• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 18 June, 2026

বিরোধী দলনেতা থাকবেন কি ঋতব্রত? আজ চুড়ান্ত রায় ঘোষণা বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রশ্ন তোলেন,কীভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হলেন?

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশন। চলতি অধিবেশনে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা কি ঋতব্রতই থাকবেন?  অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুর দেওয়া স্বীকৃতিতে সিলমোহর পড়বে কি না তা আজই স্পস্ট হয়ে যাবে। তবে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করছেন এই মামলায় যারই পরাজয় হোক না কেন তারা অবশ্যই ডিভিশন বেঞ্চে এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। সঠিক পদ্ধতি মেনে বিরোধী দলনেতা বাছাই করার ক্ষেত্রে সঠিক আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে আজ আদালতে।

প্রসঙ্গত, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় ভাঙন যেন কিছুতেই থামাতে পারছেন না তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যেই লোকসভায় তৃণমূলের ২২ জন সাংসদ এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, রাজ্য বিধানসভায় ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুর কাছ থেকে বিরোধী দলের স্বীকৃতি আদায় করেছেন। সেখান থেকে বিতর্ক শুরু হলেও তার জল গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে।

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রশ্ন তোলেন,কীভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হলেন? তাদের অভিযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিধানসভার অধ্যক্ষ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেননি। এই অভিযোগ থেকেই শুরু হয় আইনি জটিলতা।

চলতি সপ্তাহে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে মামলার শুনানি শুরু হয় বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের এজলাসে।  তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুনানির শুরু থেকেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার অধ্যক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, একটি রাজনৈতিক দলকে উপেক্ষা করে কীভাবে শুধুমাত্র পরিষদীয় দলকে গুরুত্ব দেওয়া হল?

বুধবার মামলার চূড়ান্ত শুনানিতে তিনি মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের বহুল আলোচিত একনাথ শিন্ডে বনাম উদ্ভব ঠাকরের মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি আদালতে যুক্তি দেন যে, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের অবস্থানই সবার আগে, পরিষদীয় দল পরে। অর্থাৎ, কে বিরোধী দলনেতা হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বেরই থাকা উচিত।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য ছিল, দলের চেয়ারপারসন যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত। পরিষদীয় দল কীভাবে পরিচালিত হবে, তাও নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষের আইনজীবী জয়দীপ কর আদালতে জানান, যাঁদেরকে বলা হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণও পেশ করেছিল। সেই প্রমাণের ভিত্তিতেই অধ্যক্ষ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা এবং সন্দীপন সাহাকে পরিষদীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

তাঁর দাবি, ৫৮ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৬ জন অধ্যক্ষের কাছে চিঠি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন। বাকি দুইজন পরে এসে লিখিত সম্মতি জানান। শুনানির সময় বিচারপতি অধ্যক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, ‘৩ জুন আবেদন জমা পড়েছিল। তাহলে একই দলের দ্বিতীয় চিঠি গ্রহণ করে স্পিকার কেন নতুন সিদ্ধান্ত নিলেন?’

বিচারপতি আরও জানতে চান, অভিযোগ রয়েছে  কয়েকজন সদস্য রেজোলিউশনের সময় উপস্থিত ছিলেন না।কিছু সদস্যের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।এই পরিস্থিতিতে স্পিকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিল? অধ্যক্ষের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য্য উদ্দেশে বিচারপতির প্রশ্ন ছিল, প্রথম রেজোলিউশন বাতিল করার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তিনি জানতে চান, যাচাই-বাছাই কোথায় এবং কীভাবে করা হয়েছিল? সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫৮ না ৭৮ কোনটি সঠিক?

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে জয়দীপ কর যুক্তি দেন, বিরোধী দলনেতা হতে হলে বিধায়ক হওয়া এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকা এই দুটি শর্তই যথেষ্ট। তাঁর মতে, স্পিকার কোনও ভুল করেননি; তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও জানান, চিঠি পাওয়ার পর স্পিকার রেজোলিউশনের কার্যবিবরণী  এবং উপস্থিতির তালিকা চেয়েছিলেন। পরে সেই নথিপত্র জমা দেওয়া হয়।

জবাবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সবাই তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কে দলনেতা হবেন, তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক দল। একটি রাজনৈতিক দলে কি দু’টি আলাদা ব্লক থাকতে পারে? তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, আগামীকাল অর্থাৎ ১৮ই জুন থেকে অধিবেশন শুরু হচ্ছে। ভোটাভুটির সময় কার নির্দেশ কার্যকর হবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের, না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, বিরোধী দলনেতার পদ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বের জন্য। পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করা যায় না। তাঁর বক্তব্য, ‘রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব গ্রহণ করা ছাড়া স্পিকারের অন্য কোনো পথ ছিল না। আমার মতে, স্পিকারের আদেশ বেআইনি।‘

তিনি আরও বলেন, যদি রাজনৈতিক দল থেকেই কাউকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে কীভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়? বিচারপতি তখন জানতে চান, বিধানসভার অধিবেশন কবে থেকে শুরু হচ্ছে। উত্তরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আদালত যদি হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে অধ্যক্ষ অন্য গোষ্ঠীকে বৈঠকে ডাকবেন না এবং বিজনেস অ্যাডভাইসরি কমিটির বৈঠকেও তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ মিলবে না।

দিনভর টানটান শুনানি শেষে বিচারপতি রায়দান স্থগিত রাখেন। ফলে আপাতত অনিশ্চয়তা থেকেই গেল—রাজ্যের বিরোধী দলনেতার পদে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বহাল থাকবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তের জন্য এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষা।