আজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। একাধিক অনিয়মের অভিযোগে আগের ভোট বাতিল হওয়ার পর আজ পুনরায় ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে এই কেন্দ্রে। নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই শুরু হচ্ছে ভোটগ্রহণ।
বুধবার থেকেই ডিসপার্সাল কেন্দ্রগুলিতে তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনকর্মীদের বুথে পাঠানো, ইভিএম পরীক্ষা, নিরাপত্তা সমন্বয়— সব ক্ষেত্রেই ছিল বাড়তি সতর্কতা। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে, ভোট যাতে সম্পূর্ণ অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য প্রতিটি স্তরে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
Advertisement
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে ৩৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। একটি মাত্র বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য এত বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন স্পর্শকাতর বুথে অতিরিক্ত বাহিনী রাখা হয়েছে। কমিশনের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনও রকম অশান্তি বা অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না।
Advertisement
প্রসঙ্গত, গত ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণে ফলতা কেন্দ্র থেকে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। বিজেপির অভিযোগ ছিল, বহু বুথে তাদের প্রার্থীর নাম এবং প্রতীকের সামনে থাকা ইভিএমের বোতাম সাদা টেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রভাব খাটানো এবং ভোট প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরির অভিযোগও ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বর্তমান উপদেষ্টা এবং সেই সময়ের বিশেষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত নিজে ফলতায় গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেন। বিভিন্ন বুথ পরিদর্শন করে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই কমিশন গোটা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ দেয়। কমিশন ২১ মে পুনর্ভোট এবং ২৪ মে গণনার দিন ঘোষণা করে।
তবে পুনর্নির্বাচনের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যায় ফলতার রাজনীতিতে। তৃণমূল প্রার্থী তথা বিতর্কিত নেতা জাহাঙ্গীর খান ঘোষণা করেন, তিনি নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন প্যাকেজের আশ্বাসের উপর ভরসা রেখেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই নির্বাচনে পরাজয় অবধারিত বুঝে এবং মানুষের মন পেতেই তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে সাংবিধানিক নিয়মে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। কারণ মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে নির্বাচন কমিশনের নথিতে জাহাঙ্গীর খান এখনও বৈধ প্রার্থী হিসেবেই রয়েছেন। সেই কারণে আজ ভোটগ্রহণে ইভিএমে তাঁর নাম এবং প্রতীক বহাল রয়েছে। ভোটাররা চাইলে তাঁর নামের পাশের বোতামও টিপতে পারবেন।
এই পরিস্থিতিকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিজেপির দাবি, মানুষের প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়ে তৃণমূল প্রার্থী ভোটের ময়দান ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, জাহাঙ্গীর খানের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। দল মানুষের রায়ের উপরেই আস্থা রাখছে।
আজ সকাল থেকেই কমিশনের তরফে ফলতার বিভিন্ন বুথের বাইরে এবং ভেতরে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচনকর্মীদেরও বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফলতার এই পুনর্ভোট আগামী দিনে রাজ্যের নির্বাচন প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত— এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু ফলতা নয়, গোটা রাজ্যের নজর এখন এই কেন্দ্রের দিকেই।
Advertisement



