এই বংশেই জন্ম নেন সাধক কবি জগদ্রাম রায়। যৌবনে তাঁর গৃহত্যাগী হয়ে সাধনার পথে যাওয়ার পেছনে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এই ভুলুই গ্রামের মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটি অত্যন্ত কৌতূহলপ্রদ এবং এটি দু’টি মন্দিরে বিভক্ত। গ্রামের আদি দুর্গামন্দিরটি (বামদিকের মন্দির) সাধক জগদ্রাম রায় স্থাপন করেননি, সেটি স্থাপন করেছিলেন তাঁর পিতা রঘুনাথ রায়। তবে সূচনালগ্নে সেখানে কোনও মূর্তিপুজো হতো না। বর্তমানে জগদ্রাম রায়ের অন্য পাঁচ ভাইয়ের বংশধরেরা এই আদি মন্দিরটি পরিচালনা করেন।
অন্যদিকে, ডানদিকের যে মন্দিরটি রয়েছে, সেটিই হল সাধক কবি জগদ্রাম রায় প্রতিষ্ঠিত ‘শ্রী শ্রী অষ্টনায়িকা দুর্গামন্দির’। জগদ্রাম রায়ের নিজের বংশধরেরা আজও পরম নিষ্ঠার সাথে এই মন্দিরের পুজো ও রীতিনীতি পরিচালনা করে আসছেন। (উল্লেখ্য, জগদ্রাম রায়ের পুত্র রামপ্রসাদ রায় আলাদা করে কোনও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি)।
এই মন্দিরের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার সাহিত্য মহলের এক অমূল্য রত্ন। অনেকেই মনে করেন জগদ্রামী রামায়ণ হয়তো কোনও অনুবাদ সাহিত্য, কিন্তু তা একেবারেই নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ মৌলিক রচনা। সাধক কবি জগদ্রাম রায় এই অষ্টকাণ্ড বা ‘অদ্ভুত রামায়ণ’ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু গ্রন্থটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি দেহত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র রামপ্রসাদ রায় বাবার এই অসমাপ্ত কাজ পরম যত্নে সম্পূর্ণ করেন। পিতা ও পুত্রের এই অনবদ্য যুগলবন্দির কারণেই বাংলার সাহিত্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থটি ‘জগদ্রামী-রামপ্রসাদী রামায়ণ’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
একসময় এই পুজোর প্রসার ছিল কল্পনাতীত। দূরদূরান্ত থেকে অগণিত পুণ্যার্থী এই সাধক কবির মন্দিরে ছুটে আসতেন। আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এই জাগ্রত মন্দিরে ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন দেবী। কিন্তু কালের গভীরে আজ হারিয়ে যেতে বসেছেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এই অন্যতম সাধক ও তাঁর অমূল্য সৃষ্টি। আজকের যান্ত্রিক প্রজন্মের কাছে কবি জগদ্রাম রায় হয়তো ভুলতে বসা এক নাম, কিন্তু ভুলুই গ্রামের এই প্রাচীন ঠাকুরদালান মনে করিয়ে দেয় বাংলার এক হারানো স্বর্ণযুগের কথা।




