• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 7 November, 2026

এক নিম্নচাপের পর আরেকটি: বঙ্গোপসাগরের কি মেজাজ বদলাচ্ছে?

পশ্চিমবঙ্গের জন্য সতর্কবার্তা হল, পরপর নিম্নচাপ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উপকূলে সীমাবদ্ধ থাকে না। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ স্থলভাগে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ছত্তিশগড় পর্যন্ত বৃষ্টি ঘটাতে পারে। বারবার বৃষ্টি হলে নদীর জলস্তর বাড়ে, কৃষিজমিতে জল জমে এবং শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি হয়। সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও থাকে। তাই শুধু ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নয়, নিম্নচাপের স্থায়িত্ব, গতিপথ এবং সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আগাম নির্ণয় করাও জরুরি।

এক নিম্নচাপের পর আরেকটি: বঙ্গোপসাগরের কি মেজাজ বদলাচ্ছে?

Image: IANS

‘অর্ণব’ ছিল ২০২৬ সালের উত্তর ভারত মহাসাগরের প্রথম নামাঙ্কিত ঘূর্ণিঝড়। ‘মুরাসু’ ১ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় এবং ২ নভেম্বর প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে পৌঁছয়। একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন— বাতাসের সর্বোচ্চ স্থায়ী গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ৬৩ কিমি বা তার বেশি হয়, তখন সিস্টেমটি সাইক্লোনিক স্টর্ম পর্যায়ে পৌঁছয় এবং তার নামকরণ করা হয়।

একটি নিম্নচাপের রেশ কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হচ্ছে আরেকটি নিম্নচাপ। কখনও গভীর নিম্নচাপ, কখনও প্রবল বৃষ্টি, আবার কখনও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে এমন আবহাওয়ার অভিজ্ঞতা ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছে। প্রশ্ন জাগে, বঙ্গোপসাগর কি আগের চেয়ে বেশি অস্থির হয়ে উঠছে? একটি নিম্নচাপ চলে যাওয়ার পরপরই আরেকটি তৈরি হচ্ছে কেন? এর পিছনে কি জলবায়ু পরিবর্তনের হাত রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমুদ্রের তাপমাত্রা, জলীয় বাষ্প, মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতি এবং বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে বাতাসের আচরণ বুঝতে হবে।

বঙ্গোপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর উষ্ণ জল। বিশেষ করে বর্ষার আগে আর বর্ষাকালে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অনেক সময় ২৮–৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। এই উষ্ণ জল থেকে প্রচুর জল বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা সাধারণত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তবে শুধু উষ্ণ সমুদ্র থাকলেই ঝড় তৈরি হয় না। সমুদ্র থেকে উঠে যাওয়া জলীয় বাষ্প উপরে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে মেঘ তৈরি করে। বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার সময় সুপ্ত তাপ অর্থাৎ লীন তাপ মুক্ত হয়। এই তাপ বায়ুকে আরও উপরে উঠতে সাহায্য করে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছে বায়ুচাপ কমতে থাকে। আশপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস এসে সেই নিম্নচাপের দিকে ছুটে আসে। এভাবেই শুরু হয় নিম্নচাপের প্রক্রিয়া।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা নিম্নচাপ শেষ হতে না হতেই আবার আরেকটি নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে কেন? এর অন্যতম কারণ বর্ষাকালের মৌসুমি নিম্নচাপ অক্ষরেখা বা মনসুন ট্রাফ। বর্ষাকালে এই অক্ষরেখা কখনও উত্তরে, কখনও দক্ষিণে সরে যায়। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস এই অক্ষরেখার কাছে এসে মিলিত হয়। বায়ুর এই অভিসরণ অর্থাৎ কনভারজেন্স বাতাসকে উপরে উঠতে সাহায্য করে। অক্ষরেখার অবস্থান অনুকূল থাকলে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হয়। সেটি স্থলভাগের দিকে এগিয়ে গেলে তার পিছনে আবার নতুন করে ঘূর্ণাবর্ত ও বায়ুপ্রবাহের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে পরবর্তী নিম্নচাপের জন্ম হয়। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের উপর নিম্নস্তরের ঘূর্ণাবর্ত বা সাইক্লোনিক সার্কুলেশন তৈরি হওয়ার পর তা অনুকূল পরিবেশে শক্তিশালী হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ, প্রতিটি নিম্নচাপ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক সময় এগুলি একটি বৃহত্তর মৌসুমি আবহাওয়া ব্যবস্থার ধারাবাহিক অংশ।

বঙ্গোপসাগরের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল নদীবাহিত মিষ্টি জলের প্রভাব। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, মহানদী, গোদাবরী ও কৃষ্ণার মতো নদী বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল সমুদ্রে নিয়ে আসে। মিষ্টি জলের ঘনত্ব নোনা জলের তুলনায় কম। ফলে সমুদ্রের উপরিভাগে অপেক্ষাকৃত হালকা জলের একটি স্তর তৈরি হয়। নিচের ভারী নোনা জলের সঙ্গে এর সহজে মিশ্রণ ঘটে না। বিজ্ঞানীরা একে বলেন স্ট্র্যাটিফিকেশন বা স্তরবিন্যাস। এর ফলে সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকতে পারে। একটি ঝড়ের সময় বাতাস সমুদ্রের জলকে আলোড়িত করলেও নিচের ঠান্ডা জল সহজে উপরে উঠে আসতে পারে না। ফলে পরবর্তী নিম্নচাপের জন্য প্রয়োজনীয় তাপীয় শক্তি অনেক সময় বজায় থাকে।

এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই মনে একটা প্রশ্ন আসে, নিম্নচাপ আর ঘূর্ণিঝড় কি একই? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য রয়েছে। নিম্নচাপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এক বিষয় নয়। একটি সাধারণ নিম্নচাপ শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপ হতে পারে, আবার অনুকূল পরিবেশে ঘূর্ণিঝড়েও পরিণত হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় না।

তাই বঙ্গোপসাগরের পরিবর্তন বুঝতে অন্তত চারটি বিষয় আলাদা করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, নিম্নচাপ তৈরির হার: একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে কতগুলি নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে এবং আগের কয়েক দশকের তুলনায় সেই সংখ্যা বাড়ছে কি না, তা দেখতে হবে। অল্প কয়েকটি ব্যস্ত সপ্তাহের অভিজ্ঞতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। দ্বিতীয়ত, স্থায়িত্ব— নিম্নচাপ কত দিন সমুদ্র বা স্থলভাগের উপর সক্রিয় থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী নিম্নচাপ একই অঞ্চলে বারবার বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে বন্যার আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তৃতীয়ত, শক্তিবৃদ্ধি— সাধারণ নিম্নচাপ কত দ্রুত গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হচ্ছে, তার গতিবেগ ও কেন্দ্রীয় বায়ুচাপ কতটা পরিবর্তিত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একটি নিম্নচাপের সংখ্যা কম হলেও সেটি দ্রুত শক্তিশালী হলে বিপদ বেশি হতে পারে। চতুর্থত, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ— ঝড়ের শক্তি ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সব সময় সমানুপাতিক নয়। একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল কিন্তু ধীরগতির নিম্নচাপও বিপুল বৃষ্টি ঘটাতে পারে। আবার দ্রুতগতির শক্তিশালী ঝড় অল্প সময়ে এক অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে। তাই মোট বৃষ্টির পরিমাণ, সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত এবং বৃষ্টির বিস্তার আলাদাভাবে হিসাব করা জরুরি। এই চারটি সূচক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, বঙ্গোপসাগরের মধ্যে সত্যিই কতটা পরিবর্তন হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের একটা ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে। উষ্ণ সমুদ্র থেকে বেশি জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। বাতাসের তাপমাত্রা বাড়লে তার জলীয় বাষ্প ধারণের ক্ষমতাও বাড়ে। ফলে অনুকূল পরিস্থিতিতে ঝড়ের বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছরই নিম্নচাপের সংখ্যা বাড়বে, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। সমুদ্রের তাপমাত্রার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ার অর্থাৎ বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ ও দিকের পার্থক্য এবং মৌসুমি বায়ুর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উইন্ড শিয়ার বেশি হলে ঝড়ের মেঘপুঞ্জ ছড়িয়ে যেতে পারে। আবার এই পার্থক্য কম থাকলে ঘূর্ণাবর্ত সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য সতর্কবার্তা হল, পরপর নিম্নচাপ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উপকূলে সীমাবদ্ধ থাকে না। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ স্থলভাগে প্রবেশ করে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ছত্তিশগড় পর্যন্ত বৃষ্টি ঘটাতে পারে। বারবার বৃষ্টি হলে নদীর জলস্তর বাড়ে, কৃষিজমিতে জল জমে এবং শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি হয়। সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও থাকে। তাই শুধু ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নয়, নিম্নচাপের স্থায়িত্ব, গতিপথ এবং সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আগাম নির্ণয় করাও জরুরি।

বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপ তৈরির পিছনে কোনও একটি কারণ দায়ী নয়। উষ্ণ সমুদ্র, নদীবাহিত মিষ্টি জলের স্তরবিন্যাস, প্রচুর জলীয় বাষ্প, মৌসুমি নিম্নচাপ অক্ষরেখার অবস্থান এবং বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতি— সব মিলিয়ে তৈরি হয় অনুকূল পরিস্থিতি। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের প্রকৃত পরিবর্তন বুঝতে হলে শুধু কতগুলি নিম্নচাপ তৈরি হল, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। কত দ্রুত তৈরি হল, কত দিন স্থায়ী হল, কতটা শক্তিশালী হল এবং কতটা বৃষ্টি ঘটাল— এই চারটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। বঙ্গোপসাগর শুধু বর্ষার জলভাণ্ডার নয়, এটি ভারতের আবহাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। তার মেজাজ বদলের সংকেত বুঝতে পারাই আগামী দিনের আবহাওয়াবিজ্ঞান, কৃষি পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।