প্রথম সপ্তমীর সন্ধ্যায় উৎসবের রোশনাই নিমেষে বদলে গিয়েছে মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিলে। মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো মণ্ডপে প্রবল ভিড়ের চাপে মণ্ডপের একাংশ ভেঙে পড়ে এবং হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে এখনও পর্যন্ত ১৯ জন দর্শনার্থীর মৃত্যু হয়েছে (stampede at Durga Puja pandal)। মর্মান্তিক এই বিপর্যয়ে জখম হয়েছেন প্রায় ৩০ জন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ঘটনার পর থেকেই পুলিশের চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং উদ্যোক্তাদের অব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। জনরোষ ও সমালোচনার মুখে দুর্ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ করল নবান্ন। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে গিরিশ পার্ক থানার ওসি সুমিত কুমার ঘোষকে। সমগ্র ঘটনার তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের (Special Investigation Team-SIT) হাতে।
মৃত্যুফাঁদ
এ বছর পুজোর শুরু থেকেই সমাজমাধ্যমজুড়ে চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপ ও প্রতিমার ছবি-ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ায় দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রবল উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। ফলে সপ্তমীর দিন যে ভিড়ের চাপ কয়েক গুণ বাড়বে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। শনিবার দুপুর থেকে শহরে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি শুরু হয় এবং সন্ধ্যার দিকে তা প্রবল বর্ষণের রূপ নেয়। ছাতা মাথায় দিয়েই রাস্তায় নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
একদিকে সপ্তমীর জনস্রোত, অন্যদিকে অঝোর বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপের ভিতরে ঢুকে পড়ার মরিয়া চেষ্টা– এই দুইয়ের জেরে চোরবাগান মণ্ডপ চত্বরে চরম অব্যবস্থা তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মণ্ডপের প্রবেশপথ এমন সংকীর্ণ ও অপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে কৃত্রিম ভাবে ভিড় জমে। এমনকি দর্শনার্থীদের আটকে বার বার দড়ি ফেলে ভিড় বাড়ানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। শনিবার সন্ধ্যায় সেই ভিড়ের অসহনীয় চাপেই আচমকা মণ্ডপের একাংশ ভেঙে পড়ে এবং নিমেষে শুরু হয় প্রাণ বাঁচানোর হুড়োহুড়ি (crowd management failure)।
মৃতদেহ থেকে গয়না লোপাটের অভিযোগ
দুর্ঘটনার পর থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের বিস্ফোরক দাবি, মণ্ডপের ভিতরে যখন হুড়োহুড়ি ও শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন তা নিয়ন্ত্রণের কোনও চেষ্টাই করেনি কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা (police inaction)। উল্টে একের পর এক দর্শনার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়া এবং পদপিষ্ট হওয়ার খবর সামনে আসতেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় পুলিশ।
এই চরম বিপর্যয়ের মাঝেই সামনে এসেছে চূড়ান্ত অমানবিকতার আরও এক ভয়াবহ অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, নেপালের বিপর্যয়ের স্মৃতি উসকে দিয়ে চোরবাগানের ভিড় ও বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে নিথর দেহগুলি থেকে গয়না লোপাট করা হয়েছে। এমনকি মৃত বা অচৈতন্য মানুষের আঙুল থেকে আংটি খুলে নেওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওসি বদল ও মুখ্যমন্ত্রীর তোপ
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গিরীশ পার্ক থানার ওসি সুমিত কুমার ঘোষকে পদ থেকে সরিয়ে দিল নবান্ন। তাঁর জায়গায় গিরীশ পার্ক থানার নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (Detective Department) আধিকারিক হীরক দলপতিকে। গোয়েন্দা বিভাগের বর্তমান দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি এই থানার কাজও সামলাবেন।
দুর্ঘটনার পরেই চোরবাগানের ওই পুজো মণ্ডপ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে উত্তেজনা ও জমায়েত রুখতে গোটা এলাকায় জারি করা হয়েছে ১৬৩ নম্বর ধারা (Section 163)। রবিবার সকালেই লালবাজারের শীর্ষ গোয়েন্দা আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং ভেঙে পড়া কাঠামো খতিয়ে দেখেন। অন্যদিকে এই বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতেও তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। চোরবাগান কাণ্ডে নিচুতলার হোমগার্ডদের ভূমিকাকে কাঠগড়ায় তুলে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে প্রশাসন আবর্জনা বয়ে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করেই পাল্টা রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের ব্যর্থতাকে নিশানা করেছে বিরোধীরা।




