পাতে নেই ডিম-মাছ, রান্নায় ইসকন: এবার হাইকোর্টে মিড-ডে মিল বিতর্ক

মিড ডে মিলে ডিম বিতর্ক (AI নির্মাণ)

কলকাতার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির মিড-ডে মিলের (Mid-Day Meal) মেনু থেকে ডিম ও মাছ বাদ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজ্য জুড়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল আগেই। এবার সেই বিতর্ক সরাসরি পৌঁছাল কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) দরজায়। মেনু বদল এবং রান্নার দায়িত্বে বদল আনার এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে দায়ের হয়েছে একটি জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation বা PIL)। গত বৃহস্পতিবারই মামলাটি প্রথমবার শুনানির জন্য ওঠে আদালতে।

শুনানির জন্য সময় চাইল রাজ্য

বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী (Tapabrata Chakraborty) এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে (Division Bench) মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত ছিল। তবে প্রথম দিনেই এই বিষয়ে বিশদে সওয়াল-জবাব শুরু করা যায়নি। রাজ্যের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল (Advocate General) আদালতের কাছে মামলার প্রস্তুতি ও নথিপত্র খতিয়ে দেখার জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নেন। তাঁর সেই আর্জি মঞ্জুর করে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। ফলে, আইনি লড়াইয়ের আসল পর্ব যে আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।


পুষ্টি বনাম কর্মসংস্থান: মামলাকারীর জোড়া তির

উচ্চ আদালতে দায়ের হওয়া এই জনস্বার্থ মামলায় মূলত দু’টি প্রধান বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে:

কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নবান্ন?

রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে (Budget) অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন, প্রাথমিক স্কুলের মিড-ডে মিলের জন্য বরাদ্দ ছাত্রপিছু ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ১০ টাকা করা হচ্ছে। কিন্তু এই বরাদ্দ বৃদ্ধির ইতিবাচক দিকের চেয়েও বেশি চর্চায় চলে আসে রান্নার দায়িত্ব বদলের সিদ্ধান্ত। কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation) এলাকায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প (Pilot Project) হিসেবে খাবার সরবরাহের ভার দেওয়া হয় ইসকনের (ISKCON) অন্নমিত্র ফাউন্ডেশনকে (Annamitra Foundation)।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) অবশ্য বিতর্কের জল মাপতে আগেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, পড়ুয়ারা ভালো এবং শুদ্ধ খাবার পাবে। কাউকে হরে কৃষ্ণ জপ করতে বলা হচ্ছে না। তবে ইসকনের নিজস্ব হেঁশেলের কড়া নিয়ম অনুযায়ী, রান্নায় ডিম, পেঁয়াজ বা রসুন ব্যবহার করা যায় না। ফলে মেনুতে ভাতের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে ডাল, সবজি, সয়াবিন, পনির এবং রাজমা।

আরও পড়ুন: Explained: ডিম বাদ গেলে কি শিশু অপুষ্টিতে ভুগবে? মিড ডে মিল বিতর্কে আসল সত্যিটা জানুন

আরও পড়ুন: Explained: কোনও রাজ্যে রোজ ডিম, কোথাও ডিম নিষিদ্ধ: মিড ডে মিলের মানচিত্রে বাংলায় এত বিতর্ক কেন?

বাঙালির পাতে রাজমা! তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

সরকারের এই নিরামিষ মেনু চালুর সিদ্ধান্তের পরই তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে বিরোধী শিবিরে। তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন (Derek O’Brien) কড়া ভাষায় কটাক্ষ করে বলেন, ভোটের আগে যারা মাছ হাতে বাঙালি সাজার চেষ্টা করছিল, তারা এখন ঘুরপথে বাংলার উপর নিরামিষ এজেন্ডা চাপিয়ে দিচ্ছে। কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও (Mahua Moitra) সুর চড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যে রাজমা চিনতে গেলে দিল্লির মুখাপেক্ষী হতে হয়, বাংলার সাধারণ দরিদ্র ঘরের শিশুরা সেই অচেনা খাবারের পুষ্টিগুণ আদৌ হজম করতে পারবে তো? একই সুরে আপত্তি তুলেছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) শিবিরও। তাঁদের মতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ রাজ্যের শিশুরা প্রাণিজ প্রোটিন খেয়েই বড় হয়েছে।

যদিও এই সমস্ত অভিযোগ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির (BJP) জোড়াসাঁকো এলাকার বিধায়ক বিজয় ওঝা। তাঁর পাল্টা দাবি, পুষ্টির একমাত্র উৎস কেবল ডিম বা মাছ নয়। এই সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও ধর্মীয় উদ্দেশ্য খোঁজা বৃথা।

পুষ্টিবিদ ও শিক্ষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

বিতর্কের এই আবহে বিশেষজ্ঞদের একাংশ কিন্তু মামলাকারীর পুষ্টি-সংক্রান্ত আশঙ্কাকেই মান্যতা দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, ডিমে যে ধরনের সম্পূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিডের বিন্যাস (Essential Amino Acids) থাকে, তা নিরামিষ উপাদান থেকে পাওয়া বেশ কঠিন।

অন্য দিকে, বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, যে দিনগুলোতে মিড-ডে মিলের পাতে ডিম দেওয়া হত, সে দিন ক্লাসে পড়ুয়াদের উপস্থিতি (Attendance) চোখে পড়ার মতো বেড়ে যেত। একই আশঙ্কায় সরব হয়েছে ‘মিড-ডে মিল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া’-ও। তাদের দাবিও আদালতের দরজায় পৌঁছনো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীদের রুটি-রুজির লড়াইয়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

ভিন রাজ্যের নজির ও আগামী সপ্তাহের অপেক্ষা

অতীত বলছে, মিড-ডে মিলে ইসকনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক এবং অসমেও স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মেলেনি বলে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল এই নিরামিষ মেনু। গণ-আন্দোলনের চাপে সেখানে ইসকনকে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়েছিল। সেই সমস্ত নজির মাথায় রেখেই আগামী মঙ্গলবারের শুনানির দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য। আদালত আগামী দিনে কী পর্যবেক্ষণ দেয়, তার উপরেই নির্ভর করছে বাংলার স্কুলগুলির মিড-ডে মিল নীতির ভবিষ্যৎ।