ভারতের অর্থনীতি যে কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভালোভাবে এগিয়ে চলেছে, তা নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের (আইএমএফ) মূল্যায়নেও ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি ও স্থিতিশীলতার স্বীকৃতি মিলেছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাণিজ্যিক সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সমস্যার মধ্যেও ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের বেশি থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। আগামী দিনে অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে সরকারকে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে— মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
করোনা মহামারির সময় থেকেই ভারতের আর্থিক নীতিতে সংযমের পরিচয় দেখা গিয়েছে। বহু পশ্চিমি দেশের মতো বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বিলি করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পথে না হেঁটে ভারত সরকারি পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছে। রাস্তা, রেল, বন্দরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে। দেশের বিপুল বাজারও এই বৃদ্ধির অন্যতম ভরসা। কিন্তু আগামী দিনের বাজেট তৈরির সময় এই সাফল্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং উৎপাদন খরচের দিকেও নজর দিতে হবে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ মূল্যবৃদ্ধি। খুচরো বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়। আবার কাঁচামাল, পরিবহন ও জ্বালানির খরচ বাড়লে শিল্প ও ব্যবসার উপরেও চাপ পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। সরকার যদি দীর্ঘদিন জ্বালানির বাড়তি দাম ভর্তুকি বা অন্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সামলে রাখে, তবে তার আর্থিক চাপ বাড়বে; আর সেই দাম সরাসরি ক্রেতাদের উপর চাপালে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বাড়বে। তাই রাজস্বের হিসাব মেলানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। আমেরিকার শুল্কনীতি এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ভারতের রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব সহজে এড়ানো যাবে না। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে শিল্পের উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য নতুন বাজার খুলে দিতে পারে। তবে শুধু চুক্তি করলেই হবে না, ভারতীয় পণ্যের গুণমান বাড়ানো, উৎপাদন খরচ কমানো এবং নতুন বাজার খুঁজে নেওয়ার কাজও সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত উন্নতি বহু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কাজ কমে যেতে পারে, আবার নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো, গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। এআইকে শুধু কর্মসংস্থানের বিপদ হিসেবে দেখলে চলবে না, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করতে পারে।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। অনিয়মিত বর্ষা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং তাপপ্রবাহ কৃষি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, গ্রামীণ আয় কমে এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। তাই দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি জল সংরক্ষণ, উন্নত সেচব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ভারতের অর্থনীতি আগামী দিনেও অনেক দেশের তুলনায় ভালো করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু উচ্চ বৃদ্ধির হার যথেষ্ট নয়। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক ঝুঁকির মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং পরিবেশ রক্ষার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে।




