ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যখন আত্মসমালোচনা, দোষারোপ এবং পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, তখনই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্বস্তি। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সম্মান জানাতে জয়ী বিধায়কদের উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশ ঘিরে এখন সরগরম দলীয় অন্দরমহল। আর এই নির্দেশ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই।
বুধবার কালীঘাটে নিজের বাসভবনে জয়ী ৮০ জন প্রার্থীকে নিয়ে বৈঠক করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা। যদিও সেই বৈঠকে ১১ জন উপস্থিত ছিলেন না। এই বৈঠকই পরাজয়ের পর প্রথম বড় সমাবেশ, যেখানে দলীয় ভবিষ্যৎ রণকৌশল নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু সূত্রের খবর, বৈঠকের মাঝেই মমতা নির্দেশ দেন— অভিষেকের ‘লড়াইকে’ সম্মান জানাতে উপস্থিত সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে। নির্দেশ অমান্য করার প্রশ্ন ওঠেনি, ফলে প্রবীণ-নবীন নির্বিশেষে সকলেই দাঁড়ান।
Advertisement
তবে এখানেই তৈরি হয় অস্বস্তি। কারণ, যাঁদের দাঁড়াতে হয়েছে তাঁদের মধ্যে ছিলেন এমন একাধিক প্রবীণ নেতা, যাঁরা অভিষেকের রাজনৈতিক অভিষেকের বহু আগেই রাজনীতির ময়দানে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, সমর মুখোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং ফিরহাদ হাকিম। তৃণমূল সূত্রে জানা দিয়েছে, অনেকেই প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর লেগেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বসে থেকেও করতালির মাধ্যমে সম্মান জানানো যেত— এভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল না!
Advertisement
এই ঘটনার মধ্যেই মমতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিছেন, অভিষেকের সমালোচনা দল কোনওভাবেই বরদাস্ত করবে না। শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে রাখা হয়েছে ডেরেক ও’ব্রায়েন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শুভাশিস চক্রবর্তী ও অসীমা পাত্রের মতো নেতাদের। এমনকি ডেরেককে অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের দপ্তরে নিয়মিত বসে কাজ দেখার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে নির্বাচনী ফল নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মমতা। তাঁর দাবি, এই ফল প্রকৃত মানুষের রায় নয়, বরং কারচুপির ফল। গণনাকেন্দ্র দখল এবং ইভিএমে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন তিনি। আদালতে যাওয়ার কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিষেকও দাবি করেন, বাস্তবে তৃণমূল অনেক বেশি আসনে জিতেছে এবং এই খারাপ ফল ‘প্রভাবিত’।
সব মিলিয়ে, পরাজয়ের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তৃণমূল। কিন্তু সংগঠন যখন নতুন করে পথ খুঁজছে, তখন অভিষেককে ঘিরে এই বিতর্ক দলীয় ঐক্যে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ভবিষ্যতে দলের সংগঠনিক কাঠামোয় প্রভাব ফেলতে পারে।
Advertisement



