দীর্ঘ ৩৪ বছর পরে আবার কোনও পদার্থবিজ্ঞানী একক ভাবে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন। বেলজিয়াম-মার্কিনী নাগরিক ৮২ বছরের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফ্রান্সিস হালজেন।
গত ৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার, সুইডেনের স্টকহোমের রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস ঘোষণা করেছে, IceCube Neutrino Observatory-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকার জন্য বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনকে নোবেল পুরস্কার ২০২৬ জ্ঞাপন করা হবে।
রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি ১৯০১ সাল থেকে প্রতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জ্ঞাপন করে আসছে। ডাইনামাইটের আবিষ্কারক বিজ্ঞানী স্যার আলফ্রেড নোবেল (১৮৩৩-১৮৯৬) তাঁর বিপুল অর্থ ও সম্পত্তি নোবেল ইনস্টিটিউটকে দান করেন। তিনি উইল করে যান, তাঁর জমানো অর্থ থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, শান্তি এবং সাহিত্য এই পাঁচটি বিভাগে প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে। অবশ্য ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতেতেও নোবেল পুরস্কার চালু হয়।
১৯০১ সালে প্রথম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান জার্মান বিজ্ঞানী ভিলহেল্ম কনরাড রন্টগেন। এক্স-রশ্মি আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের জগতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাঁকে সেবার পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। গতবছর মাইক্রো স্তরে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করার জন্য নোবেল পান ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক। জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. ডেভোরে এবং জন এম. মার্টিনিস।
রমন এফেক্ট আবিষ্কারের কারণে ভারত থেকে ১৯৩০ সালে এই পুরস্কার পান চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরও ১৯৮৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। শুরুতেই বলা হয়েছে, নিউট্রিনো কণা আবিষ্কার করে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করার জন্য হালজেনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
এখন প্রশ্ন, এই নিউট্রিনো কণাটা ঠিক কীরকম? কী এর কার্যকলাপ? মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির এক ভূতুড়ে কণা হল ‘কসমিক নিউট্রিনো’। মহাজাগতিক নিউট্রিনো কণা হল এমন এক রহস্যময় কণা, যার কোনও বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং ভর শূন্যের প্রায় কাছাকাছি। ফলে এরা প্রায় কোনও কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না-খেয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারে। এগুলো ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সেও কোনও কাজ করে না। এ কারণে নিউট্রিনো কণা ব্ল্যাক হোল, সুপারনোভা বা যে কোনও মহাজাগতিক স্তর থেকে সরাসরি অবিকৃত অবস্থায় পৃথিবীতে চলে আসে।
কিন্তু এদের কোনোভাবেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। আসলে এদের শনাক্ত করতে এমন একটি মাধ্যমের প্রয়োজন, যা স্বচ্ছ এবং ঘন অন্ধকারে ঢাকা। দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীরের বরফকে এই কাজের জন্য বিজ্ঞানী হালজেন বেছে নেন। কিন্তু কেন দক্ষিণ মেরু? কারণ, প্রচণ্ড চাপেও সেখানে বাতাসের কোনও বুদবুদ তো থাকেই না, এমনকী তা কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। আর তাছাড়া এই অঞ্চলে কখনই ভূমিকম্প সংঘটিত হয় না ।
আন্টার্কটিকার এই অঞ্চলে ৮৬টি তারের সঙ্গে যুক্ত করে ৫,১৬০টি অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোক-সেন্সর তৈরি করেন, যেগুলো ‘ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল’ (ডম) নামে পরিচিত । এই পুরো ব্যবস্থাটি বরফের নীচে ১ কিউবিক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নিউট্রিনো ডিটেক্টর হিসেবে পরিচিত।
মহাজাগতিক স্তর থেকে আসা কোটি কোটি নিউট্রিনো কোনোরকম বাধা ছাড়াই পৃথিবী এবং এই বরফ ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু অত্যন্ত বিরল ও ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষেত্রে, উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো বরফের ভেতরে যাওয়ার সময় বরফের জলে থাকা অক্সিজেন বা হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন হয় ‘মিউয়ন’ নামক এক ধরনের দ্রুত গতির চার্জযুক্ত কণার। মিউয়ন যখন বরফের মধ্য দিয়ে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটে যায়, তখন সংঘর্ষে নীল রঙের আলোর ঝলক তৈরি হয়। পদার্থবিজ্ঞানে একে ‘চেরেঙ্কভ বিকিরণ’ নামে অভিহিত করা হয়। ফ্রান্সিস সার্জেন্টের বসানো ‘ডম’ সেই বিকিরণ থেকেই চিহ্নিত করেছেন মহাজাগতিক নিউট্রিনো কণাকে। এই কণাকে, বলা বাহুল্য, দেখা যায় না, ধরা যায় না, কিন্তু তা পৃথিবীর ভিতর দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারে। এমনকী নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে চলে গেলেও তার অস্তিত্ব আমরা টের পাই না। সম্ভবত এই কারণে এই কণাকে ঘোস্ট পার্টিকেল বা ভূতুড়ে কণা বলা হয়। মহাবিশ্বের এই ভূতুড়ে কণাকেই চিহ্নিত করার নতুন পথ দেখিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। তাঁর সেই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতি মিলল এবছর নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে। কিন্তু ফ্রান্সিস হালজেনের প্রাথমিক পরিচয়?
১৯৪৪ সালের ২৩ মার্চ বেলজিয়ামের তিয়েনে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রান্সিস হালজেন। ১৯৬৯ সালে তিনি কেইউ লিউভেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি পাড়ি দেন আমেরিকায়। দীর্ঘদিন ধরে উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে অধ্যাপনা করছেন ফ্রান্সিস হালজেন। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক কণা পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
হালজেনের এই আবিষ্কারের অভিঘাতে পদার্থবিদ্যায় এক নতুন দরজা খুলতে চলেছে। কেননা অন্যান্য কণার মতো মহাজাগতিক পথে নিউট্রিনো সহজে দিক বদলায় না, আবার পদার্থের সঙ্গে খুব সামান্যই মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে যে জায়গা থেকে তার জন্ম, সেখানকার তথ্য অনেকটাই অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। অর্থাৎ, দূর মহাবিশ্বের ভয়ংকর ঘটনাগুলির এক ধরনের সরাসরি বার্তাবাহক হয়ে উঠতে পারে নিউট্রিনো।
IceCube সেই বার্তাই হুবহু ধারণ করে। ২০১৩ সালে IceCube মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর অস্তিত্বের প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ প্রকাশ করে৷ পরবর্তী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও নির্দিষ্টভাবে মহাবিশ্বের দূরবর্তী উৎসগুলির সঙ্গে এই কণাগুলির যোগসূত্র খুঁজে পেতে শুরু করেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই হালজেনের এই আবিষ্কারকে শুধু একটি কণা আবিষ্কারের সাফল্য হিসেবে দেখতে
পারি না। এর মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দেখার একটি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। একে নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান বললেও অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না।
এতদিন মহাকাশকে মূলত আলো, রেডিয়ো তরঙ্গ, এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে দেখা হত । নিউট্রিনো সেই ছবিতে যোগ করল নতুন এক জানালা । মহাকাশের এমন কিছু অতি-শক্তিশালী অঞ্চলের খবরও এখন এই কণার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব।
রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে, হালজেনের নেতৃত্বে গবেষক ও ইঞ্জিনিয়ারদের আন্তর্জাতিক দল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছে, যা কার্যত মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ খুলে দিয়েছে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান স্বয়ং মার্ক পিয়ার্সও হালজেনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসকে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
৮২ বছরের ফ্রান্সিস হালজেন মঙ্গলবার ইতালি থেকে ফোনে নোবেল কমিটির সঙ্গে কথা বলেন। পুরস্কার পাওয়ার খবর তিনি প্রত্যাশা করেননি ঠিকই। তিনি সেটা জানিওয়েছেন। তবে, তাঁর গবেষণার প্রভাব এখন আর শুধুমাত্র একটি পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। IceCube থেকে প্রতিনিয়ত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগৃহীত হচ্ছে, তা দিয়ে ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের আরও অজানা এবং আশ্চর্য ঘটনাকে চিহ্নিত করা সম্ভব।
নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক পদক ও সম্মাননা আগামী ১০ ডিসেম্বর, স্যার আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে অধ্যাপক ফ্রান্সিস হালজেনের হাতে তুলে দেওয়া হবে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, নোবেল আসলে কেবলমাত্র ফ্রান্সিস হালজেন পাচ্ছেন তা নয়, তাঁর সূত্রে গৌরবের অংশীদার হয়ে উঠতে চলেছেন পদার্থবিদ্যার তামাম বিশ্বের সমস্ত মনোযোগী শিক্ষার্থীরাও।




