ইতিহাসের পাতায় নাম তুলে ফেললেন হ্যারি কেন (Harry Kane) । ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) জিতে নিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক (Harry Kane) । ২০০১-এ শেষ বার এই সন্মান জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েন। তার পর থেকে আর কোনও ইংরেজ ফুটবলারের হাতে ওঠেনি ফুটবলের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত সম্মান। অবশেষে সেই খরা কাটালেন বায়ার্ন মিউনিখের তারকা স্ট্রাইকার।
সোমবার লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে বসেছিল ২০২৬-এর ব্যালন ডি’অর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানেই বর্ষসেরা ফুটবলার হিসাবে কেনের (Harry Kane) নাম ঘোষণা করা হয়।এই পুরস্কার জেতার দৌড়ে কেনের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিলেন কিলিয়ান এমবাপে এবং লামিনে ইয়ামাল। কিন্তু গত মরসুমে ক্লাব ও দেশের হয়ে ধারাবাহিকভাবে গোল করার পুরস্কার পেলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়কই (Harry Kane) । তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, ইংল্যান্ডের ফুটবলের ইতিহাসেও একটি বড় ঘটনা।
গোলের পর গোল, ট্রফির পর ট্রফি
এমবাপে, ইয়ামালকে বাদ দিয়ে হ্যারি কেন-কে এই সন্মান দেওয়ায় অনেকে অবাক, বিরক্ত। কেউ কেউ কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি।
কিন্তু কেনের (Harry Kane) ব্যালন ডি’অর জয়ের পিছনে রয়েছে অবিশ্বাস্য একটি মরসুম। ২০২৫-২৬ মরসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১টি ম্যাচে ৬১টি গোল করেছিলেন তিনি। ক্লাব ও দেশের হয়ে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা ৭৩। কেনের দুরন্ত পারফরম্যান্সের কারণেই ঘরোয়া লিগ এবং জার্মান কাপ জেতে বায়ার্ন। পাশাপাশি জেতে জার্মান সুপার কাপও।
শুধু ক্লাব ফুটবলেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন কেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থানে থেকে শেষ করতে সাহায্য করেন তিনি। টুর্নামেন্টে ছ’টি গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন কেন। তাঁর নেতৃত্ব, গোল করার ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
নার্ভাস ছিলেন, স্বীকার করলেন কেন
ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) পাওয়ার আগে অবশ্য যথেষ্ট চাপে ছিলেন কেন। মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা আর নিজের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য অপেক্ষা করা যে এক নয়, তা বুঝিয়ে দেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক।
ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) অনুষ্ঠানে প্রবেশ করার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে, একটু নার্ভাস লাগছে। এটা বড় ম্যাচ খেলার থেকে আলাদা। কারণ এখানে ফলাফল আমার হাতে নেই।’
গত মরসুমকে নিজের কেরিয়ারের সেরা বলে মনে করেন কেন। তবে বায়ার্নের হয়ে তিনটি ট্রফি জিতলেও আরও দু’টি বড় স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গিয়েছে তাঁর। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ওঠা এবং বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কেনের কথায়, ‘নিঃসন্দেহে এটা আমার সেরা মরসুম। বায়ার্নের হয়ে তিনটি ট্রফি জিতেছি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের খুব কাছে পৌঁছেছিলাম। বিশ্বকাপেও সেমিফাইনালে উঠেছিলাম। ওই দু’টি জায়গায় যদি জিততে পারতাম, তা হলে এই পুরস্কার পাওয়া নিশ্চিত ছিল।’
সতীর্থ, কোচ এবং স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ
পুরস্কার (Ballon d’Or) হাতে নিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেন (Harry Kane) । মঞ্চে উঠে বলেন, ‘আমি প্রায় বাক্রুদ্ধ। ভাগ্যিস, আমার কাছে কিছু কথা লিখে রাখা আছে! এই অসাধারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য ফ্রান্স ফুটবল এবং ব্যালন ডি’অর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। লন্ডনে এই পুরস্কার পাওয়াটা আমার কাছে আরও বিশেষ। মনে হচ্ছে, এই শহর আমার কাছে শুভ।’
যাঁরা তাঁকে ভোট দিয়ে বেছে নিয়েছেন, তাঁদেরও ধন্যবাদ জানান কেন। পাশাপাশি স্বীকার করেন, এই পুরস্কার জেতার পিছনে সতীর্থদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কথায়, ‘তোমরা এবং দলের বাকি সদস্যেরা পাশে না থাকলে এটা সম্ভব হত না। অনুশীলনে এবং ম্যাচে তোমরা আমাকে যেভাবে আরও ভাল করার জন্য উৎসাহ দাও, তার জন্য ধন্যবাদ।’
বায়ার্নের কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। কোচের নেতৃত্বে নিজের ফুটবল দক্ষতার পাশাপাশি মানুষ হিসাবেও যে উন্নতি হয়েছে, তা জানাতে ভোলেননি তিনি।
স্ত্রী কেটের উদ্দেশে কেনের বার্তা ছিল আরও আবেগঘন। তিনি বলেন, ‘কেট, আমরা একসঙ্গেই এই পথ পেরিয়েছি। তোমার সমর্থন ছাড়া এ কখনও সম্ভব হত না।’
দুইয়ে এমবাপে, সেরা দশে কারা?
ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) ক্রমতালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে এবং তৃতীয় স্থানে বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামাল। চতুর্থ হয়েছেন স্পেনের রদ্রি, পঞ্চম আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। এছাড়া প্রথম দশে রয়েছেন খভিচা কাভারাস্খেলিয়া (৬), উসমান দেম্বেলে (৭), আর্লিং হালান্ড (৮), মাইকেল ওলিসে (৯) এবং ফাবিয়ান রুইজ (১০)।
আরও পড়ুন: ওয়েলিংটনের ঝোড়ো হাওয়া সামলে সিরিজ জয়ের লক্ষ্য পূরণের পরীক্ষা শ্রেয়স-বাহিনীর
পুরস্কার পেলেন ইয়ামালও
লামিনে ইয়ামাল এই পুরস্কার পেতে পারেন, এমন জল্পনা থাকলেও এবার তিনি এই দৌড়ে হ্যারি কেনকে পিছনে ফেলতে পারেননি। তবে পুরস্কার মঞ্চে ডাক পড়েছে তাঁর। বর্ষসেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন ইয়ামাল। পুরুষদের বর্ষসেরা গোলরক্ষক হয়েছেন উনাই সিমন। সেরা কোচের সম্মান পেয়েছেন স্পেনের লুই দে লা ফুয়েন্তে। পুরুষদের সেরা ক্লাব নির্বাচিত হয়েছে প্যারিস সাঁ জারমাঁ। আর ফুটবলের মাধ্যমে সমাজকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি হিসাবে সক্রেটিস পুরস্কার পেয়েছেন ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা।
মহিলাদের বিভাগে তৃতীয় বার সেরা পুতেয়াস
পুরুষদের বিভাগে কেনের সাফল্যের রাতে মহিলাদের ব্যালন ডি’অর জিতে নেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। এই নিয়ে তৃতীয় বার এই সম্মান পেলেন তিনি। এর আগে ২০২১ এবং ২০২২-এও এই পুরস্কার জিতেছিলেন পুতেয়াস।
গত মরসুমে বার্সেলোনার হয়ে দুর্দান্ত খেলেছিলেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। তাঁর নেতৃত্বে চারটি ট্রফি জিতেছিল বার্সেলোনা। পরে তিনি যোগ দেন লন্ডন সিটি লায়নেসে।
পুরস্কার গ্রহণ করে পুতেয়াস বলেন, ‘এখানে আবার আসতে পেরে খুব ভাল লাগছে। ধন্যবাদ ফ্রান্স ফুটবলকে। এখানে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই এই ট্রফি জেতার যোগ্যতা ছিল। তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে খেলতে পারা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের।’
দেখুন:




