• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 1 October, 2026

বাংলায় রক্তপাতহীন ভোট করিয়ে ‘অনন্য’ জ্ঞানেশ কুমার,  ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার দাবি তুলল কাকলি-সুদীপদের NCPI

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রক্তপাতহীন ও অবাধ ভোট করানোর স্বীকৃতি হিসেবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার আর্জি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি দিল NCPI

বাংলায় রক্তপাতহীন ভোট করিয়ে ‘অনন্য’ জ্ঞানেশ কুমার,  ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার দাবি তুলল কাকলি-সুদীপদের NCPI

T N Seshan and Gyanesh Kumar (Generative AI)

২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধনসভা নির্বাচনে হিংসার পরিচিত চিত্রনাট্য বদলে দিয়ে নজিরবিহীন শান্তিতে ভোট সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। আর সেই ভূমিকার ‘স্বীকৃতি’ হিসেবেই এবার ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner, CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’ (Bharat Ratna) দেওয়ার সুপারিশ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Nationalist Citizens Party of India, NCPI)। উল্লেখ্য, ২০ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ এখন এই দলেরই সদস্য।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিরোধীরা যখন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতার প্রশ্নে সরব, তখন কাকলি-সুদীপদের দল ঠিক উল্টো পথে হাঁটায় ফের রাজনীতির ময়দানে হইচই শুরু হয়েছে।

চিঠিতে ঠিক কী যুক্তি?

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে এনসিপিআই সভাপতি জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে দীর্ঘ দিন ধরে ভোট পরবর্তী হিংসা (Post-Poll Violence), ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন ও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। অথচ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন ও অবাধ ভোট (Bloodless and Peaceful Polling) পরিচালনা করে প্রশাসনিক দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জ্ঞানেশ কুমার।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভোট ঘোষণার আগে থেকেই রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision, SIR) চালিয়ে বিপুল সংখ্যক ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া এবং স্বচ্ছ তালিকা তৈরির ফলেই সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বুথমুখী হতে পেরেছেন। যার হাত ধরে রাজ্যে তৈরি হয়েছে সর্বকালীন রেকর্ড ভোটদানের (Record Voter Turnout) ইতিহাস। এনসিপিআই-এর দাবি, ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি আমজনতার আস্থা ফিরিয়ে আনার এই কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে জ্ঞানেশ কুমারের নাম ‘ভারত রত্ন’ সম্মাননার জন্য সুপারিশ করুক কেন্দ্রীয় সরকার।

টাইমিংয়ের সমাপতন

এনসিপিআই যখন নির্বাচন কমিশনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন জাতীয় রাজনীতিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুর ক্রমশ চড়াচ্ছে বিরোধী শিবির।শুক্রবারই মুম্বইয়ে সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে জেল ভরো আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়া জোটও অক্টোবর মাস জুড়ে একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে বৈধ নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে ইন্ডিয়া জোট (INDIA Bloc) নির্বাচন সদন অভিযান এবং দেশজুড়ে ‘সেভ ডেমোক্রেসি মার্চ’-এর ডাক দিয়েছে। বাম দলগুলি ইতিমধ্যেই দিল্লির নির্বাচন সদনের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়ে জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবি তুলেছে। অন্য দিকে তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে (DMK) সংসদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব এলে তাতে সমর্থনের বার্তাও দিয়ে রেখেছে। ফলে এই চিঠির সময় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতূহল।

অবশ্য জ্ঞানেশকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবনা এটাই প্রথম নয়। সম্প্রতি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জ্ঞানেশকে তাঁর কাজের জন্য নিদেনপক্ষে পদ্মভূষণ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। এই রাজনৈতিক আবহেই সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা কড়া ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেছিলেন, বিজেপিকে বাংলা পাইয়ে দেওয়ার জন্য পদ্মভূষণে না আটকে জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি ‘ভারত রত্ন’ দেওয়া হোক। সেই শ্লেষের রেশ কাটতে না কাটতেই এনসিপিআই-এর এই চিঠির আবির্ভাব পুরো বিতর্ককে কার্যত জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে টেনে এনেছে।

এই সম্মান সম্ভব?

একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক পদে কার্যরত অবস্থায় কোনও আমলাকে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনজ্ঞ মহলে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 324) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। অতীতে নির্বাচন পরিচালনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে টি এন শেষন আন্তর্জাতিক স্তরে ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ সম্মান পেলেও সক্রিয় কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কার্যকালে ‘ভারত রত্ন’ দেওয়ার কোনও নজির স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে নেই।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি এই সম্মান ঘোষণা করেন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের মেয়াদে নির্বাচন সদনের শীর্ষকর্তা এই সম্মান গ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) তৈরি হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও ভুল বার্তা দেবে।

কমিশনের কড়া দাওয়াই ও পরবর্তী সমীকরণ

২০২৬-এর বঙ্গভোটে অশান্তি রুখতে স্পর্শকাতর বুথগুলিতে একশো শতাংশ ওয়েবকাস্টিং (Webcasting) এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর (Central Armed Police Forces, CAPF) লাগাতার নজরদারির মতো একাধিক কঠোর কৌশল নিয়েছিল কমিশন। ডিজিটাল অ্যাপ ‘সি-ভিজিল’ (cVIGIL)-এর মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এনসিপিআই নেতৃত্ব এই প্রশাসনিক সাফল্যকেই ‘ভারত রত্ন’ পাওয়ার মূল মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরছে। কেন্দ্র এই চিঠির প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেবে তা স্পষ্ট নয়, তবে ২০২৬-এর বঙ্গভোটের রেশ টেনে জ্ঞানেশ কুমারকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার আর্জি নির্বাচন কমিশনকে ফের শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক যুদ্ধের একেবারে সম্মুখসমরে দাঁড় করিয়ে দিল। পক্ষান্তরে এটি কৌশলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো তাঁর দলের বিদ্রোহী সাংসদদের বার্তা হিসেবেও দেখছে রাজনৈতিক মহল।