যে যেখানে আছে তাদের আমরা তখনই দেখতে পাই, যখন আলো থাকে আর যখন আলো থাকে না, তখন আর তাদের দেখতে পাই না। তাই আলোকে আমরা চিনতে পারি দৃশ্যমানতার দূত হিসেবে। ভোরের আলোয় পৃথিবী জেগে ওঠে, সূর্যের আলোয় ফুল ফোটে, সন্ধ্যার অন্ধকারে চোখ ধীরে ধীরে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু আলো যে কেবল আমাদের চোখে ছবি আঁকে তা নয়— আলো জীবনের গভীরতম বৈদ্যুতিক ভাষাকেও স্পর্শ করতে পারে। এমনকি আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে জাগানো কিংবা নীরব করাও সম্ভব।
এই বিস্ময়কর বিজ্ঞানই অপ্টোজেনেটিক্স। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার ফিজিওলজি বা মেডিসিনে জার্মানির হাম্বোল্ডট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিটার হেগেমান, জার্মানির উর্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জর্জ ন্যাগেল এবং আমেরিকার স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ল দেইসরথের কাজকে সম্মানিত করেছে— আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিক্সের আবিষ্কারের জন্য।
বিজ্ঞানের এই গল্পটা শুরু হয়েছিল মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, এক প্রকার এককোষী ক্ষুদ্র সবুজ শৈবাল দিয়ে। তার নাম হল ক্লামাইডোমোনাস। এরা সাধারণত অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখার মতো ছোট, এককোষী এবং নাশপাতির মতো বা ডিম্বাকার আকৃতির হয়। এদের সামনের দিকে দুটি ফ্ল্যাজেলা বা চাবুকের মতো সুক্ষ্ম অঙ্গ থাকে, যা দিয়ে এরা জলে সাঁতার কাটে। সাধারণত স্থির মিষ্টি জল, স্যাঁতসেঁতে মাটি এবং আর্দ্র স্থানে বেশি জন্মায়। বিজ্ঞান ও আণবিক গবেষণায় কোষের গতিশীলতা ও জিনগত অধ্যয়নের জন্য এই শৈবালটিকে আদর্শ জীব হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই শৈবালের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এরা আলোকে অনুসরণ করতে পারে। তার কাছে আলো শুধু উজ্জ্বলতা নয়— আলো হলো পথনির্দেশ।
কিন্তু প্রশ্ন হল— একটি এত ক্ষুদ্র জীব আলোকে চিনতে পারে কীভাবে? গবেষণার সূত্রে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন এক বিশেষ আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন— যার নাম হল চ্যানেলরোডোপসিন। এটি এমন এক ধরনের প্রোটিন, যা আলো পেলে আয়ন চলাচলের জন্য একটি পথ খুলে দেয়। এখানেই লুকিয়ে রয়েছে এক অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা। সাধারণত কোষের ঝিল্লির দুই পাশে আয়নের ঘনত্বের পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্য থেকেই তৈরি হয় বৈদ্যুতিক বিভব। আয়ন চ্যানেল খুললে সোডিয়াম, পটাসিয়াম বা অন্য আয়ন ঝিল্লির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পারে। ফলে কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থা বদলে যায়।অর্থাৎ, আলোর সাহায্যে প্রোটিন সক্রিয় হয়। তার ফলে আয়ন চ্যানেল খুলে সেটা প্রবাহিত হতে শুরু হয় আর পরে সেটাই বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিবর্তিত হয়। প্রকৃতি যেন আলোকে একটা বৈদ্যুতিক সুইচে পরিণত করেছে।
এবার বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলেন— যদি এই আলোক-নিয়ন্ত্রিত চ্যানেলের জিন কোনও প্রাণীর কোষে প্রবেশ করানো যায়, তবে কি সেই কোষকেও আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই জন্ম দিল অপ্টোজেনেটিক্সের।স্নায়ুকোষ বা নিউরোনের নিজস্ব বৈদ্যুতিক ভাষা রয়েছে। একটা নিউরোন উত্তেজিত হলে তার ঝিল্লির বৈদ্যুতিক বিভব দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং তৈরি হয় অ্যাকশন পোটেনশিয়াল। সেই বৈদ্যুতিক সংকেত নিউরোনের দীর্ঘ অ্যাক্সন ধরে এগিয়ে যায় এবং অন্য কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্নায়ুতন্ত্রের কোটি কোটি নিউরোনের এই বৈদ্যুতিক কথোপকথনই নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের অনুভূতি, স্মৃতি, চিন্তা, গতিবিধি আর আচরণ। যদি কোনও নির্দিষ্ট নিউরোনকে আলো দিয়ে চালু করা যায়— তাহলে বিজ্ঞানীরা যেন মস্তিষ্কের বিশাল অর্কেস্ট্রার একটি নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রকে আলাদা করে বাজাতে পারবেন। আর যদি সেই নিউরোনকে আলো দিয়ে বন্ধ করা যায়, তখনই বোঝা যাবে— সেই নিউরোনের ভূমিকাটা
আসলে কী?
এখানেই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরোথ বৈপ্লবিক কর্মযজ্ঞের সুচনা। কার্ল ডাইসেরোথ এবং তাঁর সহকর্মীরা চ্যানেলরডোপ্সিনের মতো আলোক- সংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে নিউরোনকে আলোক-নিয়ন্ত্রিত করার পথ দেখালেন।
আর তখনই প্রয়োজন পড়ল জেনাটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। একটি নির্দিষ্ট নিউরোনে এমন একটি জিন প্রবেশ করানো হলো, যা আলোক-সংবেদনশীল আয়ন চ্যানেল তৈরি করতে পারে। তারপর সেই নিউরোনে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পৌঁছালে চ্যানেল খুলে যায় আর নিউরোনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিবর্তিত হয়। এ যেন মস্তিষ্কের ভেতরে বসানো হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আলোক-সুইচ। আলো জ্বালালে নিউরোন সক্রিয় হয় আর আলো বন্ধ করলে— নিউরোনের কার্যকলাপও বদলে যায়।এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ভুলতা। মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরোন রয়েছে। তাদের প্রত্যেকটির কাজ কিন্তু এক নয়। কেউ গতিবিধির সঙ্গে যুক্ত, কেউ স্মৃতিশক্তির সঙ্গে যুক্ত আবার কেউ স্বীকৃতি বা অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অপ্টোজেনেটিক্স বিজ্ঞানীকে নির্দিষ্ট ধরনের নিউরোন বা নিউরাল সার্কিট নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয়।
আমাদের মস্তিষ্ক হল সবচেয়ে রহস্যে ঘেরা এক বিশাল জগৎ। মস্তিষ্ককে অনেক সময় বলা হয় আমাদের শরীরের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ। আমরা কীভাবে স্মৃতি তৈরি করি? কেন ভয় পাই? আনন্দের অনুভূতি কোথা থেকে আসে? কেন কোনও অভ্যাস তৈরি হয়? কীভাবে সিদ্ধান্ত নিই? এইসব প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের আগে প্রধানত পর্যবেক্ষণ করতে হত, কোন নিউরোন কখন কোন কাজে কাজ করছে। কিন্তু শুধু কো-রিলেশন দিয়ে কারণ বোঝা যায় না। এক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিক্স এখানে একটি নতুন পরীক্ষা করার সুযোগ দিল।
ধরা যাক, একটি নির্দিষ্ট নিউরাল সার্কিট কোনও আচরণের সময় সক্রিয় হচ্ছে। বিজ্ঞানী যদি আলো দিয়ে সেই সার্কিটটি সক্রিয় করেন এবং একই আচরণ দেখা যায়, তাহলে সার্কিটটির কার্যকারণগত ভূমিকা সম্পর্কে অনেক শক্তিশালী ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ‘এই নিউরোন সক্রিয় হয়েছিল’ থেকে ‘এই নিউরোন সক্রিয় করলেই ঘটনাটি ঘটছে’—এই বৈজ্ঞানিক যাত্রাটা অনেক সহজ হয় যায়।
আলো দিয়ে স্মৃতি কি স্পর্শ করা যায়? স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে রহস্যময় ক্ষমতাগুলির মধ্যে একটি। একটি মুখ, একটি গান, একটি গন্ধ কিংবা বহু বছর আগের কোনও বিকেলের স্মৃতি হঠাৎ বর্তমানকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু স্মৃতি কোথায় থাকে? স্মৃতি কোনও একক কোষে জমা থাকে না। বিভিন্ন নিউরাল সার্কিটের পরিবর্তিত সংযোগ ও কার্যকলাপের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। অপ্টোজেনেটিক্স গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট নিউরাল পপুলেশনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে স্মৃতি কিভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে প্রয়োজন মত ফেরত নিয়ে আসা যায়— প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন।
এখানে আলো যেন হয়ে উঠেছে মস্তিষ্কের স্মৃতির পাতায় রাখা একটি সূক্ষ্ম চিহ্নিত কলম। রোগ বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবে। পারকিনসন রোগ, মৃগী, অবসাদ, নেশার আসক্তি এধরণের বিভিন্ন রকমের মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির জন্যে নিউরাল সার্কিটের অস্বাভাবিক কার্যকলাপের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অপ্টোজেনেটিক্সের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা প্রাণীর মডেলে এই সার্কিটগুলিকে অত্যন্ত নির্দিষ্টভাবে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে রোগের গঠনগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করছেন। মানুষের চিকিৎসায় এর ব্যবহার এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে অত্যন্ত নির্দিষ্ট নিউরাল সার্কিট লক্ষ্য করে চিকিৎসার নতুন পথ তৈরি হতে পারে— এমন সম্ভাবনা বিজ্ঞানকে উৎসাহিত করছে।
আলো— শুধু দেখা নয়, বোঝার ভাষা। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হয়তো প্রযুক্তির মধ্যে নয়, তার ভাবনার মধ্যে। একটি ক্ষুদ্র শৈবাল সূর্যের আলো অনুসরণ করতে গিয়ে যে আনবিক প্রকৌশল ব্যবহার করেছিল, মানুষ সেটিকে ধার করে আজ মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে। প্রকৃতি যেন কোটি কোটি বছর আগে একটি ছোট্ট পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে রেখেছিল— ‘আলো দিয়ে কি জীবনের বৈদ্যুতিক সংকেত নিয়ন্ত্রণ করা যায়?’ মানুষ বহু বছর পরে সেই প্রশ্নটি শুনতে পেয়েছে।
অনুপ্রাণ বিজ্ঞান, জীনতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং আলোকতত্ত্ব— চারটি আলাদা বিজ্ঞানের স্রোত যখন এক জায়গায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখনই তৈরি হয় বিজ্ঞানের এক নতুন বিষয়—অপ্টোজেনেটিক্স। ২০২৬ সালের নোবেল স্বীকৃতি তাই কেবল একটি নতুন প্রযুক্তির পুরস্কার নয়। এটি বিজ্ঞানের একটি বিশেষ দর্শনকে সম্মান জানায়—প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম রহস্যও কখনও কখনও বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের দরজা খুলে দিতে পারে।
একটা শৈবালের সামান্য আলোক সংবেদনশীলতা থেকে যে গবেষণা শুরু হয়েছিল আজ তা পৌঁছে গেছে মানুষের মস্তিষ্কের গভীর নিউরাল সার্কিটের মধ্যে। বিজ্ঞান আসলে এমনভাবেই একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে আরেকটি জটিল প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ কখনও কখনও খুলে দেয় মহাবিশ্বের কোনও একটি অচেনা অজানা দরজা।
আজ আমরা আলো দেখি, আলো দিয়ে পৃথিবীকে চিনতে পারি। কিন্তু অপ্টোজেনেটিক্স আমাদের শিখিয়েছে— আলো শুধু চোখে পৌঁছায় না; সঠিক আনবিক দরজা খোলা পেলে আলো মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কথোপকথনের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে।হয়ত ভবিষ্যতের কোনও একদিন, আজকের এই ‘আলো-নিয়ন্ত্রিত নিউরোন’ প্রযুক্তিই মস্তিষ্কের আরও গভীর অসুখের চিকিৎসার পথ দেখাবে।
মানুষ তখন হয়তো ফিরে তাকাবে সেই ক্ষুদ্র সবুজ শৈবালের দিকে। আর বুঝবে— জীবনের সবচেয়ে গভীর অন্ধকারেও কখনও কখনও উত্তরটি লুকিয়ে থাকে একটি আলোকরশ্মির মধ্যে।




