৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বাইরে বেরোলে মনে হচ্ছে ৪১। মঙ্গলবার রাত ৮টায় কলকাতার তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু আর্দ্রতা ৮৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় রিয়েল-ফিল তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৪১ ডিগ্রিতে। সন্ধের বাতাসেও কোনো স্বস্তি নেই। এই ভ্যাপসা গুমোটের মধ্যে শহরবাসীর একটাই প্রশ্ন, বর্ষা কবে আসবে?
উত্তর মিলছে মৌসম ভবন থেকে। আর সেই উত্তর অনেকটাই আশার। উত্তরবঙ্গ ভিজছে, দক্ষিণ অপেক্ষায় ৯ জুন দক্ষিণ-পশ্চিম মরসুমি বায়ু সরকারিভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। কালিম্পং, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিঙের কিছু অংশ এখন বর্ষার আওতায়। পাহাড় থেকে তরাই– উত্তরে বৃষ্টির ঝমঝম শুরু হয়ে গিয়েছে।
আর দক্ষিণবঙ্গ তথা কলকাতায় বর্ষার আগমন প্রত্যাশিত ১৩ থেকে ১৬ জুনের মধ্যে। এখন শহরের মানুষ উচ্চ আর্দ্রতা ও প্রাক-মরসুমি গুমোট আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অর্থাৎ, আর মাত্র তিন থেকে ছয় দিনের অপেক্ষা। কেরালাম থেকে কলকাতা– এক সপ্তাহের যাত্রা। এ বছর ৪ জুন কেরলে আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম মরসুমি বায়ু প্রবেশ করেছে। স্বাভাবিক তারিখ ১ জুনের তুলনায় তিন দিন দেরিতে। তবে কেরলে পৌঁছনোর পরে গতি বেশ দ্রুত। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলি সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলেছে, সমগ্র সিকিম অতিক্রম করেছে এবং উপ-হিমালয় পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে।
আইএমডি-র ৯ জুনের সরকারি বিজ্ঞপ্তি জানাচ্ছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মরসুমি বায়ু উত্তর-পূর্ব ভারতের অবশিষ্ট অংশ, সমগ্র সিকিম এবং উপ-হিমালয় পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশে আরও এগিয়ে গিয়েছে। তবে একটা শঙ্কার মেঘও আছে। বর্ষার আগমন স্বস্তির, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ছবিটা সম্পূর্ণ উজ্জ্বল নয়। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের বর্ষার মরসুমে সারা দেশে বৃষ্টি হতে পারে প্রায় ৮০০ মিলিমিটার, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি গড় প্রায় ৮৭০ মিলিমিটার। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষক, যাঁরা খরিফ মরসুমে বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল।
কারণটা হল এল নিনো। এল নিনো মরসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন হয় এবং আর্দ্র মরসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে গড়ের চেয়ে কম বৃষ্টি, খরার ঝুঁকি এবং শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি হতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলিতে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, এবং নভেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। আইএমডি এই মরসুমের বৃষ্টির পূর্বাভাস নামিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ৯০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বৃষ্টির ঘাটতির মরসুম হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ, যা স্বাভাবিক ঐতিহাসিক গড় ১৬ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। এই দুই মাসেই সাধারণত এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে, ঠিক যখন মাঠে ফসল দাঁড়িয়ে। কেন্দ্রীয় ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে সেই ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা। তবে বাংলার ছবিটা কিছুটা আলাদা। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বর্ষার গতিপথ কিছুটা ভিন্ন। এই অঞ্চলগুলি অনেক সময় এল নিনো বছরেও স্বাভাবিক বৃষ্টি পায়। তাই একেবারে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। এই মুহূর্তে শহরের আকাশে মেঘের আনাগোনা আছে, দক্ষিণ-পূর্ব থেকে বাতাস বইছে ২৭ কিলোমিটার গতিতে। জুনে কলকাতার আর্দ্রতা সাধারণত ৮৫ থেকে ৯৪ শতাংশের মধ্যে থাকে। মাসের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টির দিন ও বৃষ্টির পরিমাণ দুটোই বাড়তে থাকে। আরও কিছুদিন এই গুমোট সহ্য করতে হবে। তারপর ঝমঝম বৃষ্টি। সেই অপেক্ষার কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে।