ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (Special Intensive Revision-SIR) প্রক্রিয়াকে ঘিরে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India-ECI) দিকে ধেয়ে আসা ভোট চুরির (vote theft) অভিযোগ এবার কড়া সমালোচনার মুখে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির লাগাতার বিক্ষোভের আবহে এ বার সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের সমর্থনে এগিয়ে এলেন দেশের ৪২ জন প্রাক্তন বিচারক। এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া একটি শীর্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা কালিমালিপ্ত করার এই বিপজ্জনক প্রবণতা ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল ভিতকেই দুর্বল করে দেবে।
হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের এই যৌথ অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল। তাঁদের মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন বা অভিযোগ জানানোর জন্য সংবিধানে সুস্পষ্ট পথ নির্দিষ্ট রয়েছে। কিন্তু সেই পথ এড়িয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে ভোট চুরির মতো চটকদার স্লোগান তুলে জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
ভিত্তিহীন ভোট চুরির অভিযোগ
বিবৃতিতে প্রাক্তন বিচারপতিরা উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং গোটা কমিশনের বিরুদ্ধে যে ধরনের আক্রমণ শানানো হচ্ছে, তা বেনজির। কোনও সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক বা বিচারবিভাগীয় প্রমাণ ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়াকে বেআইনি তকমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আইনজ্ঞদের বক্তব্য, একটি নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামো তখনই সক্রিয় থাকে, যখন নাগরিকেরা তার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের (constitutional institutions) সততার উপর আস্থা রাখেন। রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে যদি ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি গণ-অনাস্থা তৈরি করা হয়, তবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষ ভোটাধিকার এবং বিচারব্যবস্থার উপর থেকেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবেন। এটি সরাসরি অরাজকতার পথ খুলে দেয়।
এসআইআর প্রক্রিয়া আসলে কী?
আন্দোলনকারীদের প্রধান ক্ষোভের জায়গা হল, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পদ্ধতি বা এসআইআর। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বহু বৈধ ভোটারের নাম অনৈতিক ভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
তবে ৪২ জন প্রাক্তন বিচারপতির ব্যাখ্যা, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন কোনও আকস্মিক বা বেআইনি পদক্ষেপ নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও বিধিবদ্ধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (statutory and transparent process)। প্রতি নিয়ত বহু ভোটারের বাসস্থান বদল হয়, কারও মৃত্যু হয়, আবার বহু তরুণ ভোটার তালিকায় নাম তোলার যোগ্য হয়ে ওঠেন। ফলে ভুয়ো বা দ্বৈত নাম বাদ দিয়ে এবং নতুন নাম নথিভুক্ত করে ভোটার তালিকাকে ত্রুটিমুক্ত রাখাই এই প্রক্রিয়ার প্রধান লক্ষ্য। কমিশন যদি এই নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার কাজ না করে, তবে নির্বাচন কখনওই নির্ভুল হতে পারে না।
রাজপথের স্লোগান বনাম আইনি পদক্ষেপ
যৌথ বিবৃতিতে আইনজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয় দাবি ও আপত্তি (claims and objections) জানানোর জন্য।
তাঁদের প্রশ্ন, কোনও রাজনৈতিক দল বা নাগরিক সংগঠনের যদি নির্দিষ্ট কোনও ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে আপত্তি থাকে, তবে তারা নথিপত্র-সহ কমিশনের দ্বারস্থ হচ্ছে না কেন? নির্ধারিত ট্রাইব্যুনাল বা উচ্চ আদালতে গিয়ে সেই অনিয়মের প্রতিকার চাওয়ার রাস্তা সব সময় খোলা। কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা বা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের জিগির তুলে জনরোষ তৈরি করা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের বিরোধী।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা
কয়েক দিন ধরেই রাজধানীতে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরকে কেন্দ্র করে উত্তাপ বাড়ছে। বিরোধী সাংসদদের সংসদ অভিযান থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠনগুলির ১০ অক্টোবরের বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক, সব মিলিয়ে নির্বাচন সদনের উপর রাজনৈতিক চাপ চরমে।
এই টানাপড়েনের মধ্যেই প্রাক্তন বিচারপতিদের এই যৌথ বিবৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু দেশের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিশানা করে যদি রাজনৈতিক যুদ্ধ চালানো হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশই। বিচারকদের এই সতর্কবার্তা সেই সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষারই এক জোরালো আহ্বান।




