পর্তুগালের জার্সিতে ২৩ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় ইতি টানার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন ৪১ বছরের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে একটি আবেগঘন ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথা জানিয়ে দিলেন তিনি। এই বার্তায় ঠিক কী বললেন তিনি? তুলে ধরা হল এখানে।
পর্তুগালের মানুষের উদ্দেশে,
সময় এসে গিয়েছে আমাদের জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার। কখনও মনে করিনি, এই জার্সি শুধুমাত্র আমার। কিন্তু ২৩ বছর ধরে এই জার্সি পরার, দেশের হয়ে তাকে রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব পেয়েছি।
এ বার সেই জার্সি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।
সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয়ের কথাও শুনতে হয়। ২০০৩ সালের অগাস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং আমার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিল, তার এ বার সমাপ্তি ঘটছে।
জাতীয় দলের হয়ে কাটানো দিনগুলির দিকে ফিরে তাকালে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে মানুষগুলির কথা।
বিদেশে থাকা সেই পর্তুগিজ মানুষগুলির কথা মনে পড়ে, যাঁরা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও নিজেদের দেশকে আরও কাছের মনে করতেন। মনে পড়ে সেই লক্ষ লক্ষ পর্তুগিজ মানুষের কথা, যাঁদের ব্যক্তিগত ভাবে কখনও চিনিনি, অথচ যাঁরা আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন।
কারণ ফুটবল শুধুমাত্র একটা খেলা নয়। ফুটবল আসলে মানুষের আবেগ।
জাতীয় দলের হয়ে গোটা কেরিয়ারে আমি নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। জিততে চেয়েছি, আরও ভাল হতে চেয়েছি, ইতিহাস তৈরি করতে চেয়েছি। নিজের কাছে সব সময় আরও বেশি প্রত্যাশা রেখেছি। বিশ্বাস করেছি, আমরা আরও দূর যেতে পারি। এই জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।
কিছু বিকেল ও রাত ছিল স্বপ্নের মতো। এমন কিছু জয় এসেছে, যা কোনও দিন ভুলব না। আবার কিছু পরাজয়ের স্মৃতি আজও কষ্ট দেয়।
আমিও ভুল করেছি। আমিও কষ্ট পেয়েছি। এমন সময়ও এসেছে, যখন পর্তুগালের মানুষ আমার কাছ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা দিতে পারিনি। কিন্তু কখনও হাল ছাড়িনি। আর সব কিছুর ঊর্ধ্বে, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনও হারাইনি।
এই দীর্ঘ যাত্রায় কয়েকটি সহজ সত্য শিখেছি। গোলের স্মৃতি এক সময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জায়গা পায় সংগ্রহশালায়, রেকর্ডও এক দিন ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি হয়, সময় কখনও তা মুছে দিতে পারে না।
যদি কখনও আমার জন্য তোমরা আনন্দ পেয়ে থাকো, আমার কোনও গোল যদি তোমাদের কাউকে প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরতে সাহায্য করে থাকে, কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দিয়ে থাকে কিংবা দেশের জন্য গর্বিত করে থাকে, তা হলেই আমার এই যাত্রা সার্থক।
কারণ পর্তুগিজ হওয়া মানে সেটাই। আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখি।
পর্তুগালের সব সময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যাঁরা স্বপ্ন দেখবেন। এমন ফুটবলারদের প্রয়োজন, যাঁরা কখনও হাল ছাড়বেন না। এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, যাঁরা বিশ্বাস করবেন, অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
কারণ, যে দেশ নতুন নতুন নায়ক তৈরি করে যেতে পারে, সেই দেশ কখনও নিজের উপর বিশ্বাস হারায় না।
জাতীয় দলের সতীর্থদের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছু কথা বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি তর্ক, মাঠে নামার আগের নীরব মুহূর্ত, একসঙ্গে উদ্যাপন করা প্রতিটি জয় এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি হারের জন্য ধন্যবাদ।
তোমাদের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু কোনও অধিনায়ক একা পথ চলতে পারেন না। তোমরা প্রত্যেকেই আমার ইতিহাসের অংশ।
জাতীয় দলের সমস্ত কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার এবং কর্মীদের ধন্যবাদ। তোমাদের অনেকেই হয়তো কখনও ছবির সামনে আসোনি। কিন্তু তোমরা না থাকলে সেই ছবিগুলিও তৈরি হত না।
আমার পরিবারকেও ধন্যবাদ। এই স্বপ্নের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য, আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ এবং জাতীয় দলকে সময় দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রাপ্য সময়টুকু ছেড়ে দেওয়ার জন্য।
আমি এত দূর পৌঁছতে পেরেছি। কারণ, আমরা সব সময় একসঙ্গে ছিলাম।
পর্তুগালের মানুষ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রত্যেক পর্তুগিজ নাগরিককে শেষ একটি কথা বলতে চাই।
একটি দৃশ্য সারা জীবন আমার সঙ্গে থেকে যাবে—জাতীয় সঙ্গীত শুরু হওয়ার মুহূর্ত।
চারদিকে তাকিয়ে সতীর্থদের দেখি, গ্যালারির দিকে তাকাই। দেখি শিশু, মা, বাবা, দাদু-দিদিমাদের। দেখি এমন সব পর্তুগিজ মানুষকে, যাঁরা শুধু সেই মুহূর্তের সাক্ষী হতে বহু দূর থেকে ছুটে এসেছেন।
সেই কয়েক মিনিটের জন্য আমরা আর আলাদা থাকি না। সেখানে কোনও ক্লাব নেই, কোনও রং নেই, কোনও শ্রেণি নেই, পেশা নেই, মতামতের বিভেদ নেই।
সেখানে শুধুই এক আবেগ—পর্তুগাল।
এই অনুভূতিটাই সারা জীবন আমার সঙ্গে থাকবে।
আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠের ভিতরে আমার যাত্রা শেষ হচ্ছে। মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। যে পথ পেরিয়ে এসেছি, তার জন্য গর্বিত। আর জানি, পর্তুগালের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছি।
কিন্তু কোনও দিন তোমাদের থেকে আলাদা হব না। পর্তুগালের প্রতিটি জয় ও পরাজয়ে আগের মতোই আনন্দিত ও আবেগপ্রবণ হব।
বিশ্বের সেরা ফুটবলার হওয়ার জন্য গোটা জীবন পরিশ্রম করেছি। আজ বুঝতে পারছি, সবচেয়ে বড় জয় ছিল বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করা।
এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। মাদেইরার সেই ছোট্ট ছেলেটিকে, যে এক দিন শুধু একটি বলের পিছনে ছুটত, তার স্বপ্নকে বাস্তব করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
৭ নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে। কিন্তু সেই জার্সি পরার গর্ব চিরকাল আমার থাকবে।
পর্তুগাল চিরকাল আমার মধ্যে বেঁচে থাকবে।
আবার দেখা হবে।
— ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো




