শুভেন্দুর গড় হিসেবে পরিচিত নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচার সারলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পূর্ব মেদিনীপুরের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে কর্মীসভা থেকে তিনি বিজেপি তথা বিরোধী শিবিরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি করছে বিজেপি। রাস্তা বা উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। গেরুয়া শিবিরকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধর্ম হিংসা বা মাছ নিষিদ্ধ করতে শেখায়নি। বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করছে। রাস্তা করে দেওয়ার কথা বিজেপি বিধায়ককে বলা হলে, মহিলাদের বলা হচ্ছে আগে বাড়িতে গেরুয়া পতাকা লাগান।‘
অভিষেক সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, নন্দীগ্রামের মানুষের জন্য কতটা কাজ হয়েছে, তার হিসেব সামনে আনা হোক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূল এমন প্রার্থী দিয়েছে যিনি এলাকায় থেকেই মানুষের পাশে থাকবেন। নন্দীগ্রামকে ‘মা-মাটি-মানুষের ঘাঁটি’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি কর্মীদের সংগঠন আরও মজবুত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, পূর্ব মেদিনীপুরের মধ্যে নন্দীগ্রামকেই হতে হবে ছাব্বিশের ভোটের ‘ফার্স্ট বয়’। সেই সঙ্গে বলেন, ‘পবিত্র করকে জেতান। প্রতি বছর নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় ক্যাম্প হবে।’
Advertisement
তিনি ‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করেন, যেখানে প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে শিবির এবং ব্লকভিত্তিক মডেল ক্যাম্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের সঙ্গে মিলিয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। তাঁর কথায়, নন্দীগ্রামের লড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এলাকার মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও জড়িত রয়েছে। অভিষেক কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘নন্দীগ্রামের মাটিকে অপবিত্র থেকে পবিত্র করার লড়াই আমাদের করতে হবে। প্রতিটি বুথে ও ব্লকে আমাদের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। কে কী করছেন, সব কিছু আমার নজরে থাকবে। কেউ বিভ্রান্তির পথে গেলে বা বিরোধী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।‘
Advertisement
অন্যদিকে, দাসপুর ও কেশিয়ারিতেও জনসভা করেন অভিষেক। দাসপুরে তিনি তৃণমূল প্রার্থী আসিস হুদাইতের সমর্থনে সভা করে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উল্লেখ করেন—সেতু নির্মাণ, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান, আইটিআই কলেজ, স্বর্ণ হাব ইত্যাদির কথা বলেন।কেশিয়ারির সভায় তিনি দাঁতান ও কেশিয়ারির প্রার্থীদের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের হিসাব তুলে ধরেন। রাস্তা নির্মাণ, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কৃষি বাজারসহ একাধিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়নই তৃণমূলের মূল ভিত্তি।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেও সরব হন অভিষেক। প্রতিশ্রুত চাকরি বা আর্থিক সহায়তা না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণকে হাতিয়ার করছে। এর বিপরীতে তৃণমূল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তিতে রাজনীতি করে। তিনি বলেন, ‘যারা ১২ বছর আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার — আপনারা কি এক টাকাও পেয়েছেন? যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতি বছর ২ কোটি চাকরি তৈরি করবে — আপনাদের মধ্যে কতজন কেন্দ্রীয় চাকরি পেয়েছেন? তারা শুধুই ধর্মের ঢাল নিয়ে লড়ছে।
আমাদের মা মাটি সরকারের রিপোর্ট কার্ড নিয়েই এসেছি। যদি বিজেপি প্রকৃত রাজনীতি করতে চায়, তবে ধর্ম নয়, কাজের ভিত্তিতে রাজনীতি করুন।‘ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আপনার তহবিল আটকে দিয়েছে, এবার সঠিক বোতাম চাপুন। যারা আপনাদের লাইনে দাঁড় করিয়েছে, তাদেরকে এবার লাইনে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে। এসআইআর, লকডাউন বা রান্নার গ্যাসের লাইনে দাঁড়ানো—সবই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের কৌশল। এবার তাদের শিক্ষা দিন।‘
অভিষেক বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি শিক্ষা, জীবিকা, আশ্রয় এবং উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে। ধর্ম বা জাতির ভিত্তিতে নয়। যারা কন্যাশ্রী বা রূপাশ্রী পেয়েছেন, তারা পেয়েছেন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্বিশেষে। যখন আমি জনপ্রতিনিধি, তখন আমার দায়িত্ব মানুষকে সাহায্য করা, ধর্ম বা জাত নির্বিশেষে।‘ তিনি ভোটারদের কাছে সরাসরি আহ্বান জানান, ‘মানিক ও রমজীবন মান্ডিকে বিজয়ী করুন। এই অঞ্চলের উন্নয়নের দায়িত্ব আমার উপর। যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তারা আপনাদের অধিকার কেড়ে নেবে। দাসতানে আমাদের ভোটের ব্যবধান ২০২১ থেকে ২০২৪-এ বেড়েছে, কেশিয়ারিতে সামান্য কমেছে। এবার দুই জায়গাতেই ব্যবধান বাড়াতে হবে।‘
Advertisement



