ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আবার ছাত্র ও শ্রমিকদের মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্কুলের অর্থ বরাদ্দ কম থাকা, শিক্ষকের অভাব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন। এর এক সপ্তাহ আগে বিক্ষোভ ও হিংসার ঘটনায় বহু দোকান লুট হয়, গাড়িতে আগুন লাগানো হয় এবং সরকারি ভবনে হামলা চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার এবার মিছিলের পথ পরিবর্তন করেছে এবং সারা দেশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধু পুলিশ বাড়িয়ে কি মানুষের ক্ষোভ দূর করা সম্ভব?
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অভাব নিয়ে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা একটি স্কুলের সমস্যা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা আরও শিক্ষক, উন্নত স্কুলভবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বেশি সুযোগ চাইছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, মজুরি ও পেনশন বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ, এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা।
শিক্ষা কোনও দেশের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো দুর্বল হলে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হয়। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন কম থাকলে যোগ্য ছাত্রছাত্রীরাও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায় না। এর ফলে সামাজিক বৈষম্য বাড়তে পারে। অর্থবান পরিবারের সন্তানরা বিকল্প সুযোগ পেলেও সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের সামনে বাধা তৈরি হয়। তাই ছাত্রদের দাবিকে নিছক বিক্ষোভ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, মূল্যবৃদ্ধির চাপ শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। খাবার, বাসস্থান, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে খরচ বেড়ে গেলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মজুরি যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, তবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ যখন মানুষের মনে হতাশা তৈরি করে, তখন সেই ক্ষোভ সামাজিক অসন্তোষের রূপ নিতে পারে। ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তবে মানুষের ন্যায্য দাবি থাকলেও হিংসা ও ভাঙচুর কখনও গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদের পথ হতে পারে না। দোকান লুট করা, গাড়িতে আগুন লাগানো কিংবা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার ফলে সাধারণ মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বহু ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকা বিপন্ন হয়। হিংসার কারণে আন্দোলনের মূল দাবিগুলিও আড়ালে চলে যেতে পারে। ফলে সরকারের কাছে ছাত্র ও শ্রমিকদের সমস্যার বদলে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটিই প্রধান হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এবং হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হতে পারে। হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া গাড়ি ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তা বজায় রাখা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামলানো গেলেও অসন্তোষের মূল কারণ দূর হয় না। বরং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা না করা হলে মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
সরকারের উচিত ছাত্র, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসা। শিক্ষাক্ষেত্রে কোথায় কত শিক্ষক প্রয়োজন, স্কুলের পরিকাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বাড়ানোর বাস্তবসম্মত উপায় কী, তা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থির করতে হবে। পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ মানুষের অধিকার, আর জনসম্পত্তি রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। এ কথা প্রত্যেকেরই মনে রাখা প্রয়োজন।




