালতে মমতা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলা, দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। বিধানসভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতেই তিনি ব্যস্ত এবং এই ধরনের রাজনৈতিক বা আইনি লড়াই নিয়ে ভাবার সময় তাঁর নেই। তাঁর কথায়, ‘আমার অনেক কাজ রয়েছে। এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।‘
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার কিছু আগে হাইকোর্ট চত্বরে পৌঁছন তিন বাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালো শামলা পরে তিনি প্রধান বিচারপতির এজলাসে উপস্থিত হয়ে মামলার বিষয়ে সওয়াল করেন। শুনানি শেষে তিনি এজলাস থেকে বেরিয়ে আসেন।
এরপরই হাইকোর্ট চত্বরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। লবিতে উপস্থিত আইনজীবীদের একাংশ তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের পক্ষ থেকে ‘চোর’ স্লোগান দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে কটূক্তিও করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। আচমকা এই বিক্ষোভে হাইকোর্ট চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই চত্বর ছাড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বেরোনোর সময় তিনি আইনজীবীদের একাংশের দিকে ইঙ্গিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘ওরা আমাকে মেরেছে।‘ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পুলিশ এবং নিরাপত্তারক্ষীরা ঘিরে মমতাকে বার করে নিয়ে যান। যা নিয়ে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘হাইকোর্টে আমাদের নিরাপত্তার হাল যদি এই হয়, তবে সারা রাজ্যে কী হচ্ছে।’
তৃণমূলের তরফে এই ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘যাঁরা এতদিন গণতন্ত্রের বুলি আওড়াতেন, তাঁরা আজ কী বলবেন? রাজ্যের তিন বারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী আদালতের দরজায় গিয়েছেন। সেখানে যদি এই ঘটনা ঘটে, তা হলে বিজেপি রাজ্যে কী ধরনের গণতন্ত্রের চাষ করতে চাইছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।‘
মমতাকে ঘিরে ওঠা ‘চোর-চোর’ স্লোগান এবং কটূক্তির ঘটনায় বিজেপির কোনও ভূমিকা নেই বলে দাবি করেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। বৃহস্পতিবার এই প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ বিজেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ নয়।
শমীকের বক্তব্য, ‘এটা বিজেপির সংস্কৃতি নয়। উনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। একজন মহিলা। তাঁকে দেখলে মানুষ রাস্তায় ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেবে, এই কাজ বিজেপি করে না। এই পরিস্থিতিও বিজেপি তৈরি করেনি। এই পরিস্থিতির জন্য যদি কেউ দায়ী হয়ে থাকে, সেটা তৃণমূলই।’ রাজ্য বিজেপির সভাপতির কটাক্ষ, ‘কৃতকর্মের ফল তো পিছু ছাড়ে না। তবে এ ধরনের ঘটনা যাতে না হয়… আমরা সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজ চাই। যে কাজ তৃণমূল করেছে, তারই প্রতিক্রিয়া এগুলো।’
রাজ্য বিজেপি সভাপতির দাবি, হাইকোর্ট চত্বরে যাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে— উভয় পক্ষই তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কথায়, এই ঘটনায় বিজেপির কোনও ভূমিকা নেই। তিনি বিষয়টিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলেও ইঙ্গিত করেন।
শমীক আরও বলেন, ‘এটা ‘হ্যাভস’ এবং ‘হ্যাভ নটস’-দের লড়াই। তৃণমূলের আমলে যাঁরা সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বঞ্চিতরাই এখন সরব হচ্ছেন।’ যদিও একই সঙ্গে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গকে এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চায় বিজেপি।
Advertisement



